বেদনা পাওয়ার কথা ছিল; আমি পেলুম শান্তি-স্বস্তি।
পাউল বন শহরে এসে আমাদের ছাত্রাবস্থার পাব-এ রাঁদেভু স্থির করল।
কুশল আলিঙ্গনাদির পর পূর্বের প্রথামতো সে আধলিটার বিয়ার অর্ডার দিয়ে গেলাসটার দিকে অনেকক্ষণ ধরে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। শেষটায় একচুমুকে আধগেলাস শেষ করে বলল, কীই-বা তোকে বলি, যা তুই শুনতে চাস। কার্ল ধরা পড়ার একমাস পর এল ইন্টার পরব। কর্মে তার বিশেষ মতিগতি ছিল না কিন্তু ধর্মের পরব, লৌকিকতা নিয়ে সে হই-হুঁল্লোড় করতে বড় ভালোবাসত। নানা রঙের কাগজের ডিম মুড়ে সেগুলোকে চিত্র-বিচিত্র করা থেকে শুরু করে, নিতান্ত বাচ্চাদের মতো সেগুলোকে কল্পনাতীত অদ্ভুত অদ্ভুত জায়গায় লুকনো, তার পর আমাদের সব্বাইকে নিয়ে বিকট চিৎকার লাফালাফি দাপাদাপি করে সেগুলো খেজা, তার বউ যেগুলো লুকিয়েছিল সেগুলো খুঁজে পাওয়াতে রেড-ইন্ডিয়ান স্টাইলে তার তা নৃত্য, তার উকট উদ্দাম জয়োল্লাস– এসব কথা সে নিশ্চয়ই জেলে বসে বসে ভেবেছিল।
আমার চোখে জল এল। বললুম, পাউল, তোর মনে আছে ৩২-এর পরবে কার্ল তোর মারফত আমাকে এক ডজন রঙিন ডিম পাঠিয়েছিল?
পাউল মাথা নেড়ে সায় জানিয়ে বলল, তুই তো সর্ব ধর্ম নিয়ে নাড়াচাড়া করিস তোর অজানা নয়, অনেক ক্যাথলিক ইস্টারকে বড়দিনের চেয়ে বেশি সম্মান দেয়। ওই সময় প্রভু যিশু মৃত্যুবরণ করার সময়েও তার নিপীড়নকারীদের ক্ষমা করে যান। এই ইন্টার সপ্তাহটি ক্ষমতা, দয়া, মৈত্রীর সপ্তাহ। আমার সব নৈরাশ্য তখন দুরাশা দিয়ে চেপে ধরে ইস্টার ফ্রাইডে থেকে ইস্টার মানডে অবধি চারদিন রোজ গিয়েছি জেলখানায়, যদি এই ক্ষমাদয়ার সপ্তাহে ওরা একটু নরম হয়। মাকে না জানিয়ে। পাউল থামল।
আমি বললুম, বুঝেছি, তুই বলে যা। আমি দেশে থাকতে সব শুনতে চেয়েছিলুম। এখন আর না। তুই সংক্ষেপে সার।
পাউল বলল, তার দু মাস পরে এল তার মেয়ের নামকরণ দিবস।(২)
কার্ল ওইদিনই করত তার বাড়ির সবচেয়ে জব্বর পরব। মেয়েকে সাজাত শুভ্রাতি সাদা রেশমি জামা-কাপড়ে আর হল্যান্ড থেকে কেনা সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম লেস ঝালরে।
কার্ল জেলে। হয়তো ভাবছে মা কী করে বাচ্চাটিকে সান্ত্বনা দিচ্ছে যে আজ সেরকম পরব হচ্ছে না কেন?
তার পর এল কার্লের বাৎসরিক বিবাহোৎসব।
এসব কটা পরব পড়ে এপ্রিল থেকে ডিসেম্বর মাসে। শুধু তার বউ আর আমাদের মার নামকরণ দিবস পড়ে জানুয়ারি থেকে মার্চে।
এ সব কটা দিনে কাল কারাগারে কী বেদনা অনুভ করেছিল তার খানিকটা কল্পনা আমি করতে পারি। আর সেই দরদী গার্ড আমাকে তার শেষ মেসেজ দিয়েছিল সে আমাকে কিছুটা বলেছিল। কার্ল নাকি তাকে তার পরিবারের প্রতি পর্বদিন ওকে ওই সম্বন্ধে একটু-আধটু বলত।
তার পর বড়দিন এল। সে আর যে সইতে পারল না। সেকথা তোক তো চিঠিতে লিখেছিলুম। তার দু-একদিন পর আমি একটু সুযোগ পেয়ে পাউলকে শুধালুম, আচ্ছা পাউল, কার্ল তো হিটলার জর্মনির সর্বেশ্বর হওয়ার দু বৎসর পূর্বে পার্টি ছেড়ে দেয়, চাদা বন্ধ করে! তবে ওকে ধরল কেন?
পাউল ক্ষণমাত্র চিন্তা না করে বলল, কিন্তু পার্টি কি ছাড়ে (আমাদের ভাষায় কমলি নহি ছোড়তি) কার্ল ছিল পার্টির সবচেয়ে সেরা যুক্তিতর্কসিদ্ধ মেম্বার এবং উত্তম বক্তা। হিটলার ফুর্যার হওয়ার পর যেসব মাতব্বর কমুনিস্টদের গ্রেফতার করা হয় তাদের প্রায় সক্কলেরই নোটবুকে কার্লের নাম-ঠিকানা পাওয়া গেল। আমি ওদের দোষ দিইনে; কিন্তু নাসিরা স্বভাবতই ধরে নিল এরকম একজন সর্ব-কম্যুনিস্ট-মান্য লোককে বন্ধ করে রাখাই সেফার।
.
পাঠক হয় তো শুধোবেন ‘কত না অশ্রুজল’-এ আমি কার্লের শেষ চিঠিকে যথাযথ মূল্য দিয়ে গোড়ার দিকেই ছাপালুম না কেন? কিন্তু যেখানে আমি অত্যুকৃষ্ট শেষ বিদায়ের চিঠিগুলো অনুবাদ করছি, সেখানে মাকে সান্ত্বনা জানিয়ে তিনটিমাত্র শব্দ, সেগুলোর কী অধিকার ওদের সঙ্গে সমাসনে বসার
———–
১. অধুনা অনেকেই জৰ্মন শিখছেন, তাই মূল পাঠ তুলে দিলুম;
Du kannst uns durch des Todes Nueren
Trtaunend fuehren
Und machest uns Uns auf einmal frel.
২. ক্যাথলিকরা জন্মদিন পালন করে না। ঠাট্টা করে বলে, শ্যাল-কুকুরেরও তো জন্মদিন আছে। তারা পালন করে যে সন্তের নামে বাচ্চার নাম দেওয়া হয়েছে (যেমন পাউল, মারিয়া মেরি, ইত্যাদি) তার সেন্ট পদবি প্রাপ্তির দিন। এটাকে বলে, নামেন্সটাগ্।
চুম্বন
ঘটনাটা সাচ্চা না গুল, হলফ করে বলতে পারব না, কিন্তু তাতে কণামাত্র যায়-আসে না। রসের বিচারে সত্য না অসত্য, ভালো না মন্দ, প্রাকৃত না অপ্রাকৃত, এসব মাপকাঠি, কষ্টিপাথর সম্পূর্ণ অবান্তর। ডানালা অশ্ব অর্থাৎ পক্ষিরাজ ঘোড়া কখনও হয়?… রাক্ষসীই হয় না, তার ওপর তার প্রাণ নাকি কোন এক সাত সাগরের অতল তলে কৌটোর ভিতর রয়েছে তোমরা রূপে। সেই ভোমরাকে চেপটে তেলে না মারা পর্যন্ত ওই রাক্ষসীর উপর যতই খঞ্জর-খাস্তার, বন্দুক-কামান চালাও না কেন, সে মরবে না। এইসব অবাস্তব ব্যাপার নিয়ে যখন ঠাকুমা রূপকথা বলেন তখন কি সর্বাঙ্গে শিহরণ কম্পন রোমাঞ্চন হয় না? মধ্যরজনী অবধি ঠাকুমাকে জাবড়ে ধরে বিনিদ্রাবস্থায় কাটে না?
হালে জনৈক পাঠক আমায় জানিয়েছেন, আমার সদ্য প্রকাশিত উপন্যাসের শহর-ইয়ার নামক রমণী বঙ্গদেশের মুসলিম সমাজে কখনওই থাকতে পারে না। এ চরিত্রটি সম্পূর্ণ অবাস্তব। প্রত্যুত্তরে আমার বক্তব্য অবাস্তব হলেই যে রসের পর্যায়ে পৌঁছয় না, এ হুকুম দিয়েছেন কোন রসরাজ তা হলে পূর্বোক্ত পক্ষিরাজের বাচ্চা ঘোড়া, রাক্ষসীর কৌটোতে রাখা ভোমরা প্রাণ এসব কোনওপ্রকারেরই রসসৃষ্টি করতে পারে না। ওই অকরুণ পাঠক যদি বলতেন, শহর-ইয়ার বাস্তব হোক, অবাস্তব হোক, এটা রসের পর্যায়ে পৌঁছয়নি, তা হলে আমি চাঁদপানা মুখ করে সেটা সয়ে নিতুম। কারণ এটা রুচির কথা, রসবোধের কথা। আমার আরও পাঁচজন পাঠক-পাঠিকা রয়েছেন। তারা হয়তো বলবেন, না; শহর-ইয়ার রসসৃষ্টি করেছে। অতএব এ লড়াই করবেন আমার পাঠকমণ্ডলী। আমি মুক্তি বা ঝিনুক। আমার পেটে জন্মেছে শহর-ইয়ার মুক্তো। জহুরিরা এর মূল্য বিচার করবেন। ওই অকরুণ পাঠকের মতো কেউ বলবেন, এটার মূল্য একটা কানাকড়িও নয়। আবার কেউ কেউ হয়তো বলবেন, না হে না, অত হেনস্তা করো না। মুক্তোটা তো নিতান্ত হাবিজাবি বলে মনে হচ্ছে না।
