ফারসি ভাষাতে তাই প্রবাদ আছে, পিরেরা ওড়েন না, তাদের চেলারা ওঁদের ওড়ান পিরহা নমিপরন্দ, শাগির্দান উন্হারি মি পরানন্দ–অর্থাৎ আমাদের পির উড়তে পারেন। তবে কি না সে অলৌকিক দৃশ্য সবাই দেখতে পায় না।
অর্থাৎ,
অদ্যাপিও সেই লীলা খেলে গোরা রায়।
মধ্যে মধ্যে ভাগবানে দেখিবারে পায়
এস্থলে লক্ষণীয় আপনার-আমার মতো পাঁচু-ভূতোকে নিয়ে কেউ ক্ষুদ্রস্য ক্ষুদ্র লেজেন্ডও নির্মাণ করে না। করবার কোনও প্রয়োজন বোধ করে না।
তাই আশ্চর্য হলুম একটা ব্যাপার দেখে। কিছুদিন পূর্বে এই গৌড়ভুমির এক মহাপুরুষকে নিয়ে জনৈক সুপণ্ডিত গভীর গবেষণামূলক একখানি পুস্তিকা প্রকাশ করেন। তাঁর বক্তব্য থিসিস–ওই মহাপুরুষকে নিয়ে যেসব অলৌকিক ঘটনার উল্লেখ আছে সেগুলো নিছক রূপকথা, সোজা বাংলায় গাঁজা-গুল; আসলে উনি ছিলেন অত্যন্ত সাদামাটা সাধারণ জনের একজন।
এ থিসিস ধোপে কতখানি টেকে কি না-টেঁকে সেটা আমি বলতে পারব না– আমার পশ্চাদ্দেশে লোহার শিকলি দিয়ে টাইম বম বেঁধে দিলেও প্রাণ বাঁচাবার জন্যও (যদ্যপি পয়গম্বর সাহেব বলেছেন, জান্ বাঁচানো ফর্জ। নামাজ রোজার মতোই ফর্জ অর্থাৎ অবশ্য-কৰ্তব্য কর্ম, না করলে সখৎ শুনাহ বা কঠিন পাপ হয়!
তাই আমি ওই লেখককে (তিনি যে সত্যই সুপণ্ডিত সে-বিষয়ে আমার মনে কোনও দ্বিধা নেই, কারণ আমি তার একাধিক গভীর গবেষণাময় সুচিন্তিত পুস্তক পড়েছি) মাত্র একটি প্রশ্ন শুধোতে চাই। সেই আলোচ্য মহাপুরুষ যদি আসলে অতই সাদামাটা সাধারণজন হন তবে তার সম্বন্ধে অত লেজেন্ড, অত অলৌকিক কাহিনী নির্মাণ করবার দায় পড়েছিল কোন গণ্ডমূর্খ-মণ্ডলীর ওপর। লেজেন্ডগুলো সত্য না মিথ্যা সে বিচারের গুরুভার বিধাতা এ হীনপ্রাণের স্কন্ধে রাখেননি। আমি শুধু জানি, সাধারণজনকে দিয়ে মানুষ অলৌকিক কর্ম করায় না; যদি বা অতি, অতিশয় দৈবেসৈবে, দু-একজনকে নিয়ে লেজেন্ড তৈরি করে, তবে প্রথম পরশুরামের বিরিঞ্চি স্মরণে এনে তার পর কাশীরামদাসের শরণ নিতে হয় :
কতক্ষণ জলের তিলক থাকে ভালে।
কতক্ষণ থাকে শিলা শূন্যেতে মারিলে—
তাবৎ লেজেন্ডই যে নৈসর্গিক নিয়মভঙ্গকারী অলৌকিক কর্ম, মিরাকল হবে, এমন কোনও পুদার কসম বা কালীর কিরে নেই। সাদামাটা, হার্মলেস লেজেন্ড আজকের দিনেও নির্মিত হয়। পাঠক হয়তো প্রত্যয় যাবেন না, কিন্তু হয়, হয় এই বিংশ শতাব্দীর ষষ্ঠ সপ্তম দশকে। অন্তত নব লেজেন্ডের ফাউন্ডেশন স্টোন পোঁতা হয়।
ওই তো সেদিন পত্রান্তরে পড়লুম, জনৈক লেখক লিখেছেন, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ চা পান করতেন না। আমি তো বিস্ময়ে স্তম্ভিত। আমি তাকে বহু-বহুবার চা খেতে দেখেছি, এ-দেশি চা, যাকে সচরাচর ব্ল্যাক টি বলা হয়, উত্তম গোত্রবর্ণের অর্থাৎ, উজ্জ্বল সোনালি রঙের চা হলে তারিফ করতে শুনেছি। একবার চীন দেশ থেকে গ্রিন টি (যদিও গরম জলে ঢালার পর রঙ এর হয়ে যায় ফিকে লেমন ইয়োলো) আসে গুরুদেবের কাছে। সে চায়ের শেষ পাতাটুকু পর্যন্ত তাঁকে সদ্ব্যবহার করতে দেখেছি।
তা হলে এ লেজেন্ডের মূল উৎস কোথায়? এ শতাব্দীর গোড়ার দিকে চা-বাগানের কুলিদের উপর বর্বর ইংরেজ ম্যানেজার (আই.সি.এস.-দের তাচ্ছিল্যব্যঞ্জক ভাষায় বক্স-ওয়ালা–কারণ তারা চায়ের বাক্স নিয়ে কারবার করে) কী পৈশাচিক অত্যাচার করত সে-সংবাদ বাঙালি জনসাধারণের কানে এসে পৌঁছয়। তখন চায়ের নামকরণ হয় কুলির রক্ত এবং অনেকেই এই কুলির রক্ত চায়ের পাতা বাড়ি থেকে চিরতরে নির্বাসনে পাঠান, কাউকে চা পান করতে দেখলে ঘৃণামিশ্রিত উচ্চকণ্ঠে সর্বজনসমক্ষে বলতেন, লজ্জা করে না মশাই, কুলির রক্ত পান করতে। রবীন্দ্রনাথ এ আন্দোলনের খবর রাখতেন; বিশেষ করে যখন স্মরণে আনি, যে-স্বর্গত শশীন্দ্র সিংহ তাঁর সাপ্তাহিক ইংরেজি খবরের কাগজে সপ্তাহের পর সপ্তাহ ধরে অকুতোভয়ে চা-বাগানের টমকাকার কুটির লিখে লিখে বাঙালির দৃষ্টি আকর্ষণ করেন তাঁর সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ সুপরিচিত ছিলেন। অতএব আজ যিনি এক লেজেন্ডের প্রথম চিড়িয়া ওড়ালেন যে রবীন্দ্রনাথ চা খেতেন না, তিনি হয়তো ধরে নিয়েছেন যে, রবীন্দ্রনাথ নিশ্চয় তখন আর পাঁচজন সহানুভূতিশীল বাঙালির মতো চা বয়কট করেছিলেন এবং জীবনে আর কখনও চা খাননি। বয়কট হয়তো তিনি করেছিলেন–কিন্তু নিশ্চয়ই সেটা কিয়ৎকাল (এবং স্মরণে রাখা উচিত সে-যুগে চায়ের এত ছড়াছড়ি ছিল না বোধহয় মোটামুটি গত শতাব্দীর শেষ দশক পর্যন্ত অভ্যন্তরীণ স্টিমার প্যাসেনজারদের মুফতে চা পান করানো হত), কারণ পূর্বেই নিবেদন করেছি ১৯২১ থেকে ১৯২৬ পর্যন্ত আমি তাকে বহুবার চা পান করতে দেখেছি।(১) তবে চায়ের প্রতি রবীন্দ্রনাথের কোনও আসক্তি ছিল না।
প্রায়ই চা ছেড়ে দিয়ে কিছুকালের জন্য অন্য কোনও পানীয়তে চলে যেতেন। গরমের দিন বিকালে চা বড় খেতেন না– বদলে খেতেন বেলের, তরমুজের শরবত (নিমপাতার শরবতের কথা সকলেই জানেন)। সকাল-বিকেল ছাড়া অবেলায় টিপিকাল বাঙালির মতো তাকে আমি কখনও বেমক্কা চা খেতে দেখিনি। এবং
বর্ণনাটা ক্ষান্ত করি, অনেকগুলো কাজ বাকি,
আছে চায়ের নেমন্তন্ন, এখনও তার সাজ বাকি।(২)
স্মরণে আনুন। অবশ্য চায়ের নেমন্তনে চা খেতেই হবে এমন আইন হিটলারও করেননি যদ্যপি তিনি দিনে-রাতে এভলেস (অসংখ্য, অন্তহীন) কাপস্ অব টি পান করতেন অতিশয় হালকা, মিন-দুধ।
