আমি ঘন ঘন হাত ঝাঁকুনি দিতে দিতে বললুম, আমার কাছে শিরঃপীড়ার অত্যুত্তম ভারতীয় হেকিমি দাওয়াই আছে। দেব আপনাকে। কিন্তু ডাক্তারের ফি দিতে হবে। শিরঃপীড়াটি দূরীভূত হলে সেটি অপরাধ নেবেন না, স্যর সেটি কি আমি পেতে পারি?
কার্ল তো তার পাঁজরের দু পাশ দু হাত দিয়ে চেপে ধরে, কোমরে দু ভাজ হয়ে দুলে দুলে গমগম করে হাসে আর বার বার বলল, আমার তো ধারণা ছিল, পুরবীয়ারা (প্রাচ্যদেশীরা) রসিকতা করতে জানে না– সর্বক্ষণ মোক্ষ, নির্বাণ, স্যালভেশনের চিন্তায় মশগুল! তা, ব্রাদার, কিছু মনে কর না। আমার শিরঃপীড়ার একটি কনিষ্ঠা ভগিনী আছে- একেবারে কামানের গোলা। গেল বছরে মিস্ রাইনল্যান্ড হয়েছেন। নেবে সেটি?
ইতোমধ্যে লক্ষ করলুম কার্লের বউ লজ্জায় একেবারে পাকা টমাটো!
ঝপ করে একটা সোফাতে বসে বলল, কিন্তু তোমাতে-আমাতে আর আপনি চলবে না। বুঝলে? তার পর, হা, কী যেন বলতে এসেছিলুম। আজ সন্ধ্যায় আমার ফ্ল্যাটে পার্টি। পাউল তোমাকে নিয়ে আসবে। ঠিক আছে তো!
আমি বললুম, অতি অবশ্যই। প্লেজার অনার। কিন্তু সেই যে আরেকটি শিরঃপীড়ার কথা বলছিলেন, তিনিও আসবেন কি?
তার পর আর কাকে পায় কে? তার হাসি আর কিছুতেই থামতে চায় না।
শেষটায় কার্ল তার বউকে আমার পাশে বসিয়ে দিয়ে বলল, মায়ের সঙ্গে দুটি কথা কয়ে নিই। তার পর বউকে ফিসফিস করে শুধোল, ওকে তো ডাকা হয়নি। লাস্ট মোমেন্টে আসতে পারবে কি? তুমি দেখ তো।
উত্তরের প্রতীক্ষা না করে সোজা গিয়ে মায়ের কোলে দুম্ করে বসে পড়ল– ট্যারচা হয়ে। বাঁ হাত দিয়ে মায়ের বা বাহু চেপে ধরে, ডান হাত দিয়ে মায়ের ঘাড় পেঁচিয়ে নিয়ে মায়ের গালে ঘন ঘন চুম্বন।
স্পষ্ট শুনতে পেলুম, মা বলছেন, ওরে গরিল্লা, ওঠ, ওঠ, আমার লাগছে!
আমি জানতুম, তখন সে ঘরে সর্বাপেক্ষা আকর্ষণীয় জন আমি- যদ্যপি আমি কোনও পির প্যাকম্ব নই– নিতান্ত বিদেশি এবং তারও বাড়া ভারতীয় বলে। তাই আমি অক্লেশে বুঝতে পারলাম, কার্ল আমাকে ছেড়ে তার মায়ের কাছে চলে গেল কেন। সামান্য ড্রইংরুমে কে কার পাশে বসে, তাতে কি-বা যায়-আসে! কিন্তু সে তার মাকে বোঝাতে চেয়েছিল, যে-ই আসুক যে-ই থাক, তার কাছে তার মা-ই সবচেয়ে আকর্ষণীয়।
কার্লের বউ ক্লারা আমাকে বলল, আমার বোন নিশ্চয়ই আসবে। তার অন্য এনগেজমেন্ট থাক আর না-ই থাক।
আমি বললুম, তার অন্য এনগেজমেন্ট হয়তো তার লাভার, তার ইয়ংমানের সঙ্গে। তাকে নিরাশ কাটা কি উচিত হবে, এই আনন্দের দিনে? তাকেও ডাকুন না অবশ্য যদি আপনাদের অন্য কোনও সুবিধা না থাকে।
ক্লারা আমার দিকে বিস্মিত নয়নে তাকাল।
আমি বুঝতে পেরেছি।
আমি শান্ত কণ্ঠে বললুম, আপনি ঘাবড়াচ্ছেন যে আমাতে আর আপনার বোনের লাভারেতে খুনোখুনি হবেনা? নিশ্চিন্ত থাকুন, কিচ্ছুটি হবে না। সে কি আপনার বোনকে বিয়ে করার প্রস্তাব পেড়েছিল?
এ যাবৎ করেনি। কেমন যেন গড়িমসি করছে।
দৃঢ় কণ্ঠে আমি বললুম, আজ রাত্রেই সে প্রস্তাব পাড়বে।
???
আমি আপনার বোনের সঙ্গে একটুখানি ভাবসাব করতেই সে রেগে, চটে, হিংসায় জর্জর হয়ে, আমাকে ঢিড় দেবার জন্য আজ রাতদুপুরেই সে প্রস্তাব পাড়বে। হল?
সে সন্ধ্যায় কার্লের বাড়িতে জব্বর পার্টি হল। আমার তিনটি জিনিস মনে আছে।
কার্ল যখন আমাদের নাচের জন্য পিয়ানো বাজাচ্ছিল তখন আমার নজর গেল তার হাত দু পানির দিকে। সেই হাতের আঙুলগুলো তঙ্গী দীর্ঘ, অথচ সেগুলোর তুলনায় বাকি হাত আরও ছোট। এতে যেন কোনও পোপরশন নেই। কিন্তু কী সুন্দর! এরকম হাতের বর্ণনা দেবার শক্তি আমার নেই। বারবার আমার চোখের সামনে ফুটে উঠল আমার মায়ের হাত দুটি।
.
গভীর রাত্রে বাড়ি ফিরে এসে ঘুমিয়ে পড়েছি।
এমন সময় কে যেন আমার খাটের বাজুতে এসে বসল। আধো ঘুমে শুধালুম, কে?
আমি পাউলের মা। আমি শুধু বলতে এসেছিলুম, এই যে আমার পাউল, সে সপ্তাহের ছ দিন থাকে বন শহরে, প্রতি শনিবার ছুটে আসে আমার কাছে। আর বন তো এখান থেকে দূরে নয়। ডাকগাড়িতে আধঘন্টার পথ মাত্র। তবু আমি এই ছ দিন কী ছটফটই না করি।
আর তোমার মা? তিনি থাকেন কত সমুদ্রের ওপার।
তার দিন কাটে কী করে?
তুমি খুব তাড়াতাড়ি পাস দিয়ে বাড়ি চলে যাও।
তার পর আমার কপালে চুমো দিলেন। আমার মনে হল, এ তো আমারই মায়ের চুমো।
.
১৪.
১৯৩২ খ্রিষ্টাব্দে অকস্মাৎ অত্যন্ত অপ্রত্যাশিতভাবে হিটলারের দল জর্মন পার্লিমেনটে এত অধিক সংখ্যক আসন পেয়ে গেল যে তার গুরুত্ব জর্মনির বাইরে তো বটেই, ভিতরে অল্প লোকই হৃদয়ঙ্গম করতে পেরেছিল। কম্যুনিস্টরা ঠিক-ঠিকই বুঝেছিলেন কিন্তু স্তালিন তখন আপন ঘর সামলাতে ব্যস্ত এবং বিশ্বস্বনজোড়া প্রলেতারিয়া রাজ্য স্থাপনের সদিচ্ছা তিনি তখন প্রায় ত্যাগ করেছেন। জর্মন কম্যুনিস্টরা বাতুশকা স্তালিনের কাছ থেকে সাহায্য পেল অত্যল্পই।
পাঠক হয়তো আশ্চর্য হবে যে, আমার সতীর্থ পাউল হস্টারের অগ্রজ কাল কিন্তু ঠিক-ঠিক বুঝে গিয়েছিল, দেয়ালে কী লিখন লেখা হয়ে গেল
আকাশে বিদ্যুত্বহ্নি কোন অভিশাপ গেল লিখি।
১৯৩২-এর বড়দিনের পরবে গেলুম ড্যুসলডর্ফ।
রান্নাঘরে বসে কার্ল-পাউলের মার সঙ্গে রসালাপ করছি।
এমন সময় কার্ল এসে ঘরে ঢুকল। প্রথম মাকে গণ্ডা দুই চুমো খেয়ে আমাকে দিল গণ্ডাখানেক। কুশলাদির লৌকিকতা বর্জন করে সরাসরি শুধাল–
