না। এমনকি পাউলও চিঠি লেখেনি। শুধু কার্ল-পাউলের পিতা আমাকে একটি পিকচার কার্ড পাঠিয়েছে। তার উপরে বৃদ্ধ পিতার কম্পিত হস্তে, কোনওগতিকে লেখা আমার প্রতি আশীর্বচন।
ইতোমধ্যে প্রতি সপ্তাহে প্রতি চিঠিতে বার বার পাউলকে শুধোই (তখন অ্যারমেল হয়নি), কালের খবর কী? কার্লের খবর জানাও।
পাউল উত্তরে আমার মূল প্রশ্ন এড়িয়ে যায়। তার বাপ-মা, কার্লের বউ-বাচ্চা সম্বন্ধে অনেককিছু লেখে।
তার পর একটা চিঠিতে লিখল, সডর্ফের জেলে সুপারিনটেনডেন্ট আমাকে একপাশে টেনে নিয়ে নিতে বলেছে, আমি যেন আমার দাদার অতখানি তত্ত্বতাবাশ না করি। নইলে আমাকেও তারা জেলে পুরতে বাধ্য হবে। আমি তাকে দেখতে যাচ্ছি।
তখনও নাৎসি পার্টি পরবর্তী যুগের চরমতম পৈশাচিক বর্বরতায় পৌঁছয়নি। তাই জেলের কর্তা পাউলকে এই সহানুভূতির উপদেশ দিয়েছিল।
এ চিঠি পেয়ে আমি দুর্ভাবনা দুর্ভাবনায় কাতর হয়ে পড়লুম।
তার পর দু মাস ধরে, পুর্ণ দু মাস ধরে পাউল সম্পূর্ণ নীরব। আমার তখন কী অবস্থা সেটা বোঝাই কী প্রকারে?
আমার মা আমার মনমরা ভাব বেশ লক্ষ করেছে। একদিন শুধোল, হ্যাঁ রে, তোর কী হয়েছে। বিদেশি চিঠি পেলেই তুই শুয়ে পড়িস কেন?
আমি সবকথা খুলে বললুম।
কার্লের মা-ও মা, আমার মা-ও মা।
আমার মা বলল, সে কার্লের জন্যে দোওয়া মেঙে তার জন্য নফল নামাজ পড়বে।
ততদিনে বড়দিন এসে গেছে। বড়দিন শেষ হল।
কিন্তু পাউল কিংবা তার বাপ-মা কারও কোনও চিঠি নেই।
ফেব্রুয়ারির গোড়ার দিকে পাউলের চিঠি এল।
সংক্ষেপে লিখেছেঃ
ক্রিসমাসের সন্ধ্যায় দাদা আত্মহত্যা করেছে। কোনও এক সদাশয় জেলগার্ড দাদাকে এক প্যাকেট সিগারেট দেয়- গোপনে। দেশলাই পুড়িয়ে পুড়িয়ে সিগারেটের খোলে সে লিখে গিয়েছে, মাকে সান্ত্বনা দিও। গার্ডটিই আমাকে সেটা পৌঁছিয়ে দেয়।
চিঠি যখন পড়ছি আমার মা তখন সম্মুখে ছিল। শুধোল, হ্যাঁ রে, কী খবর পেলি? তোর বন্ধু ভালো আছে তো?
আমি সত্য গোপন করিনি।
মা দু হাত দিয়ে মুখ ঢেকে নামাজের ঘরের দিকে চলে গেল।
.
১৬.
কার্ল-এর কথা শেষ হয়েছে। তথাপি বিবেচনা করি কোনও কোনও সহানুভূতিশীল তথা কৌতূহলী পাঠক-পাঠিকা জানতে চাইবেন যে, কীসব দুর্দৈব কোন সব নিপীড়নের ভিতর দিয়ে যেতে যেতে একদিন কারাগারের পাষাণপ্রাচীর ভেদ করে কার্লের কাছে দিব্যজ্যোতি উদ্ভাসিত হল যে এ জীবন নিরর্থক; কিংবা হয়তো কোনও কোনও মনস্তত্ত্ববিদ বিজ্ঞানসম্মত মীমাংসা প্রকাশ করে বললেন, কার্ল অংশত মতিচ্ছন্ন অবস্থায় স্বেচ্ছায় এ সংসার থেকে বিদায় নেয়–কার্ল সম্পূর্ণ সুস্থাবস্থায় কি কখনও তার সে মায়ের কাছ থেকে চিরবিদায় নিতে পারত, যে-মাকে সে এতখানি প্রাণঢালা সোহাগ করত, তার জায়া তার শিশুকন্যাকে সে প্রাণাধিক ভালোবাসত। কবি বলেছেন–
কেন রে এই দুয়ারটুকু পার হতে সংশয়?
এরই কাছাকাছি একটি অনুভূতি প্রকাশ করেছেন, কার্লেরই সমগোত্রীয় হিটলারবিরোধী এক শহিদ। ইনি জর্মনিতে কার্লের মতো অজানা-অচেনা জন নন। উলরিব ফন্ হাসেল ছিলেন ইতালিতে জর্মন রাজ্যের মহামান্য রাষ্ট্রদূত। বিদগ্ধ পণ্ডিতরূপে তিনি ইংল্যান্ড থেকে বুলগেরিয়া, রুমানিয়া পর্যন্ত সুপরিচিত ছিলেন এবং বহু দেশে বহু পণ্ডিতমণ্ডলীর আমন্ত্রণে বহু জ্ঞানগর্ভ ভাষণ দেন। হিটলারের প্রকৃত স্বরূপ সম্বন্ধে স্থিরচিয় হওয়ামাত্রই তিনি সেই সম্মানিত রাষ্ট্রদূতের পদ ত্যাগ করেন। ১৯৪৪ খ্রিস্টাব্দে হিটলারকে নিধন করার যে ষড়যন্ত্র নিল হয় তারই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থাকার দরুন সেপ্টেম্বর মাসে তিনি মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হন। অর্থাৎ কার্লের আত্মহত্যার এগারো বৎসর পর।
ফন হাসেল কিন্তু এক হিসেবে কার্লের চেয়ে সৌভাগ্যবান ছিলেন। নির্জন কারাগারে তিনি কাগজ-কলম পেয়েছিলেন বলে তিনি তার আত্মচিন্তার কিছুটা লিখে যাবার সুযোগ পান।
সেই আত্মচিন্তা পাণ্ডুলিপির মার্জিনে আসন্ন মৃত্যু অনিবার্য জেনে তিনি মাত্র তিনটি ছন্দে গাধা ছত্রে মৃত্যু সম্বন্ধে তার আশাভরা অনুভূতি প্রকাশ করেন।
তুমি আমাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে যেতে পারো মৃত্যুদ্বার দিয়ে
আমরা তখন যেন স্বপ্ন-সম্মোহিত
এবং অকস্মাৎ আমাদের করে দিলে মুক্ত।(১)
সেই রবীন্দ্রনাথের এই দুয়ারটুকু। এটি পার হতে কার্ল, ফন্ হাসেল কারও কোনও সংশয় ছিল না।
১৯৩৩-এর বড়দিনে কার্ল ওপারে চলে যায়।
১৯৬৪-এর গ্রীষ্মে আমি অপ্রত্যাশিতভাবে ফের জমনি যাই।
বন শহরের আমার এক প্রাক্তন অধ্যাপকের সঙ্গে বাস করছি। পাউলকে চিঠি লিখলুম। সে জানাল, ইতোমধ্যে তার মা কার্লের সান্নিধ্যে চলে গিয়েছেন। তার বাপ পেনশন পেয়েছেন। পাউল লিখেছে, না পেলেই ভালো হতো, বুড়ো একটা কিছু নিয়ে থাকতে পারত। এখন সে তার জাগ্রতাবস্থার অধিকাংশ সময় কাটায় রান্নাঘরের সেই ভাঙা কৌচটার উপর যেখানে বসে বসে মাকে সঙ্গ দিত; পূর্বেরই মতো– কিন্তু এখন একা একা, এবং প্রায় সমস্ত দিনরাত্রি আগে অন্তত ন ঘন্টাটাক আপিসে কাজকর্ম করত। আর সমস্তুক্ষণ আগেরই মতো সিগার ফোকে। তবে আগে ফুকত তামাম দিনে গোটা ছয় মোলায়েম সিগার; এখন গোটা আঠারো এবং এ দেশের সবচেয়ে কড়া সিগার। আমি অনুরোধ করাতে মাসি এসেছে। মাসি মায়েরই মতো ভালো রাঁধতে পারে। আগে বাবাই সেকথা বার বার স্বীকার করেছে। এখন শুধু খুঁতখুঁত করে। লক্ষ করলুম, পূর্বের প্রথামতো পাউল যথারীতি আমাকে ডুসলডর্ফ যাবার নিমন্ত্রণ জানায়নি।
