আরবটি বেশ লেখাপড়ি করেছে। তবু যে কেন জেলে এল তার কারণ একটি সরে ফারসি কবিতাতে আছে।
এক বৃদ্ধ বাজিকর তার ছেলেকে বলছে, দ্যাখ ব্যাটা, এই বয়সেই তুই আমার মতো হুনুরির কাছে সব এলেম রপ্ত করে নে। কী করে পাঁচটা বল নিয়ে লুফোলুফি করতে হয়; টুপির ভিতর থেকে জ্যান্ত খরগোশ বের করতে হয়, হাত-পা বেঁধে বাক্সে ভরে সমুদ্রে ফেলে দিলে বেরিয়ে আসতে হয়।
শুনবি না বুড়ো বাপের কথা তা হলে আল্লার কসম, খুদার কিরে কেটে বলছি, তোকে পাঠাব পাঠশালে, তার পর ইস্কুলে, তার পর কলেজে। এম-এ, পি-এইচ-ডি করে বেরোনোর পর যখন দোরে দোরে ভিক্ষে মাগবি, লাথি-ঝাটা খাবি তখন বুঝবি রে, ব্যাটা, তখন বুঝবি, বুড়ো বাপ হক কথা বলেছিল কি না।
আরবের বেলাও বোধহয় তাই হয়েছিল। কলেজের বিদ্যেতে যখন পেট ভরল না তখন শিখতে গেল বড় বিদ্যে-ল্যাটে গেল, ল্যাটে গেল! বুড়ো বয়সে বিয়ে করা আর বড় বিদ্যে শিখতে যাওয়া একই আহাম্মুকী!
পিরসাহেব সেজে আরবিস্থান থেকে সোনা পাচার করতে গিয়ে শ্রীঘর।
সেকথা থাক। তার কাছে কিন্তু একখানা বই ছিল। সেটি পবিত্র কুরান শরিফ বলাতে জেল-কর্তৃপক্ষ সেটিকে তার কাছে হামেহাল রাখবার অনুমতি দিয়েছিলেন।
অতখানি আরবি বিদ্যে আমার নেই যে, স্বচ্ছন্দে কেতাবখানা পড়ি। তাই আরব বাবাজিই আমাকে পড়ে শোনাত। লেখকের নামটা আমার এখনও মনে আছে। এরকম দেড়-গজি নাম ইহসংসারে বিরল বলে সেইটে বহু তকলিফ বরদাস্ত করে মুখস্থ করে নিয়েছিলুম : আবু উসমান আমর ইবন বহুর উল জাহিজ ধানাই-পানাই বাদ দিলে তার বিগলিতাৰ্থ দাঁড়ায় প্রলম্বিত চক্ষুপল্লব বিশিষ্ট এই জাহিজ লিখেছিলেন তার আত্মজীবনী।
এদেশে যে আরব্যরজনী খুবই প্রচলিত সে তথ্য আরব জানত না। আমি সে আরব্যরজনীর কথা বলছিনে যেটি আপনারা কলেজ স্ট্রিটে পান কেটেছেটে সেটিকে করা হয়েছে গঙ্গাজলে ধোওয়া তুলসী পাতাটির মতো পূতপবিত্র। আমি বটতলা সংস্করণের কথা বলছি। অশ্লীলতায় মূল আরব্যরজনী-ওই যে কী বলে, লেডি চ্যাটারলি না কী- তেনাকে ঢিড-দুয়ো দিতে পারে, হেসে-খেলে। পারলে সত্য গোপন করতুম, কিন্তু সুচতুর পাঠক বহু পূর্বেই ধরে ফেলেছেন ওই কারণেই বইখানা আমাকে ছেলেবেলায়ই আকৃষ্ট করেছিল। আহা, ওই যে নিগ্রো ছোকরা গোলাম আর সুন্দরী প্রভুকন্যার কেচ্ছা–না, থাক আবার আলীপুর যেতে চাইনে।
আরব বলছিল, জাহিজ নাকি আরব্যরজনীর খলিফা হারুন-অরু-রশিদের নাতি না কে যেন, সেই খলিফার উজিরের নেক্-নজরের আশকারা পেয়ে আপন বউকে পর্যন্ত ডরাতেন না। ব্যস, ওই এক কথাই কাফি। কথায় বলে, বাঘের এক বাচ্চাই ব্যস্।
আত্মজীবনী আরম্ভ করার গোড়াতেই মনে পড়ল, জাহিজ যে অবতরণিকা দিয়ে তার জীবনী আরম্ভ করেছেন সেইটে দিয়ে আমিও আরম্ভ করলে আমারও যাত্রা হবে নিরাপদ
যেমতি মূষিক ভ্রমে সাগরে বন্দরে
নৃপতরী আরোহিয়া—
এমন সময় খটকা লাগল। জাহিজের কিঞ্চিৎ পরিচয় তো দিতে হয়। নিদেন তার জন্মকাল লীলাভূমি তো বালাতে হয়।
অধমের বাসভবনে যারাই পায়ের ধূলি দিয়েছেন, তারাই জানেন সেখানে আর যা থাক, না-থাক, বই সেখানে একখানাও নেই। শুনেছি এক বিদ্যাসাগর নেটিভ মহারাজা ভাইয়ের সামনে আপন কিম্মৎ বাড়াবার জন্য একটি কলেজ খোলেন। প্রিন্সিপল নিযুক্ত হয়ে দেখেন, কলেজ লাইব্রেরি নামক কোনওকিছু সেখানে নেই। তিনি টাকা চাইতেই মহারাজা হুঙ্কার দিয়ে উঠলেন, নিকালো হারামিকো অভি স্টেটসে। লেখাপড়া শিখে আসেনি, এখন বুঝি বই পড়ে কলেজে পড়াবে! আমাকে কি উলু পেয়েছে নাকি?
এর থেকে আমার শিক্ষা হয়ে গিয়েছে।
অবশ্য নতমস্তকে বার বার স্বীকার করব, একখানা বইয়ের সন্ধানে আমি সংবরণের মতো পত্নীর কামনা করে
–তপতীর আশে
প্রখর সূর্যের পানে তাকায়ে আকাশে
অনাহারে কঠোর সাধনা কত—
করেছি। কী সে বই ধর্মগ্রন্থ, আয়ুর্বেদ, কামশাস্ত্র –?
এসব কিছু না। একখানা চেক্ বই। সে দুঃখের কথা আর তুলব না।
কিন্তু পুলিশের হুলিয়ার হুড়ো খেয়ে উপস্থিত যেখানে গা-ঢাকা দিয়ে আছি সেই এলাকায় এক অসাধারণ পণ্ডিত ব্যক্তি বাস করেন। তদুপরি তিনি অতিশয় অমায়িক। আমি তার কাছে নিবেদন করলুম, স্যার, জাহি নামক আরবি লেখক কবে জন্মগ্রহণ করেছিলেন?
চট করে একখানা বই টেনে নিলেন। ঠিক ওই ঢপের আরও খান পঁচিশেক ভলুম শেলফে বিরাজ করছিল। বই থেকে পড়ে বললেন, মৃত্যু হয় ১৮৬৯ খ্রিস্টাব্দে
আমার কেমন যেন ধোকা লাগল। বললুম, ১৮৬৯; হারুন-রশিদের নাতির অমিলের লোক তিনি এই কথাই ভো শুনেছি।
ঠিকই তো! দেখি, হারুনের নাতি- বলে আরেক ভলুম পাড়লেন যা, অল ওয়াসিক-৮৪২ থেকে ৮৪৭। একটু চিন্তা করে বললেন, অহ্ হে, বুঝেছি। ১৮৬৯-এর প্রথম ১-টা বাদ দিতে হবে! ওয়াসিকের মৃত্যুর পর আরও বাইশ বছর বেঁচেছিলেন আর কি। তা থাকুন আর নাই থাকুন। মোদ্দা কথা, কিন্তু ইনি নবম শতাব্দীর লোক, আর এই পণ্ডিতদের বেদ বলো, কুরান বলল, পরম পূজনীয় এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা বেচারিকে টেনে নিয়ে এলেন ঊনবিংশ শতাব্দীতে! তোবা! তোবা!! নির্জলা পূর্ণ এক হাজার বছরের ডিফরেন্স্।
যেরকম সরলভাবে তিনি আমাকে স্ক্যান্ডালটা বুঝিয়ে বললেন যে মনে হয়, কলকাতার ডিটেকটিভ পর্যন্ত সেখানে থাকলে বুঝে যেত।
