বস্তুত কি চা, কি মাছ-মাংস কোনও জিনিসেই রবীন্দ্রনাথের আসক্তি ছিল না–যা সামান্য ছিল সেটা মিষ্ট-মিষ্টান্নের প্রতি। টোস্টের উপর প্রায় কোয়ার্টার ইঞ্চি মধুর পলেস্তরা পেতে জীবনের প্রায় শেষ বৎসর অবধি তিনি পরম পরিতৃপ্তি সহকারে ওই বস্তু খেয়েছেন।(৩) মিষ্টান্ন তো বটেই বিশেষ করে নলেন গুড়ের সন্দেশ। বস্তুত রবীন্দ্রনাথের মতো ভোজনবিলাসী আমি কমই দেখেছি। এবং প্রকৃত ভোজনবিলাসীর মতো পদের আধিক্য ও বৈচিত্র্য থাকলেও পরিমাণে খেতেন কম– তার সেই পাঁচ ফুট এগারো ইঞ্চি দৈৰ্ঘ্য ও তার সঙ্গে মানানসই দোহারা দেহ নিয়ে প্রয়োজনের চেয়ে ঢের কম। ফরাসিতে বলতে গেলে তিনি ছিলেন গুরূমে (ভোজনবিলাসী, খুশখানেওলা); সুরমা (পেটুক) বদনাম তাঁকে পওহারী বাবা (এই সাধুজি নাকি শুধুমাত্র পও = বাতাস খেয়ে প্রাণধারণ করতেন) পর্যন্ত দেবেন না।
লেজেন্ড সম্বন্ধে এইবারে শেষকথাটি বলে মূল বক্তব্যে যাব।
লেজেন্ডের একটা বিশেষ সুস্পষ্ট লক্ষণ এই; দার্শনিক বৈজ্ঞানিক গুণীজ্ঞানীরা যতই কট্টর কট্টর অকাট্য যুক্তিতর্ক দিয়ে প্রমাণ করুন না কেন যে, বিশেষ কোনও একটা লেজেন্ড সম্পূর্ণ ভ্রমাত্মক, তবুও তারা সে লেজেন্ড আঁকড়ে ধরে থাকে। এখনও বিস্তর লোক বিশ্বাস করে পৃথিবীটা চেপ্টা, শোনে ভূতপ্রেত, গোরস্তানে মামদো আছে; ইংরেজ বিশ্বাস করে সে পৃথিবীর– সরি, বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সর্বোৎকৃষ্ট নেশন, ইত্যাদি ইত্যাদি।
এস্থলে আরও বলে নিই; মহাপুরুষদের যারা বিরুদ্ধাচরণ করে তারাও তাদের সম্বন্ধে বিপরীত লেজেন্ড তৈরি করে। যেমন খ্রিস্টবৈরী ইহুদিরা বলেছে প্রভু খ্রিস্ট ছিলেন মাতাল, তিনি শুঁড়িদের (পাবৃলিকাস ইতরজনের সাহচর্যে উল্লাস বোধ করতেন, এবং নর্তকী বেশ্যাদের সেবা গ্রহণ করতে কুণ্ঠাবোধ করতেন না (মেরি ম্যাগডলিন)।
বাঙলা দেশে একটা দল আছে। সেটা কতু-বা বর্ষার প্লাবনে দুর্বার গতিতে বন্যা জাগিয়ে জনপদভূমির সর্বনাশ করে যায় আর কভু বা বৎসরের পর বৎসর ফধারা পারা অন্তঃসলিলা থাকে। এ দল পরপর রামমোহন, দেবেন্দ্রনাথ, ঈশ্বরচন্দ্র এবং সর্বশেষে রবীন্দ্রনাথের বিরুদ্ধাচরণ করে উপস্থিত ফরু-পন্থানুযায়ী অন্তঃসলিলা। মোকা পেলে বুজবু করে বেরুতে চায়। এদের জন্ম নেবার কারণ সম্বন্ধে এস্থলে আলোচনা করব না।
রবীন্দ্রনাথ চা খেতেন না– এটা নিরীহ, হামলেস লেজেন্ড। কিন্তু এই দল প্রচার করে যে, রবীন্দ্রনাথ শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের ক অক্ষরও জানতেন না, তিনি ছিলেন সুরকানা, মামুলি রাগরাগিণী তিনি ঘুলিয়ে ফেলতেন এবং বিলিতি গান-বাজনার প্রতি তার ছিল অন্ধ ভক্তি। তাই গোড়ার দিকে তার গানের কথাতে সুর দিতেন জ্যোতিরিন্দ্রনাথ এবং পরবর্তীকালে তাবৎ রবীন্দ্রসঙ্গীতের সুর দিয়েছেন দিনেন্দ্রনাথ!! এস্থলে পুনরায় বলতে হয় : হরি হে তুমিই সত্য।
দ্বিতীয় লেজেন্ড : আমাদের জাতীয় সঙ্গীত জনগণমন রবিঠাকুর রচনা করেন রাজা পঞ্চম জর্জের উদ্দেশে। এদের যুক্তি এই প্রকার :
(১) জনগণমন-অধিনায়ক তারতভাগ্যবিধাতা একজন রাজা (কারণ রাজাই তো জনগণের ভাগ্যনির্ণয় করেন)।
(২) পঞ্চম জর্জ রাজা।
অতএব জনগণমন-অধিনায়ক ভারতভাগ্যবিধাতা স্বয়ং পঞ্চম জর্জ।
কুয়োট এরাট ডেমনস্ট্রাভুম (g. E. D.)। আমেন আমেন। সুশীল পাঠক, অবধারিত হোন, যে দল এ-লেজেডের বিষবৃক্ষ রোপণ করেছিল তারা সেটা সত্য জানা সত্ত্বেও সজ্ঞানেই করেছিল। এরা জ্ঞানপাপী। এবং এরা বিলক্ষণ অবগত ছিল, সমসাময়িক বিশ্বাসভাজন শ্রদ্ধেয় গুণীজ্ঞানীরা এই কিম্ভূতকিমাকার থিয়োরিকে দলিলদস্তাবেজ, প্রমাণপত্র, সাক্ষীসাবুদ, যুক্তিতর্ক দ্বারা নস্যাৎ ধূলিসাৎ তো করবেনই, তদুপরি করলারি বা ফাউ হিসেবে আরও প্রমাণ করে দেবেন, এই বিষবৃক্ষরোপণকারীরা হস্তীমূর্খ রামপন্টক (কন্টক থেকে কাটা, পন্টক থেকে পাঠা– জ্ঞানবৃদ্ধ রসসিদ্ধ সুনীতি উবাচ)। কিন্তু এ-দলের চর্ম কাজিরাঙার গণ্ডারবিনিন্দিত বৰ্মসম স্কুল। তাই আমার যখন একদা চর্মরোগ হয় তখন আমার সখা ও শিষ্য চর্মরোগ-বিশেষজ্ঞ ড. লি আমাকে সলা দেন, আপনি পরনিন্দা আরম্ভ করুন। চামড়াটি গারের মতো হয়ে যাবে। গণ্ডারের চর্মরোগ হয় না।
তাই যখন অধুনা খবরের কাগজে দেখতে পাই শ্রীযুক্তা ইন্দিরাকে জনগণমন অধিনায়িকারূপে উল্লেখ করা হয়েছে তখন আমি রীতিমতো শঙ্কিত হই। আজ ইন্দিরা, কাল জ্যোতিবাবু, পরও আপনার মতো নিরীহ পাঠককে হয়তো জনগণমন-অধিনায়ক বলে বসবে, অর্থাৎ পরমেশ্বরের পর্যায়ে তুলে দেবে। কিন্তু এ পয়েন্টটি থাক।
কিন্তু প্রশ্ন এই, জাতীয় সঙ্গীতটি ইংরেজিতে অনুবাদ করে পঞ্চম জর্জকে শোনালে কি হিজ ম্যাজেস্টি আপ্যায়িত হতেন মোটেই না।
আইস পাঠক! গানটি বিশ্লেষণ করহ।
ভারতভাগ্যবিধাতা যে তিনি, সেকথা শুনে রাজা নিশ্চয়ই মনে মনে শুকনো হাসি হাসতেন। তিনি বিলক্ষণ জানেন, তিনি তার মাতৃভূমি ইংলন্ডেরও ভাগ্যবিধাতা নন। তাঁর আপন ভাগ্যই নির্ণয় করেন তাঁর (হ্যাঁ তারই- মশকরা আর কারে কয়?) প্রধানমন্ত্রী পার্লামেন্টের চুড়োয় বসে। তিনি অবশ্য তখন জানতেন না যে তার যুবরাজ রাজা হবার পর যখন এক এড়িকে (লগ্নচ্ছি = ডিভোর্সড় = তালাকপ্রাপ্তা) বিয়ে করতে চাইবেন তখন তার (!) প্রধানমন্ত্রী তাকে কানটি ধরে দেশ থেকে বের করে দেবেন। এবং তার নাতনি যখন রানি হবেন তখন তার স্বামী রানা (রাজার স্ত্রীলিঙ্গ রানি কিন্তু রানির স্বামী যদি রাজা না হন তবে রানি শব্দ থেকে পুংলিঙ্গ নির্মাণ করে রানা শব্দ ব্যবহার করা হয়। তাই রানি এলিজাবেথের স্বামী রাজা নন, তিনি রানা) ডুক অ এড়া ভিখিরির টোল-খাওয়া মাখনের টিন হাতে করে পার্লামেন্ট বাড়ির সামনে এসে হাঁকবেন দুটো চাল পাই না, আর গেরস্তু-গিন্নি প্রধানমন্ত্রী বাড়ির দরজা এক বুড়ো আঙুল ফাঁক করে (অবশ্য অষ্টরম্ভা দেখিয়ে বিরক্তকণ্ঠে বলবেন ঘরে চাল বাড়ন্ত। প্রধানমন্ত্রী মুসলমান হলে বলবেন, ফিরি মাঙো–অর্থাৎ অন্য বাড়ি যাও।
