———-
১. ভারতে অবস্থিত বিদেশি একাধিক দূতাবাস একাধিক ভাষায় বিস্তর প্রোপাগান্ডা লেখেন প্রকাশ করেন, আমার মতো স্বল্পজ্ঞাত লোকও খান-দশেক পায়। এগুলো পড়তে হলে অনেকখানি ধৈর্যের প্রয়োজন কারণ এদের অধিকাংশই বড় একঘেয়ে।…এরই মধ্যে হঠাৎ একখানি উত্তম চটি পুস্তিকা আমাদের হৃদয়মনকে বড়ই আলোড়িত করেছে। সোভিয়েত সমীক্ষা ৯,৯.৬৯ সংখ্যা, সম্পাদক কোলোকোলো, যুগ্ম সম্পাদক প্রদ্যোৎ গুহ, সোভিয়েত যুক্তরাষ্ট্রের কলিকাতাস্থিত দূতস্থানে প্রকাশিত।
এই সংখ্যায় আছে দুটি সুলিখিত রচনা :১. মিখাইল গুস কর্তৃক ইতিহাসের শিক্ষা এবং ২, সোভিয়েট ইউনিয়নের জনৈক মার্শাল কর্তৃক সোভিয়েত সৈন্যের উদ্দেশে (মার্শাল জুকভের গ্রন্থ স্মৃতিচারণ ও প্রতিচিন্তার সমালোচনা)। বলা বাহুল্য, আমি যে সব সময় এদের সঙ্গে একমত হতে পেরেছি তা নয়। সান্ত্বনা নিই এই ভেবে যে দেশে-বিদেশের একাধিক কমরেডও হয়তো কোনও কোনও স্থলে ভিন্নমত পোষণ করতে পারেন। বাংলা অনুবাদ কে বা কারা করেছেন তাঁদের নাম নেই। অনুবাদ স্থলে স্থলে ঈষৎ আড়ষ্ট হলেও অতিশয় বিদগ্ধ উচ্চাঙ্গের।
২. মাত্র কয়েকদিন পূর্বে হিন্দুস্থান স্ট্যান্ডার্ড (৩ অক্টোবর ৬৯)-এ জেনারেল শ্রীযুক্ত চৌধুরীর ডিফেন্স স্ট্র্যাটেজি শিরোনামায় লিখিত একটি অতুলনীয় অনবদ্য রচনা পুনর্মুদ্রিত হয়েছে, এটির বাংলা অনুবাদ হওয়া প্রয়োজন। অনেকে হয়তো বলবেন, সাধারণজন, (সিভিলিয়ানরা) যতই সগ্রামশাস্ত্রের সঙ্গে পরিচিত হবে ততই সে মারমুখো হয়ে পদে পদে লড়াই করতে চাইবে– জিঙ্গোইস্ট বনে যাবে। আমি ভিন্নমত পোষণ করি। আমার বিশ্বাস রাজনীতি কোথায় সমরনীতিতে পরিণত হয়, এ জ্ঞান সাধারণজনের যতই বাড়বে ততই যুদ্ধ সম্বন্ধে তার দায়িত্ববোধও বাড়বে। ঐতিহাসিক মাত্রই জানেন, এ দুনিয়ায় কত-শত বার সিভিলিয়ান পলিটিশিয়ানরা লড়াই করার জন্য যখন হন্যে হয়ে উঠেছে, তখন সেনাবাহিনীর জঙ্গিলাট জাদরেলরা (প্রফেশনাল সোলজাররা) তাদেরকে ঠেকিয়ে সগ্রাম ঘোষণা করতে দেয়নি এবং পরে দেখা গেল ওই করে জঙ্গিলাট জাদরেল দেশকে সর্বনাশ থেকে বাঁচিয়েছেন। অথচ সাধারণজন ভাবে, এরা কথায় কথায় লড়াই শুরু করে দিয়ে পদোন্নতি, মেডেলের জন্য মুখিয়ে আছেন।
৩, কয়েকজন জর্মন জেনারেল লিখেছেন বটে, কিন্তু এদের কেউই সব রণাঙ্গনের পূর্ণাধিকার কখনও পাননি। আর ইতালিয়ান জাদরেলদের সম্বন্ধে নীরবতা হিরন্ময়।
দর্পণ
বছর পনেরো পূর্বে সেই সোনার বাংলা মেতে উঠেছিল রম্যরচনা মারফত রম্যসাহিত্য সৃষ্টি করতে। তার পর সে হুজুগ কেটে যায় তার কারণ বর্ণন উপস্থিত মুলতুবি রাখলুম। বছর পাঁচ-সাত পূর্বে দেখলুম, কেষ্টবিষ্টু তো বটেই, পাঁচু-পেঁচি তক্ ছেড়ে কথা কইছেন না– সবাই লেগে গেছেন, আত্মজীবনী প্রকাশ করতে। সে মোকায় আমারও মনে বাসনা যায় একখানি সরেস আত্মজীবনী ছেড়ে আর পাঁচজনকে ঘায়েল করে দিই, কিন্তু বিধি বাম। ইংরেজিতে প্রবাদ আছে ম্যান প্রোপোজেস, গড় ডিসপোজেস- মানুষ প্রস্তাব পাড়ে (কোনকিছুর কামনা করে) আর ভগবান সমাধান করেন, তার ইচ্ছেমতো। এটা ইংরেজ আমাদের শিখিয়েছেন আর পাঁচটা ভুল জিনিস শেখাবার সঙ্গে সঙ্গে। আপনারা সরলচিত্ত ধরেন, আর ভাবেন, ইংরেজ আমাদের ইংরেজি শিখিয়েছে। বিলকুল ভুল। ইংরেজ নিজে শেখে কিংস ইংলিশ, তার অর্থ, তাদের রাজা- উপস্থিত, রানি যে ইংরেজি ব্যবহার করে। আর আমাদের শিখিয়েছে ব্যাবু ইংলিশ বা বাবু ইংলিশ! আসলে প্রবাদটা ম্যান প্রোপোজেস, উম্যান ডিসপোজেস অর্থাৎ পুরুষ প্রস্তাব করে, স্ত্রীলোকে ফৈসালা করে। প্রবাদে ভেজাল কর্ম কিছু নতুন নয়; স্মরণ করুন বেদনিষ্ঠ সদাচারী ব্রাহ্মণসন্তান দ্রোণাচার্য তার শিশুতনয়কে দুধের পরিবর্তে কী দিয়েছিলেন। কিংবা সদাশয় সরকার– থাক গে আবার শ্বশুরবাড়ি যেতে চাইনে।
শ্বশুরবাড়ি যেতে চাইনে! হেন বাঙাল আছে কি যে শ্বশুরবাড়ি যেতে চায় না? অসার খলু সংসারে সারং মন্দির দেবভাষায় আপ্তবাক্য। ওই তো করলেন ব্যাকরণে ভুল!
আত্মজীবনী লিখি-লিখছি লিখি-লিখছি করছি এমন সময় এক রমণীর পাল্লায় পড়ে আমাকে কয়েক বছর জেলে কাটাতে হয়।
শুনেছি, জরাসন্ধ নাকি চৌদ্দ বছর আলীপুর জেলে কাটান। তার কয়েক বছর পর একদা বাসে করে এই জেলের পাশ দিয়ে যাবার সময় তার বালকপুত্র চিৎকার করে সোল্লাসে তাকে শুধোয়, বাবা, ওইবেনে তুমি চোদ্দ বছর ছিলো না?
বাস-সুদ্ধ লোক তার পানে কটমটিয়ে তাকায়। যদ্যপি গাঁটকাটার চোদ্দ বছর জেল হয় না, তবু সবাই অচেতন মনে আপন আপন পকেটে হাত দিয়ে মনিব্যাগ পাকড়ে ধরে। তা ধরুক। কিন্তু বেচারি জরাসন্ধ বাস-সুদ্ধ লোককে বোঝান কী প্রকারে যে, তিনি জেলে চোদ্দ বছর সুপারিনটেনডেনটের কর্ম করেছেন। বুঝুন ঠ্যালাটা! তাই তো ঋষি বলেছেন, দারা পুত্র পরিবার কে তোমার তুমি কার? পুত্র না হয়ে আর কেউ হলে শান্তস্বভাব তিতিষ্ণু জরাসন্ধ বসিয়ে দিতেন নাকে মোক্ষম এক ঘুষি!
না। আমি জেলে যাই, আইনত, খাস জজসাহেবের হুকুমে। সেকথা যথাসময়ে হবে।
জেলে একজন আরবের সঙ্গে আলাপ হয়–আমি পোরট সইদের একটা গোপন নাইটক্লাবে চাকরি করার সময় কিছুটা আরবি শিখে যাই, ওই ভাষায় কটুকাটব্য করতে ততোধিক।
