জাহিজ অবতরণিকায় বলেছেন, চতুর্দিকে আমার দুশমন আর দুশমন–দুশমনে দুশমনে আবজাব করছে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী আমার মুরুব্বি; কেউ ডরের মারে আমার রাজহাঁসটাকে পর্যন্ত করতে সাহস পায় না। কিন্তু আমি বিলক্ষণ অবগত আছি, আমার দেহাস্থি গোরস্তানে প্রোথিত আমার পুণ্যশ্লোক পিতৃপুরুষগণের জীর্ণাস্থির সঙ্গে শুভযোগে সম্মিলিত হওয়ার পূর্বেই (মেহেরবান খুদা সে ভমিলন আসন্ন করুন!) আমার দুশমন-গুষ্টি অশেষ তৎপরতার সঙ্গে লিপ্ত হয়ে যাবে আমি এবং আমার ঊর্ধ্বতন তথা অধস্তন চতুর্দশ পুরুষের পুতিগন্ধময় নিন্দাবাদ করতে এবং তার শতকরা ন-সিকে কপোলকল্পিত, আকাশপুরীষ-চয়িত বেহ গুলগঞ্জিকার ঝুটমুট।
যেমন, আমি জানি, আর পাঁচটা নিন্দাবাদের মাঝখানে, অতি কুচতুরতাসহ তারা কীর্তন করবে– আমি নাকি অতিশয় প্রিয়দর্শন সুপুরুষ ছিলুম, সাক্ষাৎ ইউসুফ-পারা হেন দেবদুর্লভ চেহারা নাকি কামনা করেন স্বয়ং বেহস্তের ফেরেস্তারা।
ক্রোধান্ধ হয়ে জাহিজ এস্থলে হুঙ্কার ছাড়ছেন, মিথ্যা, মিথ্যা, সর্বৈব মিথ্যা। আমার প্রতি অন্যায় অবিচার! আমি অভিসম্পাত দিচ্ছি, যে এ অপবাদ রটাবে তার পিতা নির্বংশ হবে। আমি আদৌ সুশ্রী নই। বস্তৃত টেকো মর্কটটার চেহারা পেলে আমি বর্তে যাই। আমার মুখমণ্ডল নামক বদনাদন চেহারার বিভীষিকা দেখে অসংখ্য শিশু ভিরমি গেছে। আমার–
সরল পাঠক! অধম অবগত আছে তুমি জাহিজের এই আত্মকথন শুনে ধন্ধে পড়ে গ্রীবা কয়নে লিপ্ত হয়েছ। তোমার মনে হচ্ছে, এ তো বিচিত্র ব্যাপার! কেউ যদি জাহিকে প্রিয়দর্শন বলে মন্তব্য করে তবে সেটা নিন্দা হতে যাবে কেন, আর যে মন্তব্যটা করেছে সেই-বা দুশমন হতে যাবে কেন? আর জাহিজ্ব যদি কুৎসিতই হন তাতেই-বা কী? তার গোর হয়ে যাওয়ার পর কে আর মিলিয়ে দেখতে পারবে তিনি সুরূপ না কদ্রুপ ছিলেন। কথায় বলে, মড়ার উপর এক মণও মাটি শ মণও মাটি। তবে কি জাহিজ নিরতিশয় সত্যনিষ্ঠ ছিলেন? তার সম্বন্ধে কেউ মিথ্যে বলুক, এটা তিনি সইতে পারতেন না?– তাও সে মিথ্যে প্রিয়ই হোক, আর অপ্রিয়ই হোক।
এসবের উত্তর আমি দেব কী প্রকারে বেলা গড়িয়ে গেল, আর তুমি এখনও বুঝতে পারনি, আমার পেটে সে-এলেম নেই। বিশেষত আমার সেই মুরুব্বি পণ্ডিত যিনি দশটি ভাষায় ত্রিশ-ভলুমি সাইক্লোপিডিয়া নিয়ে কারবার করেন এবং যার বাড়তিপড়তি মাল ভাঙিয়ে আমি হাঁড়ি চড়াই, তিনি গায়েব। তবে শেষ দেখার সময় মাথা দুলিয়ে দুলিয়ে আমাকে বলেন, রেনেসাঁসের পূর্বেই এই লোকটা লিখল আত্মজীবনী! আশ্চর্য আশ্চর্য! রেনেসাঁসের পুর্বে তো শুধু রাজরাজড়া আর ডাঙর ডাঙর সাধুসন্ত। সাধারণ মানুষেরও যে একটা ব্যক্তিগত অস্তিত্ব আছে সেটা আবিষ্কৃত হল রেনেসাঁসের সময়। সাধারণ লোকের আত্মজীবনী তো প্রথম লেখেন আবেলরাড় দ্বাদশ শতাব্দীতে, তার পর দাতে নবজীবন (ভিটা নুওভা) লেখেন ত্রয়োদশ শতাব্দীর শেষে। আর তোমার ওই জাহিজ না কে লিখে ফেললে নবম শতাব্দীতে? বড়ই বিস্ময়জনক, প্রায় অবিশ্বাস্য।
সরল পাঠক, তোমার কুটিল প্রশ্নগুলোর উত্তর দিতে পারলাম না। তবে একটা ভরসা তোমাকে দিতে পারি। ইংরেজিতে প্রবাদ আছে- এক্সট্রিম মিট– দুই অন্তিম প্রান্ত একত্র হয়ে যায়। যেমন দেখতে পাবে গ্রাম্য গাড়ল (ভিলেজ ইডিয়ট) দাওয়ায় বসে সমস্ত দিনটা কাটিয়ে দেয় একটা শুকনো খুঁটির দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে তাকিয়ে, আর যোগীশ্রেষ্ঠও তাবৎ দিবসটা কাটিয়ে দেন একাসনে বসে বসে। উভয়েই কর্মস্পৃহা জয় করতে সক্ষম হয়েছেন। বিদ্যাবুদ্ধিতে আমি এক প্রান্তে, জাহিজ অন্য প্রান্তে উভয়ের সম্মিলন অবশ্যম্ভাবী।
এতএব আমার আত্মজীবনী যদি অবহিতচিত্তে পাঠ কর তবে হয়তো তোমার প্রশ্নগুলোর কিছুটা সদুত্তর পেয়ে যাবে।
জাহিজ তার কেতাব আরম্ভ করেছেন এই বলে যে, তার দুশমনের অভাব নেই। এইখানে তার সঙ্গে আমার হুবহু মিল। বাকিটা সবিস্তার নিবেদন করি। আত্মজীবনী-লেখক মাত্রই আপন বাল্যকাল নিয়ে রচনা আরম্ভ করেন। রবীন্দ্রনাথ, অবনীন্দ্রনাথও এই পন্থা অবলম্বন করেছেন। এবং সেই সুবাদে সকলেই আপন আপন বংশ-পরিচয় দেন। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই যতটা পারেন, পরিবারের মান-ইজ্জত বাড়িয়েই বলেন। এ নিয়ে বাক্যব্যয় সম্পূর্ণ নিষ্প্রয়োজন। স্বদেশ, স্বজাতি, মাতৃভাষা নিয়ে অযথা অহেতুক বড়াই করে না, এমন মানুষ বিরল।
আমাকে কিন্তু ক্ষমা করতে হবে। তার কারণ এ নয় যে, আমি হীন পরিবারের লোক। সত্য কারণটা পাঠক একটু ধৈর্য ধরলেই বুঝতে পারবেন।
বস্তুত, পরিবার আমাদের খানদানি। আমাদের পূর্বপুরুষ শাহ আহমদের (শাহ এস্থলে বাদশা নয়- সৈয়দকে মধ্যযুগে শাহ বলা হতো) দরগা এখনও তরপ পরগনাতে আমাদের দ্রাসনে বিরাজিত সেখানে প্রতি বৎসর উস্ হয়। তারই অল্প দূরে মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্যের মাতুলালয়- মাতা শচী দেবীর জন্ম সেখানেই। আমাদের বংশ পিরের বংশ- এরা কিন্তু যজমানগৃহে অন্ন পর্যন্ত গ্রহণ করতেন না। আমার পিতামহ, মাতামহ, আমার অগ্রজদ্বয় সুপণ্ডিত। আমার অগ্রজ প্রায় কুড়ি বৎসর পরিশ্রম করে সম্প্রতি চর্যাপদের একখানি নতুন টীকা রচনা করছেন। আমার কনিষ্ঠা ভগ্নীর ফকিরি, মারিফতি গীত ঢাকা বেতারে শুনতে পাবেন।
