মুসসসোলিনির চলল একটানা পরাজয়ের পর পরাজয়। শেষটায় তার আপন ফাশি-মণ্ডলী দলীয় সভায় তার বিরুদ্ধে অনাস্থার প্রস্তাব পাস করল (এটা অবশ্য নাৎসি জর্মনিতে ছিল সম্পূর্ণ অকল্পনীয়) এবং তার প্যারা মেয়ের স্বামী শ্রীমান চাননা ছিলেন দুই নম্বরের ষড়যন্ত্রকারী। মোকা পেয়ে ইতালির রাজা মুসসোলিনিকে বন্দি করলেন। ফাশি রাজ্য লোপ পেল। কিছুদিনের মধ্যেই রাজা যুদ্ধবিরতির আদেশ দিলেন (৮ সেপ্টেম্বর ইতালির ভ্রাতুযুদ্ধের উল্লেখ করতে গিয়ে আমি পূর্ববর্তী অনুবাদে এ তারিখের গুরুত্বের কথা বলেছি)।
ইতোমধ্যে মিত্রশক্তি সম্পূর্ণ উত্তর আফ্রিকা জয় করে নেমেছে খাস ইতালিতে।
কিন্তু হিটলারও কিছু কম যান না। তার ছলাকৌশল ও দুঃসাহস পরিপূর্ণ মাত্রায় প্রয়োগ করে যে প্ল্যান বানালেন সেইটে প্রয়োগ করে, গত বিশ্বযুদ্ধের সবচেয়ে দুঃসাহসী জন বিমানচালক করুদজেনি এক পাহাড়ের চুড়োয় অ্যারোপ্লেন নামিয়ে মুসসোলিনিকে বন্দিদশা থেকে মুক্ত করে নিয়ে এলেন হিটলার সমীপে।
মুসসোলিনির তুবড়িতে কিন্তু এখন আর বৃত্তির বারুদ নেই। তিনি নির্বিবাদে জীবনের শেষ কটা দিন তার প্রিয়া কারা পেচ্চির সঙ্গে কাটাতে চান। কিন্তু হিটলার বাণ্ডার হয়ে আছেন; বাধ্য হয়ে মুসসোলিনিকে নতুন ফাশি পার্টি নির্মাণ করে উত্তর ইতালিতে রাজ্যস্থাপনা করতে হল। সেটা চলল পরিপূর্ণ জর্মন তাঁবেতে।
ইতালি তখন মার খাচ্ছে চতুর্দিক থেকে। মিত্রশক্তি জর্মনদের বিরুদ্ধে লড়তে লড়তে এগিয়ে চলেছে ইতালির ভিতরে। ইতালীয়রা লড়তে চায় না। দুই কুত্তা যখন একটা হাড়ি নিয়ে লড়ে তখন হাড্ডিটা (অর্থাৎইতালি) তো কোনও পক্ষ নিয়ে লড়ে না। কিন্তু জর্মন সৈন্য ইতালীয়দের জোর করে ধরে নিয়ে পিছনে সঙিন বসিয়ে তাদের লড়াল।
আর যারা বাধ্য হয়ে পড়ল তাদের মা-বউকে গায়ে গায়ে বিনা বিচারে গুলি করে মারল প্রধানত ফাশিবিরোধী কমুনিস্টরা। এরই একটি নিদারুণ কাহিনী আমি প্রকাশ করি ১৯৬১-৬২ সালে।
তখন অবতরণিকায় লিখি :
মিত্রপক্ষে ও জৰ্মনিতে তখন– জুলাই ১৯৪৪–জোর লড়াই চলছে। এবং জর্মনদের পিছনে ইতালীয় গেরিলারা (এদের কিছুটা কম্যুনিস্ট, বাকিটা ফ্যাসিস্ট ও নাৎসি-বিরোধী) যেমন জর্মনদের বিরুদ্ধে তীব্র গোপন লড়াই চালিয়ে যাচ্ছিল ঠিক তেমনি আপন দেশবাসী ফ্যাশিস্ট ও জর্মন মিত্রদের (অধিকাংশ ক্ষেত্রে তোর চোটে) বিরুদ্ধেও। এবং দেশবাসীর বিরুদ্ধে লড়াইটাই হয়ে উঠেছিল তীব্রতর, তিক্ততর। রাজনৈতিক আদর্শবাদের জিগির তুলে সবাই আপন আপন শনিধনে লেগে আছে। ইতালি প্রতিশোধের দেশ এমনিতেই আইন আদালত থাকাকালীনও– আর এই অরাজকতার সময় তো কথাই নেই।
.
এমনিতে কিন্তু ইতালীয়রা শান্তিকামী।
তাই তারা খেল গত যুদ্ধে সবচেয়ে বেশি মার।
———–
১. হিটলার স্বয়ং সেই জনতায় ছিলেন। অধুনা এই মহানগরীতে প্রদর্শিত একটি হিটলার-ছবিতে সেটি দেখানো হয়েছে। আসলে যে ফটো থেকে এ অংশ তোলা হয়েছে সেটি পাঠক পাবেন, ফটোগ্রাফার হফমান রচিত হিটলার উয়োজ মাই ফ্রেন্ড পুস্তকে।
২. অনুসন্ধিৎসু পাঠক এ সঙ্গে হুতোম প্যাচার নক্শা কেতাবের গুরুপ্রসাদী অংশটুকু পড়ে দেখবেন।
.
১৩.
ব্যক্তিগত কথা বলতে বাধে। কিন্তু প্রাগুক্ত মহিলা তার শোক সংবরণ করে তার সম-দুঃখে-দুঃখী হৃদয়ের প্রকাশ দেওয়াতে আমিও কিঞ্চিৎ সাহস সঞ্চয় করে আপন অভিজ্ঞতা নিবেদন করি।
আমি বার্লিন যাই ১৯২৯-এ। হিটলার তখন মুনিকের স্থানীয় উষ্ণমস্তিষ্ক রাজনৈতিক পাণ্ড মাত্র। ১৯৩০-এ আমি রাইনল্যান্ডের বন বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে আসি। সেখানে হিটলারের কোনও প্রতিপত্তি ছিল না বললেই চলে।
বন বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার গভীর অন্তরঙ্গ বন্ধুত্ব হয় আমার এক সতীর্থ পাউল (Paul) হরস্টারের সঙ্গে। সে পড়ত আইনশাস্ত্র এবং সঙ্গে সঙ্গে তুর্কি ও আরবি-ইচ্ছা ছিল ডক্টরেট নেবার পর ফরেন আপিসে ঢুকবে। আমারও অপশনাল ছিল আরবি। সেই সূত্রে উভয়ের পরিচয় ও অত্যল্পকালের মধ্যেই গভীর সখ্য…। পাউলের বাপ-মা বাস করতেন নিকটবর্তী ডফ শহরে। এক উইক-এন্ডে সে আমায় নিয়ে গেল তাদের বাড়িতে। মা কখনও ইন্ডিয়ান দেখেননি। ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে মন স্থির করতে পারছেন না, আমার জন্য কোন কোন কন্তু রান্না করবেন। আমরা সবাই রান্নাঘরে বসে– কোন একটা কথাচ্ছলে পাউল বলল যে, আমার মা সুদূর ভারতে প্রতিদিন আমার প্রত্যাগমন প্রতীক্ষা করছে। শোনামাত্র পাউলের মা তার দু হাত দিয়ে চোখ-মুখ ঢেকে দ্রুতপদে চলে গেলেন পাশের ঘরে।
অনেকক্ষণ পর ফিরে এসে ফের রান্নায় মন দিলেন।
সন্ধেবেলা ড্রয়িংরুমে কফি আর গৃহনির্মিত অতুলনীয় ক্রিমবান (পাটিসাপটার অতি দূর-সম্পর্কের ভাই) খাচ্ছি এমন সময় একটি অতিশয় সুপুরুষ যুবক এসে ঘরে ঢুকল। সঙ্গে একটি সুন্দরী। কিন্তু এ যুবক যত্রতত্র সর্বত্র যেরকম পুরুষ-নারী উভয়ের বিমোহিত দৃষ্টি আকর্ষণ করবে, সঙ্গের যুবতীটি ততখানি না। পরস্পরের পরিচয়দির লৌকিকতা অবহেলে, সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে সোজাসুজি আমার কাছে এসে হ্যান্ডশেকের জন্য হাত বাড়িয়ে বলল, আমি আপনাকে চিনি; পাউলের বন্ধু। আর আমি ওই রাসকেলটার দাদা কার্ল। এবং এই রমণীটি আমার শিরঃপীড়া, অর্থাৎ আমার ভামিনী।
