১৯৩৩-এর জানুয়ারি মাসে হিটলার জর্মনির চ্যান্সেলর বা কর্ণধার হলেন।
তার দু মাস পরে পাউলের একখানা অতি ক্ষুদ্র চিঠি পড়ে আমি স্তম্ভিত। কালকে জর্মনির গোপন পুলিশ অ্যারেস্ট করে নিয়ে গিয়ে নির্জন কারাবাসে রেখেছে। বেল পাওয়ার কোনওই আশা নেই। তার বিরুদ্ধে গোপন বা প্রকাশ্য কোনও আদালতে যে মকদ্দমা উঠবে তার সম্ভাবনাও অতিশয় ক্ষীণ।
.
১৫.
১৯৩২-৩৩ খ্রিস্টাব্দে দেশে ফেরার পর ৩৩-এর সম্পূর্ণ বছরটি কাটাই দেশের ছোট শহরে মায়ের সঙ্গে। সুদীর্ঘ, প্রায় তিন বছর পর ফের মায়ের কাছে ফিরে এসেছি। এর পূর্বেও, অর্থাৎ ১৯২১ থেকে ১৯২৯ পর্যন্ত আমি মায়ের কাছে এসেছি পুজো আর গরমের ছুটিতে, মাত্র কয়েকদিনের, কয়েক সপ্তাহের জন্য। আমি পেয়েছি মায়ের সঙ্গ-সুখ, মা-ও পেয়েছে আমার সঙ্গ-সুখ– ফের আমাকে দেশ ছাড়তে হবে, এই আসন্ন বিচ্ছেদের তীক্ষ্ণ তলওয়ার সূক্ষ্ম একটি চুলে ঝুলছে অবশ্য অহরহ মায়ের মাথার উপর। কে বেশি আনন্দ পেয়েছিল সেটির মীমাংসা আমি নিজে করবার হক ধরিনে। আমার পাঠক-পাঠিকাদের মধ্যে যেসব মাতা ও সন্তান আছেন তাদের হাতেই শেষরায়ের জিন্মেদারি ছেড়ে দিলুম। আর যেসব সন্তানের মা তাদের অল্প বয়সে স্বর্গলোকে চলে গেছেন সেসব দুঃখীদের কথা আমি মোটেই ভাবতে চাইনে।
আমি জানি, আমার যেসব পাঠিকা মা, তাঁরা আমাকে একটা মূর্খ ধরে নিয়ে (এবং আমি সে ধরে-নেওয়াটার বিরুদ্ধে সূচ্যগ্র পরিমাণ আপত্তি মুহূর্তে তরে তুলব না, কারণ আমার পিঠপিঠ দাদা এখনও আমাকে নিত্যনিয়ত অকাট্য যুক্তিপ্রমাণসহ পদ্মভূষণের পরিবর্তে গণ্ডমূর্খ অলিম্পিক ইডিয়েট খেতাব দেয়) বলবেন, অতি অবশ্যই মাতা পুত্রের সঙ্গসুখ পুত্রের তুলনায় বহুগুণে, বহু উৎকর্ষে, বহুতর আনন্দ-ঘন চরম তৃপ্তি পরমারাম পায়। শুধু তাই নয়, পুত্রের জন্যও সে সঙ্গে সঙ্গে এক মহামিলনের মহানন্দময় মহোৎসবের সৃষ্টি করে– কারণ মা তার স্বভাবজনিত নিঃস্বার্থপরায়ণতায় চায়, সন্তানও যেন তারই মতো এমনকি তারও বেশি পরিপূৰ্ণানন্দ লাভ করে। কিন্তু সন্তান কি সেটা পারে পুত্র যুবা। সে চায়, মায়ের ভালোবাসার বাইরেও অনেক কিছু খ্যাতি, প্রতিপত্তি, অর্থবৈভব; তদুপরি সে কামনা করে অন্য রমণীর যৌবন-মদিরারা প্রণয় এ-ও কি তখন সম্ভবে, যে, সে তখন শিকালে যেরকম একাগ্রচিত্তে বাহ্যজ্ঞানশূন্য হয়ে মাতৃস্তন শোষণ করেছিল আজও সেইরকম : তার মাতৃস্নেহসিক্ত সঙ্গসুজাত আনন্দযজ্ঞ থেকে সেই প্রকারেই একাগ্রচিত্তে বাহ্যজ্ঞানশূন্য প্রতিটি মধুকণার সৌরভম্বন আনন্দরস নিঃশেষে শোষণ করবে। সেই শিশু জন্মলাভের পরই মায়ের বামস্তন ওষ্ঠাধর দ্বারা অবিরত নিষ্পিষ্ট করে যেন মাতৃদেহের শেষ রক্তবিন্দু লুণ্ঠন করে নিয়েছে, তার বামহস্ত মাতার দক্ষিণ স্তনের উপর রেখে সেই ক্ষুদ্র হস্তাঙ্গুলির কোমল পরশ দুইয়ে আরও দুগ্ধ আরও অমৃতের আহ্বান জানাচ্ছে।
ইতোমধ্যে মধ্যে মধ্যে তার অতি হ্রস্ব, অতিশয় ফীত বাম পদ দিয়ে মাতার দেহে মধুর মধুর পদাঘাত করছে।
সুশীল পাঠক! তুমি হয়তো ভাবছ, আমি যশোদানন্দন শ্রীশ্রীবালকৃষ্ণের কাব্যচ্ছদে বাধা মাতৃদুগ্ধ পান এতশত যুগ পরে কেন গদ্যময় নীরস ভাষায় পুনরায় পরিবেশন করছি। কিন্তু আমি জানি, প্রকৃত বৈষ্ণবজন বিশেষ করে আমার মুরুব্বি শ্ৰীযুত হরেকৃষ্ণ, আমার এ অনধিকার চর্চা অবহেলে এবং সস্নেহে ক্ষমা করবেন। নিবেদন, আমার বিশেষ উদ্দেশ্য আছে।
এই যে আমি আমার মাকে অনেকখানি হতাশ-নিরাশ করলুম (অবশ্য সব মা-ই সেটা মাফ করে দেয়), তার তুলনায় আমার মা কী করল?
আমার বয়স যখন চৌত্রিশ তখন আমার মা ১৯৩৮ সালে আমাকে ছেড়ে ওপারে চলে গেল। সেই বিচ্ছেদের পর আমি আরও চৌত্রিশ বৎসর ধরে এ সংসারে সেই মায়ের বিরহযন্ত্রণা কতখানি নিতে পারি, তারই চেষ্টা করছি।
এইবারে আমি পূর্বোল্লিখিত উদ্দেশ্য খুলে বলছি
যে-মা আমার দু মাস এক বৎসর এবং সর্বাধিক, পৌনে তিন বৎসরের বিচ্ছেদ সইতে পারত না বলে দিনে দিনে ফরিয়াদ করত, সেই মা-ই আমার জন্য রেখে গেল চৌত্রিশ বৎসরের বিচ্ছেদ-বেদনা।
করজোড়ে স্বীকার করছি আমার মা আমাকে যতখানি ভালোবেসেছিল তার তুলনায় আমার ভালোবাসা নগণ্য। কিন্তু মাকে দিয়েছিলুম মাত্র পৌনে তিন বৎসরের বেদনা। তার বদলে মা আমাকে দিল চৌত্রিশ বৎসরের বিরহ। আমি কোনও ফরিয়াদ, কোনও নালিশ করছিনে। আল্লা আমার মায়ের পূতাত্মা তার পদপ্রান্তে নিয়ে মাকে তার বহু দুঃখ বহু বিরহযন্ত্রণা থেকে শাশ্বত নিষ্কৃতি দিয়ে তাকে সর্বানন্দাতীত চরমানন্দ দিয়েছেন।
স্পর্শকাতরতাহীন পাঠক শুধোবেন, কার্লের কথা কও। তোমার মায়ের কথা এ স্থলে টেনে আনছ কেন?
কালকে জেলে নিয়ে যায় ১৯৩৩-এর বসন্তে। তার পর এল ইস্টারের পরব। ওই সময় আমি পাউলের সঙ্গে প্রতি বছর সডর্ফ গিয়ে সপরিবারে কার্ল এবং পাউল পরিবারের সঙ্গে পরব পালন করতুম। ওই সময়ে প্রভু যিশু ক্রুশবিদ্ধ হন এবং সপ্তাহান্তে তিনি পুনরুত্থান করেন।
১৯৩২-এর পরবের সময় আমি দেশে। কার্ল-পাউল আমাকে রঙিন কার্ড পাঠায়; সঙ্গে দীর্ঘ আবোল-তাবোল-ত্র নানাপ্রকারের কেচ্ছা-কাহিনী।
১৯৩৩, কার্ল জেলে। কিন্তু মানুষ অসম্ভবের আশা ত্যাগ করতে পারে? আমার ছিল দুরাশা, হয়তো হিটলার-রাজ এই সময়ে একটা মহানুভব ব্যত্যয় করে কার্লকে চিঠি লিখতে দেবে।
