তার পর তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেছিলেন, কস্মিনকালেও শুনিনি, কাক কোকিলের বাসায় ডিম পাড়ল! এইবারে একটা ব্যত্যয় দেখলুম– হরি হে, তুমিই সত্য।
এস্থলে তড়িঘড়ি আমি একটি সম্ভাব্য ভ্রম সংশোধন করে রাখি। আমার দাদারা ফর্সা। আর আমি বিটকেল কৃষ্ণবর্ণ। অথচ আমরা একই বর্ণের, অর্থাৎ একই কুলের, অন্তত এই আমার বিশ্বাস ছিল বহুদিন ধরে।
কালের সঙ্গে আমার আরও একটা জবরদস্ত দোস্তি দেখা গেল অচিরাত। আমি নিরবচ্ছিন্ন সেল্ফ পট্রেট আঁকলুম ঝাড়া তিনটি বছর ধরে। অর্থাৎ পাততাড়িতে বছরের পর বছর কাগের ছা বগের ছা লিখে গেলুম।
আমার বিস্ময় লাগে, শিক্ষামন্ত্রী ত্রিগুণা সেনের জন্মনগরী করিমগঞ্জ, আমারও দ্বৎ। তাঁর আমার জন্ম একই বৎসর। আজ তিনি তাবৎ দেশের শিক্ষাদীক্ষা তরণীর কর্ণধার, আর আমি সুর করে একটানা গেয়ে যাচ্ছি–এক বাও মেলে না, দুবাও মেলে না।
আমি যে শিক্ষা-দীক্ষার নিরঙ্কুশ ডডনং হয়ে রইলুম তার জন্য কবিগুরু দেবও খানিকটা দায়ী। অবশ্য তার প্রতি আমার ভক্তি আমৃত্যু অচলা থাকবে। কারণ–
যদ্যপি আমার গুরু শুঁড়ি-বাড়ি যায়।
তথাপি আমার গুরু নিত্যানন্দ রায়।
কবিগুরু বাঙালি তথা ভারতবাসীর সমুখে উত্তম উত্তম আদর্শ রেখে গেছেন, কিন্তু যে-আদর্শ এলেন আমার দ্বারে/ডাক দিলেন অন্ধকারে এবং সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুল্পেখার মতো আমার চিত্তাকাশ উদ্ভাসিত করে দিল সেটি এই :
নেই বা হলেম যেমন তোমার
অম্বিকে গোসাঁই।
আমি তো, মা, চাইনে হতে
পণ্ডিতমশাই।
নাই যদি হই ভালো ছেলে,
কেবল যদি বেড়াই খেলে,
তুতের ডালে খুঁজে বেড়াই
গুটিপোকার গুটি,
মুর্খ হয়ে রইব তবে?
আমার তাতে কীই বা হবে,
মুর্খু যারা তাদেরি তো
সমস্তখন ছুটি।
পুনরায় :
যখন গিয়ে পাঠশালাতে
দাগা বুলোই খাতার পাতে,
গুরুমশাই দুপুরবেলায়
বসে বসে ঢোলে,
হাঁকিয়ে গাড়ি কোন গাড়োয়ান
মাঠের পথে যায় গেয়ে গান
শুনে আমি পণ করি যে
মুর্খ হব বলে।
আমাকে অবশ্য কোনও উচাটন মন্ত্রোচ্চারণ করে কোনওপ্রকারেই পণ করতে হয়নি। সর্বেশ্বর প্রসাদাৎ ভূমিষ্ঠ হওয়ার লগ্ন থেকেই আমি কর্মমুক্ত। গোড়ায় ভেবেছিলাম, এটা বুঝি জডুত্রে লক্ষণ। পরে শুনি দক্ষিণ ভারতের মহর্ষি ছন্দে গেঁথে বলেছেন, কর্ম কিং পরং। কর্ম তড়ম্ ॥ কর্ম তো স্বতন্ত্র নয়, কর্ম সে তো জড়! তবে আর মাথার ঘাম পায়ে ফেলে কর্মাতে কমাতে অম্বিকে গোসাঁই হয়ে গিয়ে কোন তুর্কিস্থানের বাখারার আজব মেওয়া আলু-বুখারা লাভ হবে?
অবশ্য নতমস্তকে স্বীকার করব, আমি পাঠশালা পাস করেছিলাম।
শুনেছি, নাৎসি যুগে এমনও চৌকশ স্পাই ছিল যে বিশ গজ দূরের থেকে শুধুমাত্র ঠোঁট নাড়া দেখে দুজনের ফিসফিসিনিতে কী কথাবার্তা হচ্ছে আদ্যন্ত বুঝে যেত এবং পকেটে হাত খুঁজে প্যাডের উপর সেটা আগাপাশতলা শর্টহ্যান্ডে তুলে নিতে পারত। আমি কিন্তু সে লাইনে কাজ করিনি। শ্যেনের মতো তীক্ষ্ণ দৃষ্টি থাকলে আমরা সে ব্যক্তিকে বলি সেয়ানা। আমি সেই দৃষ্টিশক্তির আনুকূল্যে দশ হাত দূরের ব্রিলিয়ান্ট বয়ের পাতা থেকে টুকলি করে তর তর করে পেরিয়ে গেলুম পাঠশালার ভব-নদী।
বুদ্ধিমান জন আপন বুদ্ধির জোরে তরে যায় বলে ভাগ্যবিধাতা মূর্খকে সাহায্য করেন, নইলে তিনিও বিলকুল বেকার হয়ে পড়বেন যে! মৌলা আলীকে শিনি চড়াবে কে, কালীঘাটে মানত মানবে কোন মূর্খ আর বুদ্ধিমান যে করে না, সে তো জানা কথা।
পাঠশালা পাস করার পর করলুম জীবনের চরম মূর্ধমো! কলকাতার বেম্বো-সমাজের বাবু-বিবিরা সে-যুগে পাড়াগাঁয়ে আসতেন আমাদের পেট্রানাইজ করার জন্যে। তাদের চোখে কত না ঢঙ-বেঢঙের রঙ-বেরঙের চশমা। আমারও শখ গেল অপ-টু-ডেট হওয়ার। ভান করতে লাগলুম আমি ব্ল্যাক বোর্ড দেখতে পাইনে। ডাক্তারকে পর্যন্ত ঘায়েল করলুম– কিংবা সে ছিল ঝটপট দু পয়সা কামাবার তালে।
সেই বেকার চশমা ব্যবহার করে গেল আমার শ্যেনদৃষ্টি। ফল ওত্রালো বিষময়। একই ইস্টিশানে যেমন আগ্রা সিটি, আগ্রা ফোর্ট, আগ্রা জংশন– গাড়ি দাঁড়াতে লাগল তিন তিন বার করে। শ্যেন দৃষ্টি গেছে, টুকলি করতে পারিনি– একই ক্লাসে কাটাই তিন-তিনটি বছর করে।
ইতোমধ্যে কিন্তু আমি দিব্য অকালপকু জ্যেষ্ঠতাতত্ত্ব লাভ করেছি– তারই একটি উদাহরণ দিই। ফেল মেরে দু কান কাটার মতো শহরের ভিতর দিয়ে যাচ্ছি এমন সময় এক গুরুজন, মরালিটি প্রচারে নিরেট পাদরি সাহেব, আমাকে দাঁড় করিয়ে বললেন, ফেল মেরেছিস? লজ্জাশরম নেই? তোর দাদারা, তোদের বংশ
একগাল হেসে বললুম, কী যে বলেন, স্যার! অ্যামন ফার্স্ট ক্লাস অ্যানসার লিখেছিলুম যে এগজামিনার মুগ্ধ হয়ে খাতায় লিখলে এনকোর এনকোর! তাইতেই তো ফের পরীক্ষা দিচ্ছি!
সম্পর্কে তিনি আমার জ্যাঠা। কিন্তু আমার পকু-নিতম্ব জ্যাঠামো শুনে তিনি থ মেরে গেলেন– আমাদের স্টেট বাস যেরকম আকছারই যত্রতত্র থ মারে বুঝে গেলেন এ পেল্লাদকে ঘায়েল করার মতো পাষাণে, সমুদ্রে নিক্ষেপ পদ্ধতি তাঁর শস্ত্রাগারে নেই। গত যুদ্ধের ফ্লেম থ্রোয়ারের মতো একবার আমার দিকে কটমটিয়ে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বললেন, এ ছেলে বাঁচলে হয়!
গুরুজনের আশীর্বাদ কখনও নিষ্ফল হয়! দিব্যপুরুষ্টু পাঁঠাটার মতো ঘোঁত ঘোত করে এখনও ঘুরে বেড়াচ্ছি।
