হ্যাঁ, যা ভেবেছিলুম তাই। এক হিন্দিপ্রেমী সোল্লাসে জানালেন, আজ সকালে বঙ্কিমবাবুর ফাঁসি হয়ে গিয়েছে।
আমার এ লেখন হিন্দিতে অনুদিত হলে আমার নির্ঘাত ছ মাসের ফাঁসি।
.
মে মাসের ২৯ তারিখ ১৯২৫ খ্রিস্টাব্দে মহাত্মা গাঁধী শান্তিনিকেতন আশ্রমে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে দেখা করতে আসেন। বলা বাহুল্য এই তাদের প্রথম পরিচয় নয়। গাঁধীজি যখন দক্ষিণ আফ্রিকা ত্যাগ করে ভারতে আসেন তখন তিনি প্রায় চার মাস শান্তিনিকেতন ব্রহ্মবিদ্যালয় পরিচালনা করেন। ওই সময়ে ৬ মার্চ ১৯১৫ খ্রিস্টাব্দে উভয়ের প্রথম সাক্ষাৎ হয়।(৪) এর পর ১৯২১-এর পূর্বে উভয়ের আর কোনও মালাকাত হয়েছিল কি না জানি নে। তবে ৬ সেপ্টেম্বর ১৯৩১-এ গাঁধীজি জোড়াসাঁকোর বিচিত্রা ভবনে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে প্রায় চার ঘণ্টা ধরে আলাপ-আলোচনা করেন। গাঁধীজির উদ্দেশ্য ছিল সত্যাগ্রহ আন্দোলনের বিরুদ্ধে রবীন্দ্রনাথ যে বিরুদ্ধমত প্রকাশ করেছিলেন সেটা বন্ধ করা এবং কবি যেন সত্যাগ্রহকে অন্তত তাঁর আশীর্বাদটুকু জানান।(৫) বলাবাহুল্য গাঁধীজি অকৃতকার্য হন। এই আলোচনা হয়েছিল রুদ্ধদ্বারে। কবি ও গাঁধীজি ছাড়া এ আলোচনায় উপস্থিত ছিলেন মাত্র আর একজন দীনবন্ধু এনড্রজ। বস্তুত তিনিই এ-দুজনকে একত্র করেছিলেন; তার আশা ছিল, সামনাসামনি আলাপচারি হলে হয়তো দুজনের মতের মিল হয়ে যেতে পারে। ভারতবর্ষের মঙ্গলের জন্য তিনি এই দুই প্রখ্যাত ব্যক্তির মধ্যে প্রকাশ্য সংঘর্ষ বন্ধ করতে চেয়েছিলেন।(৬)
এ মোলাকাত সম্বন্ধে একটি হাফ-লেজেন্ড আছে। তবে সেটা অবনীন্দ্রনাথকে দিয়ে। তিনি বললেন, এত বড় জব্বর একটা পেল্লাই ব্যাপার এলাহি কাণ্ড হয়ে যাচ্ছে আর আমরা দেখতে পাব না, শুনতে পাব না? আচ্ছা দেখি। অর্থাৎ শব্দার্থেই তিনি দেখে নিলেন কি-হোল দিয়ে, কীভাবে দুই জাদরেল ও তাঁদের মধ্যিখানের সেতুবন্ধ এনড্রজ আসন গ্রহণ করেছেন। বিচিত্রা বাড়িতে বিলিতি কেতায় কি-হোল আছে কি না জানিনে; তবে হয়তো তিনজনের আসন নেওয়ার পর বাইরের থেকে দরজায় খিল দেওয়ার পূর্বে তিনি একঝলক দেখে নিয়েছিলেন। আপন বাড়িতে ফিরেই তিনি একে ফেললেন একখানা বেশ বড় সাইজের গ্রুপ ছবি। মুখোমুখি হয়ে বসেছেন দুজনা দু প্রান্তে। তাদের বসার ধরন টিপিকাল- ঠিক এই ধরনেই তারা আকছারই বসতেন। আর গাঁধীর পিছনে একপাশে বসেছেন এনড্রজ। এর তিন মাস পরে বাৎসরিক কলাপ্রদর্শনীতে অবনবাবু ছবিখানি এক্সিবিট করলেন। দাম দেখে তো বিশ্বজনের চক্ষুস্থির। সেই আমলে– আবার বলছি সেই আমলে– পনেরো হাজার টাকা! কে একজন বলল, দামটা বড্ড বেশি হয়ে গেল না? অবনবাবু শেয়ানা বেনের মতো হেসে বললেন, বা রে! আমি তো সস্তায় ছাড়ছি। এদের প্রত্যেকের দাম পাঁচ-পাঁচ হাজারের চেয়ে ঢের ঢের বেশি নয় কি? এ ছবি যখন কেউ কিনল না, তখন অবনবাবু বললেন, এটা কাকে দেওয়া যায়? রবিকাকা হেথায়, গাঁধী হোথায়। তবে কি না এনড্রজের নিবাস বলতে যদি কিছু থাকে তবে সেটা তো রবিকাকার ছায়াতেই। দুজন যখন শান্তিনিকেতনে তখন এটা যাক ওখানকার কলাবনে। এ ছবি অনেকেই নিশ্চয় কলাভবনে দেখেছেন। তবে দীর্ঘ ৪৮ বৎসর পর রঙ বড় ফিকে হয়ে গিয়েছে।
১৯২৫-এর ২৯ মে গাঁধীজি আবার রবীন্দ্রনাথকে স্বপক্ষে টানবার জন্য শান্তিনিকেতন আসেন এবং দুদিন সেখানে থাকেন। ইতোমধ্যে শান্তিনিকেতনেই ৯০ খানা চরকা ও তকলি চলিতেছে– বিধুশেখর, নন্দলাল প্রভৃতি সকলেই চরকা কাটিতেছেন। আবহাওয়া তা হলে অনুকূল। প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় লিখছেন : তিনি (গাধী) শান্তিনিকেতনে আসিতেছেন, রবীন্দ্রনাথের সহিত চরকা সম্বন্ধে আলোচনাই প্রধান উদ্দেশ্য। গাঁধীজি জানিতেন কবি তাহার সহিত চরকা সম্বন্ধে একমত নহেন, তবুও বোধহয় বিশ্বাস ছিল যে, নিজের ঐকান্তিকতার বলে তিনি কবিকে তাহার পথে আনিতে পারিবেন। দুই দিন তাহাদের দীর্ঘ আলোচনা চলে, বলা বাহুল্য কেহ কাহাকেও নিজ মতে আনিতে পারেন নাই। তৎসত্ত্বেও এখানে বলিয়া রাখি, উভয়ের প্রতি পূর্ববই অক্ষুণ্ণ রহিল।*[* * প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়, রবীন্দ্রজীবনী, ৩য় খণ্ড : পৃ. ১৬৪।]
২৯-এ গ্রীষ্মবকাশের মাঝখানে পড়ে। আমি তখন দেশে, সিলেটে।
ফিরে এসে কী আলোচনা হয়েছিল সে সম্বন্ধে নানা মুনির নানা কীর্তন শুনলুম। কিন্তু সেসব রসকষহীন আলোচনা নিয়ে লেজেন্ডের গোড়াপত্তন হয় না। আমি বলতে চাই অন্য জিনিস।
ফিরে এসেই গেলাম আমার মুরুব্বি গাঙ্গুলীমশাইকে আদাব-তসলিমাত জানাতে। শুনেছি, ইনি রবীন্দ্রনাথের অতি প্রিয় বউদির (জ্যোতিরিন্দ্রনাথের স্ত্রী আত্মীয় ছিলেন। গাঙ্গুলীমশাই ছিলেন শান্তিনিকেতন গেস্ট হাউসের ম্যানেজার। সে আমলে শান্তিনিকেতন মন্দিরের কাছে যে পাকা দোতলা বাড়ি (এইটেই আশ্রমে মহর্ষি-নির্মিত প্রথম বাড়ি এবং বর্তমান বোধহয় বিশ্বভারতীর দর্শন বিভাগের আস্তানা) সেইটেই ছিল গেস্ট হাউস। তারই নিচের তলায় একটি ছোট্ট কামরায় মিলিটারি বুট তথা হাফ মিলিটারি ইউনিফর্ম পরিহিত, হীতলাল প্রভৃতি দাসবংশ কর্তৃক সমাদৃত হয়ে সাতিশয় ফিটফাট রূপে বিরাজ করতেন মহাপ্রতাপান্বিত মহারাজ প্রমোদ গঙ্গোপাধ্যায় বা গাঙ্গুলীমশাই। বিরাজ করতেন বললে বড়ই অগ্লোক্তি করা হয়– রামায়ণী ভাষায় বলতে গেলে শ্রীরামচন্দ্রের ন্যায় গাঙ্গুলিমশাই ম্যানেজার পদে প্রতিষ্ঠিত হইয়া অপ্রতিহতভাবে রাজ্যশাসন ও অপত্যনির্বিশেষে অতিথিশালায় পঞ্জাব সিন্ধু গুজরাট মারাঠা দ্রাবিড় উৎকল বঙ্গ তথা অষ্টকূলাচল সপ্তসমুদ্র থেকে রবিমন্দ্রিত দেশ দেশ নন্দিত করি ভেরীর আহ্বানে সমাগত হিন্দু বৌদ্ধ জৈন পারসিক মুসলমান খ্রিস্টানি অতিথি সজ্জনকে যেন প্রজাপালন করিতেন। তার দাপট তাঁর রওয়াবের সামনে দাঁড়াতে পারেন এমন লোক আশ্রমে সে আমলে ছিলেন কমই। লোকে বলে, তিনি যখন গেস্ট হাউসে বসে হীতলাল! বলে হুঙ্কার ছাড়তেন তখন এক ফার্লং দূরে রতন কুটিতে প্রফেসর মার্ক কলিগের ছোকরা চাকর পঞ্চা আঁতকে উঠত তার পিলে চমকে উঠে এপেনডিসের সঙ্গে স্ট্যাম্বুলেটেড হয়ে যেত।
