আসলে জনগণ সংগ্রাম চায়নি; তারা চেয়েছিল শান্তি। বিশেষ করে হিটলার তার বুদ্ধিমত্তা, কর্মদক্ষতা, দূরদৃষ্টি-প্রসাদাৎ, বছর তিনেক পূর্বে দেশকে যে আর্থিক সাচ্ছল্য এনে দিয়েছিলেন তারা চেয়েছিল নির্বিঘ্নে শান্তিতে সেটি দীর্ঘকালব্যাপী উপভোগ করতে। আর ভবিষ্যতে সুখভোগের জন্য হিটলার যেসব গণ্ডায় গণ্ডায় অঙ্গীকার করে বসে আছেন, সেগুলোর তো কথাই নেই। তার অন্যতম, বছর তিনেকের মধ্যে তিনি জনির চাষি-মজুর প্রত্যেক পরিবারকে এক-একখানি সরেস ফল্কভাগেন (volkswagen-folk-car জনগণরথ) দেবেন– বস্তুত তখন থেকেই অনেকে আগাম কিস্তি-আমানত দিতে শুরু করেছে। মোটরগাড়ি তা হলে শিকেয় উঠল।
বললে প্রত্যয় যাবে না, সুশীল পাঠক, এই যে জনির প্রাশান অফিসারগোষ্ঠীকে বহু বহু যুগ ধরে পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ রণবিশারদ বলে ধরে নেওয়া হয়েছে, তাদেরও অধিকাংশই এ সংগ্রাম চাননি। এদের একাধিক জন সগ্রাম আসন্ন জেনে, এরই এক বৎসর পূর্বে, হিটলারের সমুখে তীব্র প্রতিবাদ তুলে নিরাশ হয়ে আপন আপন পদে ইস্তফা দেন। আর অর্থনৈতিকদের তো কথাই নেই। শাখট-এর মতো অর্থনৈতিক জাদুকরও যখন দেখলেন হিটলার তার সাবধানবাণী শুনলেন না তখন তিনিও অবসর গ্রহণ করলেন। তার বক্তব্য ছিল হিটলার ক্ষুদ্র রাজ্য পোলাভকে আক্রমণ করে যদি আশা করেন যুদ্ধ সেই অঞ্চলেই সীমাবদ্ধ থাকবে তবে সেটা মারাত্মক ভ্রমাত্মক দুরাশা। সেই খণ্ড-যুদ্ধ বিশ্বযুদ্ধে পরিণত হবেই হবে। এবং সেই সুদূরপ্রসারী দীর্ঘকালব্যাপী বিশ্বসংগ্রাম চালাবার মতো কাঁচামাল-মেটিরিয়েল জর্মনির নেই। (এবং শেষটায় প্রধানত এই কারণেই হিটলারের পতন হয়, এবং তিনি ক্রোধোন্মত্ত স্যামসনের ন্যায় সমস্ত গাঁজা– এস্থলে তাবৎ ইয়োরোপ– তাঁর বিনাশের সঙ্গে সঙ্গে রসাতলে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন।
শুনেছি, যেখানে হোক, যে কোনও প্রকারেই হোক একটা লড়াই বাধিয়ে দেবার জন্য হামেহাল ভেরিয়া হয়ে থাকে একটি গোদা দল অস্ত্রশস্ত্র-নির্মাণকারী বিরাট বিরাট কারখানার মালিকগণ। শুনেছি এরা নাকি গ্যাটের কড়ি খরচা করে অনুন্নত দেশে সিভিল উয়োর লাগিয়ে দিয়ে পরে হরষিত হৃদয়ে উভয় পক্ষকেই বন্দুক কামান বোমা বিক্রি করে খরচার হাজারগুণ মুনাফা তুলে নেয়। (শকুনির যদি এ প্রকারের সুবুদ্ধি থাকত তবে সে নিশ্চয়ই গো-কুলে মড়ক লাগাত।)
এস্থলে কিন্তু শুনেছি, সমরাস্ত্র নির্মাণকারী জর্মনরাও হিটলারের যুদ্ধ কামনা করেননি। এদের অধিকাংশই জানতেন, এ যুদ্ধে জয়াশা নেই। ফলে মুনাফা তো যাবেই যাবে, তদুপরি শত্রুপক্ষ দেশ দখল করে এস্তেক কারখানাগুলোর সমুচা যন্ত্রপাতি স স্ট ব্যারেল আপন আপন দেশে চালান দেবে।
তারা অবশ্য তখন জানতেন না, ধন তো যাবেই, প্রাণ নিয়ে টানাটানি লাগবে।
এবং তা-ও হয়েছিল– ইতোপূর্বে যা কখনও হয়নি যুদ্ধ শেষে মিত্রপক্ষ এইসব ডাঙর ডাঙর অস্ত্রপতিদের বিরুদ্ধে জোর মকদ্দমা চালায়; রিবেট্রপ, কাইটেল ইত্যাদিকে ফাঁসি দেবার পর। জেল তো এঁদের অনেকেরই হয়েছিল– ফাঁসি হয়েছিল কি না, আমার মনে নেই। (অবশ্য শুনেছি, এখন ফের তারা, অথবা তাদের বংশধররা—-বন্দুক কামান তৈরি করে ক্ষণে বেচেন মিশরকে ক্ষণে ইজরাএলকে!)
এবং পাঠক আরও প্রত্যয় যাবেন, হিটলারের আপন খাস চেলা-চামুণ্ডাদের অনেকেই এ যুদ্ধ চাননি!–মায় তার দুনম্বরি ইয়ার বিমান-বহরাধিপতি গ্যোরিং। এঁরা মোকা পেয়ে কলাকৌশলে তখন এতই ধনদৌলত জমিয়েছেন যে, বার্লিনের কুটি সম্প্রদায় এদের ঢপ-বেটপের ঢাউস মেরসেডেজ মোটর দেখতে পেলে কখনও চেঁচিয়ে, কখনও আপিসে মৃদুস্বরে বলত মহারাইশা!–মহারাজা শব্দের জর্মন উচ্চারণ। গ্যেবেস তো একবার উচ্চ কণ্ঠেই বললেন, এদের যদি এখন জুস্ প্রিমে নটি দেওয়া হয় তবেই এরা সর্বার্থে মধ্যযুগের ব্যারন হয়ে যাবে। জুস প্রিমে নটি আইনের অর্থ : প্রথম রাত্রির অধিকার। মধ্যযুগের বহু ব্যারনের অধিকার ছিল তার জমিদারিতে যত কুমারী কন্যা বিয়ে করবে, বিয়ের প্রথম রাত্রি তাদের কাটাতে হবে ব্যারনের শয্যায়।(২)
এরা অবশ্যই অন্তরে অন্তরে যুদ্ধ কামনা করেনি বাইরে যতই লম্বা কোঁচা চড়াক।
তবে একথা ঠিক, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা সম্বন্ধে সম্পূর্ণ অনভিজ্ঞ হিটলারমন্ত্রে আবাল্য দীক্ষিত উষ্ণমস্তক (মস্তিষ্ক এদের ধোলাই করে ফেলা হয়েছে, যাকে বলে ব্রেনওয়াশ, তাই বললুম মস্তক, খুলি আরও ভালো) নিম্ন সরকারি সেনাদলের এস-এস-এর অনেকেই যুদ্ধ কামনা করেছিল।
কিন্তু স্বৈরতন্ত্রের ওই তো একটা মস্ত সুবিধা অসুবিধা যা খুশি বলুন। ক্যাবিনেট ডাকতে হয় না, পার্লিমেন্ট নেই, আর প্লেবিসিটের তো কথাই ওঠে না। হিটলার, নেপোলিওন, স্তালিনকে রোকে কে?
.
মুসসোলিনির যুদ্ধ ঘোষণাটা হয়েছিল আরও মারাত্মক জনমতের বিরুদ্ধে। এমনকি তার আপন জামাই, তার পররাষ্ট্রমন্ত্রী চাননা পর্যন্ত জর্মনদের সঙ্গে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধে নামতে রাজি হননি। মুসসালিনি শেষটায় তাকে জাতিকান-এ রাজদূত বানিয়ে দেন। আর ইতালির রাজা এবং রাজপরিবার যে কট্টর হিটলারবিরোধী ছিলেন সেকথা ইতালির মাক্কারনি-খেকো চাষাটা পর্যন্ত জানত, স্বয়ং হিটলারের তো কথাই নেই। বার্লিনে যখন ইতালির রাষ্ট্রদূত হয়ে এলেন জর্মনির প্রতি মোটামুটি সহানুভূতিশীল–দুষ্টুবুদ্ধিতে অবশ্য রামপন্টক–দিনো আলফিয়েরি, তাকে পর্যন্ত কি হিটলার কি রিবেট্রপ তাদের পক্ষে কনভারট করতে পারেননি।
