এর পর যখন অনুবাদক চারণ বলবে, হুজুরকে জনগণ ঐক্যবিধায়ক বলা হয়েছে তখন তিনি বহুযুগসঞ্চিত রাজগৌরব প্রসাদাৎ তার ঠা ঠা করে অট্টহাস্য করার অদমনীয় উচ্ছলাচরণ দমন করে মনে মনে মৃদু হাস্য করে বলবেন, বটে! আমাদের নীতি আমাদের ধর্ম ডিভাইড অ্যান্ড রুল দ্বিধা করে সিধা রাখো। আর এ প্রাইজ ইডিয়ট বলে কী? আমি নাকি ঐক্যবিধায়ক। হোলি জিজস!
এর পর চারণ কাচুমাচু হয়ে বলবে, হুজুর মধ্যিখানের প্যারা খুঁজে পাচ্ছিনে। দুসরা কপি এখুনি এল বলে। ইতোমধ্যে শেষ প্যারাটি অনুবাদ করি। রাজা আমনে শুনতে শুনতে হঠাৎ খাড়া হয়ে বসবেন। কী বললে? পূর্ব গিরিতে রবি উদিল? রবি তো রবীনডর ন্যাট ট্যাগোর– দ্যাট নেটিভ?
চারণ সভয়ে বলবে, এজ্ঞে হ্যাঁ। কারণ একথা তো বিলকুল খাঁটি যে রবি কবি পূর্বদেশে, প্রাচ্যে জন্মেছেন, পূর্ব উদয়গিরিভালে তিনি রাজটীকা।
রাজা জর্জ তো রেগে টঙ। কী, কী-আস্পদ্দা। কাউকে যদি পূর্বদেশে, ভারতে উদয় হইতেই হয় তবে সে হব আমি। তার পর গরগর করে বলবেন, ভাইসরয়টাকে বলে গে, পুবের মণিপুর পাহাড়ের উপর সিংহাসন যেন পাতা হয়। আমি যেখানে উদিত হব। আশ্চর্য, এত বড় একটা ফশন ডংকিগুলো বেবাক ভুলে গেছে। চিফ অব্ প্রটোকল মাস্টার অব সেরিমনিজকে এক্ষুনি ডিসমিস কর।
ইতোমধ্যে মিসিং দুই প্যারা এসে গেছে। অনুবাদক তো ভয়ে কাঁপছে। অনুবাদ করে কী প্রকারে শেষটায় ভয়ে না নির্ভয়ে ইত্যাদি ফরমুলা কেতাদুরস্ত করে বলল, হুজুর, কবি বলছে, আপনি চিরসারথি, আপনি শখ বাজাচ্ছেন (হে চিরসারথি তব…শঙ্খধ্বনি বাজে)।
রাজা তো রেগে টঙ। ক্রোধে জিঘাংসায় বেপথুমান হয়ে হুঙ্কারিলেন, কী! এত বড় বেআদবি, বেইজ্জতি বেত্তমিজি! এ তো লায়েসা মাজেস্টাস (laesa majestas)। হিজ ম্যাজেস্টিকে অপমান। অবশ্য নেটিভটা লাতিন লায়েসা মাজেষ্টাস জানে না। কিন্তু এটাও কি জানে না, এর চেয়ে শতাংশের একাংশ অপরাধ করেও, কোনও কোনও স্থলে না করেও ব্রিটিশ রাজে লক্ষ লক্ষ লোক ফাঁসি গেছে।
অসহ্য অসহায়। আমাকে বলছে সারথি। মোটর ড্রাইভার। আমার বাবা এডওয়ার্ড যখন ইহজগতের স্বপ্নাতীত অকল্পনীয় সর্বশ্রেষ্ঠ সর্বপ্রথম ডেমলার গাড়ি নিয়ে তাঁর কাজিন কাইজারকে বার্লিনে দেখতে যান তখন কাইজার বিস্ময়ে অভিভূত ছোট বাচ্চাটার মতো নাগাড়ে সাড়ে-তেরো ঘণ্টা গাড়িটার পালিশের উপর হাত বুলিয়েছিলেন। বাবা সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলেন একটা গাড়ির জন্য বারোটা ড্রাইভার। আর আজ আমাকে রাজাকে বলছে আমি মোটরড্রাইভার, ফোর। আমার আস্তাবলে ক-শো ড্রাইভার আছে তার খবর আমার প্রাইভেট সেক্রেটারি পর্যন্ত জানে না। আর আমি নাকি ওহ্।
তার পর বিড়বিড় করে যেন আপন মনে বললেন, আর বলছে কী, আমি নাকি চিরসারথি। আমি চিরকাল ড্রাইভার থাকব। পার্মেনেন্ট পোস্ট। আমার প্রমোশন তক হবে না। আমি এমনই নিষ্কমা চোতা রদী ড্রাইভার! হোলি মৈরি– হ্যাঁ, নেটিভরা মাইরি বলে বটে–আমি যদি এ লোকটাকে আমার রোলসের চাকায় বেঁধে না, আগে তো বলডুইনের এজাজৎ চাই। ড্যাম বলডুইন! আর আমি শাঁখ বাজাই। পল্টনের বিউগলে ফুঁ দি। ছি ছি।
চারণ আবার সভয় নির্ভয় করে নিয়ে বলল, হুজুরকে বলেছে স্নেহময়ী মাতা।
এবারে রাজা লক্ষ দিয়ে সিংহাসন ত্যাগ করলেন। অবশ্য অন্য কারণও ছিল।
সিংহাসনে কোচের মতো স্প্রিং থাকে না। থাকে পাতলা একখানি কুশন। কংগ্রেসের সম্মানিত সিডিশাস মেম্বার ভারতীয় ছারপোকার পাল সেখানে বাসা বেঁধে হুজুরের কোমলাঙ্গে তখন ব্যাংকুয়েট পরবের মাঝখানে।
কম্পিত কণ্ঠে রাজা বললেন, আমি এখুনি ফিরে যাচ্ছি দেশে। সব সইতে পারি। কিন্তু আমি মা, আমি স্ত্রীলোক! বুঝেছি লোকটার ইনসলেন্স। বলতে চায়, কূটনৈতিক কারণে, রাষ্ট্রের কল্যাণের জন্য–rasion d tat– আমি মাগী হওয়া সত্ত্বেও মেকডনান্ড বলডুইন আমাকে মন্দার বেশে সাজিয়েছে। আমি আসলে মেনি, ওরা আমাকে পরিয়েছে হুলোর ছদ্মবেশ।
কাঁপতে কাঁপতে রাজা কার্পেটে বসে পড়লেন। প্রায় কান্নার সুরে বললেন, সেদিন শিকারের সময় এক নেটিভ শিকারি বলেছিল, এক আসামি নাকি দারোগাকে বলেছিল, হুজুর, আমার মা বাপ। দারোগা নাকি বলেছিল, বাপ হতে পারি, কিন্তু আমাকে মা বলছিস কেন? আমি কী স্যারি (শাড়ি পরি। শিকারি আমাকে বলেছিল, হুজুর, আসামি যদি শুধু বাপ বলত তবে দারোগা ছেড়ে দিত। মা বলেছিল বলে সেশনে সোপর্দ করল। ফাঁসি হল। … দারোগাকে মেনি বলাতে সামান্য দারোগা ফাঁসিকাষ্ঠে চড়াল। আর আমি ইংলন্ডেশ্বর, অ্যান্ড অব্ দি ডমিনিয়নস বিওন্ড দি সিজ, ডিফেন্ডার অব ফেথ, এপারার অব্ ইন্ডিয়া। আর এই শেষেরটা কী কারসিকতা! আমি কি বকিংহম পেলেসে নিভৃতে পেটিকোট পরি, ঠোঁটে নখে আলতা মাখি! ওহ! অসহ্য অসহ্য!
তার পর রাজা কোর্ট-গেজেট প্রকাশ করলেন, ওই নেটিভ টেগোরের গান আমার উদ্দেশে লেখা নয়।
তথাপি এ-লেজে মরে না।
কিন্তু এ কাহিনী এখানে বন্ধ করি। হালে বঙ্কিমচন্দ্রের রামায়ণ-সম্বন্ধে একটি রচনা হিন্দিতে অনুবাদিত হলে তার বিরুদ্ধে দিল্লির আদালতে ডবল ফৌজদারি মোকদমা রুজু হয়েছে। বঙ্কিমবাবু নাকি বিস্তর ছুটোছুটি করেও একটা বটতলার চারআনি মোক্তারও পাচ্ছেন না– অথচ একদা তিনি স্বয়ং দুদে ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন। তাবৎ ছাতুখোর খোটা চুরনবেচনে-ওলাকে বংশধর লালাজি ব্যারিস্টার দারুণ চটিতং … পাঠক, তিষ্ঠ ক্ষণকাল টেলিফোন বাজছে।
