হেই, ভাইয়া, জর্মন পলিটিক্স কিছু রপ্ত করতে পেরেছিস?– এক বছর তো হয়ে গেল এই লক্ষ্মীছাড়া দেশে এসেছিস?
আমি উন্মা প্রকাশ করে বললুম, পফুই (অর্থাৎ ছিঃ!), এমন কথা বলতে নেই। মুখে ঘা (কুণ্ঠ ঘা-টা আর বললুম না) হবে। জর্মনি কান্ট-গ্যোটে, বেটোফেন ডুরারের দেশ। কিন্তু, বাওয়া, তোমাদের পলিটিক্সের জট ছাড়ানো আমাদের গান্ধীরও কম্ম নয়। হালে একখানা চটিবই কিনেছি। জর্মনের ছাব্বিশ না আঠাশখানা পার্টির (বাপস!) ঠিকুজি-কুলজি দপে দপে তাতে বয়ান আছে। পড়েছিলুম কবে! এখানও মাথাটা তাজ্জিম-মাজ্জিম করছে।
পরম অবহেলা ভরে বলল, ছেঃ! তোদের না থ্রি হানড্রেড মিলিয়ান গডেসেস আছে! হিসাব রাখিস কী করে? তোদের আবার লাকি দেশ– কার্ড ইনডেকসিঙের গব্বযন্তনা সেখানে এখনও পৌঁছয়নি। তা সেসব কথা যাক। ইতোমধ্যে তোকে একটি মহামূল্যবান সদুপদেশ দিচ্ছি– তোর সেই রাম আহাম্মুখীর সাক্ষাৎ ডক্টরেট-সার্টিফিকেট ওই পার্টি পঞ্জিটি সিকি দরে বিক্রি করে দে– তোর চেয়েও প্রাইজ-ইম্বোইল এ দেশে রাইন নদের সামোন মাছের মতো আবজাব করছে। নইলে শিকের হাঁড়িতে (ওদের ভাষায় মাটির নিচের সেলারের কয়লা গুদোমে) তুলে রেখে দে। দরকার মাফিক ওরই পাতা ছিঁড়ে ঘরের স্টোভে আগুন ধরাবি। কিন্তু সেকথাও থাক। আসল তত্ত্বকথাটা শোন।
তার পর সত্যি অত্যন্ত সিরিয়াস মুখে বলল– কার্লকে এই প্রথম আমি গম্ভীর হতে দেখলুম– বিপদ ঘনিয়ে এসেছে। জানিস, হিটলার রাইখস্টাগে অনেকগুলো সিট পেয়ে গিয়েছে।
আমি হেসে উঠলুম। এ যেন পর্বতের মূষিকপ্রসব!
ইতোমধ্যে পাউল রান্নাঘরে ঢুকে মায়ের কাছে দাঁড়িয়ে আলুর খোসা ছাড়াচ্ছিল। লক্ষ করলুম, আমার হাসির সঙ্গে হামদরদী দেখিয়ে দোহারের মতো স্মিত হাস্য সে করল না– যা সে আকছারই করে থাকে। মায়ের মুখে কোনও ভাবের খেলা নেই।
কার্ল কোনওদিকে খেয়াল না করে আমাকে সরাসরি শুধোল, তুই হিটলারের মাইন কামপফ (বাঙলাতে মোটামুটি আমার সংগ্রাম) পড়েছিস?
আমি হাত জোড় করে বললুম, রক্ষে দাও বাবা! ও বই আদ্যন্ত পড়া আমার কর্ম নয়। একে তো তোমাদের এই জর্মন ভাষাটি এমনই প্যাচানো-জড়ানো, ইংরেজিতে যাকে বলে ইনভলভড, এবং নিদেন বিশ-ত্রিশটি লাইনের ন্যাজ না খেলিয়ে তোমাদের একটা সেনটেন্স সম্পূর্ণ হয় না, তদুপরি তোমাদের ওই হিটলারবাবু যেন মাথায় গামছা বেঁধে বেল্ট টাইট করে, মোজা উপর বাগে টেনে নিয়ে, গণ্ডারের চর্বির টনিক বেয়ে উঠেপড়ে লেগে গেছেন, সরল জিনিস কী কৌশলে দুরহ করা যায় অবশ্য আমার জর্মন জ্ঞান যা, সেটা তো নাথিং টু রাইট হোম এবাউট! তবে, হ্যাঁ, বিস্তর হোঁচট খেয়ে চোট-জখম হজম করে খাবলা মেরে মেরে মোদ্দা কথা কটি ধরে নিয়েছি।
কার্ল মাইন কামপফ-এর ভাষা বাবদ সায় দিয়ে বলল, তোর জর্মন ভাষা-জ্ঞানের কথা উঠছে না। ওই আকাট ব্যাটা হিটলার তো আসলে কথা কয় পশ্চিম অস্ট্রিয়ার অতিশয় চোতা জর্মন ডাইলেক্টে। তদুপরি তার গায়ে রয়েছে চেক রক্ত, কেউবা বলে দু-চার ফোঁটা ভ্যাগাবন্ড জিপসি নাপাক খুনও তাতে মেশানো রয়েছে। এরকম দু-আশলা, সাড়ে তিন আশলা লোক, তদুপরি উনিশটি বার ম্যাট্রিকে সে ঘায়েল হয়ে থামল শেষে সে আবার লিখবে জর্মন? তা তার লেখার ধরন যত না মারাত্মক, তার চেয়ে তার প্রোগ্রামটা ঢের ঢের বেশি মারাত্মক। ইহুদি জাতটাকে নিশ্চিহ্ন করতে হবে, ফ্রান্স দেশটাকে উড়িয়ে দিতে হবে এবং সর্বশেষে রাশার বৃহদংশ দখল করে সেখানকার চাষাভুষোদের রীতিমতো গোলাম বানিয়ে, যাকে বলে স্লেভ লেবার, জর্মনদের জন্য ফোকটে দেদার দেদার রুটি মাখন আণ্ডা বেকন লুট করতে হবে। সে-ও না হয় বুঝি, এই বিরাট দুনিয়ায় কত না তরো-বেতরো গুণ্ডা-গ্যাংগস্টার হয়– অতি অবশ্য আমার ধর্ম-বুদ্ধি এতে একদম সায় দেয়, কিন্তু যে করাল বিভীষিকা আমি চোখের সামনে দেখছি সেটা এই যে, হিটলারের এই শয়তানি স্বপ্ন সফল তো হবেই না, মাঝখান থেকে লক্ষ লক্ষ জর্মন যুদ্ধে মারা যাবে, তাবৎ জর্মন দেশটা চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যাবে এই যে–
আমি বাধা দিয়ে বললুম, ব্রাদার কার্ল, এসবের অধিকাংশ ভোট পাবার জন্য পোলিটিক্যাল প্রোপাগান্ডা। আমাদের রাজা ইংরেজ বলে, তাদের খেদমত করলে খুব শিগগিরই আমরা সবাই রাজা হয়ে যাব, কংগ্রেস বলে, ইংরেজকে তাড়িয়ে দিলে আমরা রাজা না, মহারাজা হয়ে যাব। আমি অবশ্য জিনিসটা বড্ড ক্রুড ভাষায় বলছি। কম্যুনিস্টরা বলে—
হঠাৎ লক্ষ করলুম, কার্লের মুখের উপর দিয়ে যেন একটা উড়ো মেঘের ছায়া পড়ে মিলিয়ে গেল। আমি শুধালুম, কার্ল, তুমি কি কমুনিস্ট
এককালে ছিলুম। বছর দুই হল পার্টি মেম্বারশিপ রিজাইন দিয়েছি। ওই সময় থেকে চাদাও আর দিইনি।
কেন?
সেকথা আরেকদিন হবে।
.
গোটা ১৯৩১টা আসন্ন পরীক্ষা নিয়ে আমি এমনই ব্যস্ত ছিলুম যে, ডুসলডর্ফ যেতে পারিনি। এমনকি ১৯৩১-এর বড়দিনটাতেও ফুরসত করে উঠতে পারলুম না।
১৯৩২ পরীক্ষা পাস করে জর্মনি ত্যাগ করার পূর্বে একদিনের তরে ডুসলডর্ফ গেম হরস্টার পরিবারের কাছ থেকে বিদায় নেবার জন্য। আমার কপাল মন্দ, কার্ল শহরে ছিল না। বড় বিষণ্ণ ভারাক্রান্ত মন নিয়ে, বন হয়ে ইতালিতে এসে জাহাজ ধরলুম।
১৯৩২ কেটে গেল। পাউলের চিঠিপত্র পাই।
