মেঘে মেঘে বেলা হয়ে গেল। হঠাৎ উপলব্ধি করলুম বয়স ষোল। ওদিকে ক্লাস ফাইভের যোগাসন আর পরিবর্তিত হচ্ছে না। দুনিয়ায় যত ডানপিটেমি নষ্টামির মামদো উপযুক্ত পীঠস্থান পেয়ে আমার স্কন্ধে কায়েমি আসন গেড়েছে। আমার তথাকথিত অপকর্মের বয়ান আমি দফে দফে দেব না। তবে এইটুকু বলতে পারি, পরীক্ষার হলে বেঞ্চি-ডেসকো ভাঙা, ট্রামবাস পোড়ানোর কথা শুনলে আমার ঠা ঠা করে উচ্চহাস্য হাসতে ইচ্ছে যায়। আরেকটি কথা বলতে পারি, আজ যে শ্রীহট্ট বার-এর আসামি পক্ষের উকিলরূপে সর্ববিখ্যাত মৌলতি সইফুল আলম খান– তিনি বাল্য বয়সেই কোথায় পেলেন তার প্রথম তালিম? আমার অপকর্ম পদ্ধতি (মডুস অপারেনডি) অপকর্ম গোপন করার কায়দা যে নব-নব রূপে দেখা দিত সেগুলো কি তিনি আমার সহপাঠী কনফিডেন্ট রূপে আগাপাশতলা নিরীক্ষণ করে তারই ফলস্বরূপ আজ উকিল সভায় স্বর্ণাসনে বসেননি!
তবু যদি পেত্যয় না যান তবে তঙ্কালীন আসামের আই.জি, অবসরপ্রাপ্ত শ্ৰীযুত–দত্তকে শুধোবেন। শুটনিক আর কতখানি উঁচুতে গিয়েছিল। তাঁর দফতরে মৎ-বাবৎ যে ফাইল উঁচু হয়েছিল তার সঙ্গে সে পাল্লা দিতে পারে এবং সানন্দে আপনাদের জানাচ্ছি প্রত্যেকটি ফাইলের উপর মোটা লাল উড পেন্সিলে লেখা প্রমাণাভাব প্রমাণাভাব। বেনিফিট অব ডিউটি নামক প্রতিষ্ঠানটি যে মহাজন আবিষ্কার করেছিলেন তাকে বার বার নমস্কার।
কিন্তু দুস্তর সন্তাপের বিষয়, ইহসংসারের হেডমাস্টারকুল এই প্রতিষ্ঠানটিকে যথোচিত সম্মান শ্রদ্ধা করেন না। সে সৎসাহস তাদের নেই। থাকলে আমার সোনার মাতৃভূমি শিক্ষাদীক্ষায় আজ এতখানি পশ্চাৎপদ কেন। আমার নাম দু-দুবার ব্ল্যাক বুক-এ উঠল পর্যাপ্ত প্রমাণাভাব সত্ত্বেও। হেডমাস্টার নাকি মরালি সারটন হয়ে যে কোনও চার-আনি বটতলার মোকতারও বলবে, এটা ঘোর ইলিগালি অনসারটন- আমার নাম কালো কেতাবে তুলেছেন। আরেকটা ঘটনা নাকি তিনি স্বচক্ষে দেখেছিলেন। এটা যে কীরকম সংবিধান বিরোধী উল্টা ভিরেস (গাড়ল ইংরেজের উচ্চারণে আলট্রা ভাইয়ারিজ বেআইনি স্বেচ্ছাচারিতা, সেটা বুঝিয়ে বলতে হবে না : হেডমাস্টার তো সেখানে সাক্ষী, তিনি সেখানে বিচারক হন কোন আইনে? এ স্বতঃসিদ্ধটা তো স্কুল-বয় জানে। জানেন না শুধু হেডমাস্টার। তাই বিবেচনা করি, যে স্কুল-বয় এ তত্ত্বটা জানে না সে-ই আখেরে হেডমাস্টার হয়।
তৃতীয়বার কোনও অপকর্ম করলে কালো কেতাবে নাম ওঠে না। তাকে গলাধাক্কা দিয়ে সুর্মা নদীর কালো চোখের সুর্মা কালো) জলে ভাসিয়ে দেওয়া হয়। সোজা বাংলায় তাকে রাস্টিকেট করে দেওয়া হয়। তাতে আমার কোনও আপত্তি নেই। যদি সেটা শব্দার্থে নেওয়া হয়। রাস্টিকেট শব্দের প্রকৃত অর্থ, গ্রামের ছেলে শহরের স্কুলে এসে গ্রাম্য অভদ্র আচরণ করেছিল বলে তাকে ফের গ্রামে পাঠানো হল, তাকে রাস্টিকিট করে দেওয়া হল, তাকে কাট্রিফাই করে দেওয়া হল। আমি চাঁদপানা মুখ করে সুর্মার ওপারে গ্রামে বাস করে ইস্কুলে আসতে রাজি আছি। বিস্তর ছেলে ওপর থেকে খেয়া পেরিয়ে সরকারি ইস্কুলে পড়তে আসে। আমাদের পাদ্রি সাহেবের কাছে শোনা, লাতিন রুত্তিকারে (গ্রামে বাস করা) শব্দ থেকে রাস্টিকেট কথাটা এসেছে। কিন্তু এসব গুণগর্ভ সুভাষিত শুনে হেডমাস্টার যে আসন ছেড়ে আমি-সত্যকামকে গৌতম ঋষির মতো আলিঙ্গন করবেন এমত আশা তিন লিটার ভাঙ পেটে নামিয়েও করা যায় না। চোরা না শোনে ধর্মের কাহিনী। এস্থলে ধার্মিকও শুনতে চায় না ধর্মের কাহিনী- নইলে পৃথিবীতে এত গণ্ডায় গণ্ডায় ভিন্ন ভিন্ন ধর্ম কেন ভট্টচাষ যান মসজিদে ধৰ্মকাহিনী শুনতে এবং বিপরীতটা? হু?
সেসব দিনে না, রাতের আকাশে উত্তমকুমারাদি তারকা আকাশে দীপ্যমান হয়নি। আমার পরবর্তী যুগের সখা দেবকী-পাহাড়ীও তখন অসংখ্য বিমল উজল রতনরাজির মতো খনির তিমির গর্তে। নইলে গাগারিন বেগে চলে যেতুম মোহময়ী মুম্বই বা টলিউডে হেসেখেলে পেয়ে যেতুম যম বা শয়তানের মেন্ রোল।
ভাঙের কথা এইমাত্র বলেছি : তখন স্থির করলুম স্কুলের দরওয়ানজি হনুমান পুজন তেওয়ারি– যিনি কি না পালপরবে ওই বস্তু সেবন করেন এবং সেই সুবাদে আমাকে তথা ফ্রেন্ড স্বদেশ চক্রবর্তীকে ওই বিদ্যায় হাতেখড়ি দেন– তেনাকে ভাঙ খাইয়ে বেহুস করে হেডমাস্টারের ঘরে লাগাব আগুন। গায়ে আগুন লেগে গেঞ্জিটা পুড়ে গেল আর পাঞ্জাবিটা পুড়ল না– এ কখনও হয়! ব্ল্যাক বুক তার মিথ্যা সাক্ষ্যসহ পুড়ে ছাই হবে। সেই ছাই দিয়ে পরব বিজয়-টিকা? ওয়াহু, ওয়াহ্!
ঐ আসে ঐ অতি ভৈরব হরষে–
কিচ্ছুটি করতে হল না। অতি ভৈরব হরষে ওই সময়ে এল অসহযোগ আন্দোলন।
আমারে আর পায় কেডা?
দ্বন্দ্ব-পুরাণ
মহাপুরুষদের জীবনধারণ প্রণালি, তাদের কর্মকীর্তি এমনকি দৈবেসৈবে তাদের খামখেয়ালির আচরণ দেখে তাদের শিষ্য-সহচর তথা সমকালীন সাধারণ জন আপন আপন গতানুগতিক ক্ষুদ্র বুদ্ধি দ্বারা কিছুতেই বুঝে উঠতে পারে না, কী করে একটা মানুষের পক্ষে এরকম কীর্তিকলাপ আদৌ সম্ভবে। এ-প্রহেলিকার সমাধান না করতে পেরে শেষটায় বলে, ওহ! বুঝেছি। এরা অলৌকিক ঐশী শক্তি ধারণ করেন। তখন আরম্ভ হয় এদের সম্বন্ধে কিংবদন্তি বা লেজেন্ড নির্মাণ। কোন পির ধূলিমুষ্টি স্বর্ণমুষ্টিতে পরিবর্তিত করতে পারতেন, কোন গুরু চেলাদের আবদার-খাইয়ে অতিষ্ঠ হয়ে রাগের বশে এক কুষ্ঠরোগীকে পদাঘাত করা মাত্রই তনুহূর্তেই, সে সম্পূর্ণ নিরাময় হয়ে যায়–হরি হে তুমিই সত্য।
