কিন্তু থাক, আর না। এ বিষয়টাই আমার কাছে মর্মান্তিক পীড়াদায়ক। কুলমর্যাদার প্রস্তাব উঠলেই আমার পিতা বলতেন, বাপ-ঠাকুর্দার শুকনো হাড় চিবিয়ে কি আর পেট ভরবে? আমিও চিবোইনি। চিবোনো দূরে থাক, আমাদের পিতৃপুরুষ যে গোরস্তানে শুয়ে আছেন তার পাশ দিয়ে যেতে হলে আমি মাথা হেঁট করি।
আমি এই গোষ্ঠীর একমাত্র ব্ল্যাকশিপ- কালা ম্যাড়া!
শব্দার্থে আমার বর্ণ ঘোরতর কৃষ্ণ তো বটেই–বাকি অঙ্গপ্রত্যঙ্গের বর্ণনা আর দেব না। তবে এইটুকুন বলতে পারি পরবর্তীকালে উচ্চ-শিক্ষার অজুহাত দেখিয়ে জন্মদাতা ও শিক্ষাদাতা দুই উরুর কিল-কানমলা থেকে নিষ্কৃতি পেয়ে যখন শান্তিনিকেতনে আশ্রয় নিই তখন ভারতবর্ষের সর্বশ্রেষ্ঠ ভাস্কর শ্ৰীযুত রামকিঙ্কর বায়েজ আমাকে দেখামাত্রই সোল্লাসে চিৎকার করে ওঠেন, হুরে হুরুরে। কেল্লা মার দিয়া। কিষ্কিন্ধ্যার মহারাজ সুগ্রীবের বংশধর শ্ৰীযুক্ত আহাদী কুঞ্চিতপদ আমাকে বায়না দিয়েছেন শয়তানের একটি মূর্তি গড়ে দেবার জন্য। মানসসরোবর থেকে কন্যাকুমারী, হিংলাজ থেকে পরাম কুণ্ডু অবধি খুঁজে খুঁজে হয়রান–মডেল আর পাইনে। গুরুদেবের কৃপায় আজ তুই হেথায় এসে গেছিস। আয় ভাই আয়। চ কলাবনে।
ইহুদিদের সদাপ্রভু য়াহভের বেহেশতে শয়তানের প্রবেশ নিষেধ। সেখান থেকে যদি শয়তানের মূর্তি গড়ার ফরমায়েশ আসত সেটাও না হয় বুঝতুম কিন্তু কিষ্কিন্ধ্যা থেকে। সেখানকার মেয়েমা দুই-ই বুঝি দারুণ খুবসুরত হয়!
পরবর্তীকালে কিষ্কিন্ধ্যা গিয়েছিলাম। দ্রাবিড় অঞ্চলে প্রবাদ আছে, রমণীরা ভগবানের কাছে প্রার্থনা করে কামের প্রলোভন থেকে আমাদের রক্ষা কর। তাদের প্রার্থনা পরিপূর্ণ করে ভগবান কিষ্কিন্ধ্যার পুরুষ সৃষ্টি করেন।
কিষ্কিন্ধ্যায় গিয়ে দেখি, দেয়ালে দেয়ালে পোস্টার। অসিছে রবিবারে যমের পূজা উপলক্ষে অলিম্পিকের পৃষ্ঠপোষকতায় স্থানীয় টাউন হলে একটি টুর্নামেন্ট হবে। যে সবচেয়ে বেশি বিকট মুখ-ভেংচি কাটতে পারবে সে পাবে হাজার টাকার পুরস্কার।
আমি কম্পিট করিনি। নিরীহ দর্শক হিসেবে ছিলম মাত্র। অবশ্য বিকট বিকট গরিল্লাপারা নরদানবরাই এই ভেংচি প্রদর্শনীতে হিস্যে নিয়েছিলেন কার্তিক যতই ভেংচি কাটুন না কেন, তাকে তো আর মর্কটের মতো দেখাবে না!
সে কী ভেংচির বহর। এক-একটা দেখি আর আমার পেটের ভাত চাল হয়ে যায়। আর সে কী দুর্দান্ত নে-টু-নে রে! কোথায় লাগে তার কাছে নিন-হামফ্রের ঘোড়দৌড়!
পালা সাঙ্গ হল। হঠাৎ দেখি তিনজন অজই মল্লদের সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে দর্শকদের গ্যালারি পানে এগিয়ে আসছেন। তার পর ওমা, দেখি, ঠিক আমারই সামনে এসে দাঁড়ালেন। আমার গলায় জবাফুলের মালা পরিয়ে দিয়ে বললেন, যদ্যপি আপনি এই কম্পিটিশনে অংশগ্রহণ করেননি তবু আপনাকে প্রথম স্থান না দিলে অবিচার হবে। ভেংচি না কেটেও আপনার মুখে বিধিদত্ত যে ভেংচি সদাই বিরাজ করছে সেটা অনবদ্য, দেব-না, না– যমদুর্লভ। তবে আপনি এই কম্পিটিশনে পার্ট নেননি বলে আইনত টাকাটা দেওয়া যায় না। সেটা যমপূজায় ব্যয় হবে। হেঁ হেঁ হেঁ হেঁ পত্ৰপুষ্পদি ভগবান শ্রীকৃষ্ণে পৌঁছায়, বিকটের পুজো মাত্রই আপনাকে পৌঁছবে। এ বাবদে শেষ কথা। আমি আজও কেন আইবুড়ো আছি, সেটা বুঝতে কারওরই অসুবিধা হবে না।
পাঠক! এ লেখন প্রধানত তোমার অখণ্ড-সৌভাগ্যবান বংশধরদের জন্য। তারা যদি প্রত্যয় না যায় তবে যেন একবার কলাভবনে সন্ধান নেয়। ওই মূর্তির একটা ফটো তুলে রেখেছিলেন– আশ্চর্য, লেন্সটা কেন চৌচির হল না- ভবিষ্যভ্রষ্টা রামকিঙ্কর। ছবিটা তিনি দেখালেও দেখাতে পারেন। তবে তারা যেন গ্যাসমাস্ক তথা ধুয়ে মাখানো কাঁচ সঙ্গে নিয়ে যায়। মূর্তিটা গায়েব হয়েছে। পুজোরব শিল্পী রদার প্রেতাত্মা সেটি সরিয়েছে।
পাড়ার ভটচার্য মহাশয়ের কাছে শুনেছি, বিয়ের সময় কনে নাকি বরের রূপ কামনা করে (আমার রূপের বর্ণনা দিলুম), বন্ধুবান্ধব বরের উত্তম কুল কামনা করে সেটাও ইল), পিতা সুশিক্ষিত বর চায়– এইবারে আমরা এলুম ইংরেজিতে যাকে বলে ধিক্ অব দ্য ব্যাট বা রণাঙ্গনের কেন্দ্রভূমিতে।
ডাক্তার অবশ্য পরিবারবর্গকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেছিলেন, স্লো বাট স্টেডি উইন্স দ্য রেস- বিলম্বিত চালেই চলুক না, সেই চাল যদি সদা বজায় রাখে তবে সে জিতবে। অর্থাৎ হোক না গদত, সে যদি গর্দভি চাল বজায় রেখে চলে তবে আখেরে ডাবি ঘোড়ার রেস জিতবে।
জীবনের অষ্টম বর্ষাবধি আমি শুধু একটানা ভাত খাব, ভাত খাব বলেছি। একদম স্টেডি সুরে। ডাক্তারের স্তোকবাক্যে আত্মজন পরিতৃপ্ত না হয়ে মেনে নিলেন যে আমি স্লোউইটেড জড়ভরত। অষ্টম বর্ষে (চাণক্যকে ঢিঢ় দিয়ে পঞ্চমে নয়) আমাকে পাঠানো হল পাঠশালে।
হাতেখড়ির প্রথম দিবসান্তে গুরুমশাই যে-শ্লোকটি আবৃত্তি করেন সেটি মমাগ্রজ লিখে নেন :
কাকঃ কৃষ্ণঃ পিকঃ কৃষ্ণঃ কো ভেদঃ পিককাকয়েঃ।
বসন্তসময়ে প্রাপ্তে কাকঃ কাকঃ পিকঃ পিকঃ ॥
কাক কোকিল দুই-ই কালো, কিন্তু মাইকেল মুগ্ধ হয়ে শুনেছিলেন পিকঘর রব নব পল্লব মাঝারে, আর আমার কণ্ঠস্বর শুনেই গুরু বুঝে গেলেন এটা এক্কেবারে জাত দাঁড়কাকের। সবিস্ময়ে দাদাকে শুধোলেন, এটা তোর ভাই।
