এবং যতবার পার সুখী হও, আনন্দে থাক–প্রত্যেকটি দিন মহামূল্যবান!
যে প্রতিটি মুহূর্ত আমরা দুঃখে কাটাই তার জন্য হাহাকার!
আমার স্নেহ তোমার সমস্ত জীবনভর সঙ্গে সঙ্গে থাকবে– আমি তোমাকে চুমু খাচ্ছি এবং যারা সবাই তোমাকে ভালোবাসে। বিদায়! বিদায়!! ও আমার সোহাগের ধন– জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তোমারই কথা আমার গভীরতম মেহের সঙ্গে হৃদয়ে রেখে,
—তোমার মা
———-
১. মূলে আছে ক্লাইন গ্রোস (ইংরেজিতে হবে লিটল বিগ) স্পষ্টত পরস্পরবিরোধী। তবে জর্মনরা আদর করার সময় অনেক ক্ষেত্রে এরকমধারা বলে! কিংবা হয়তো মেয়েটি বয়সে শিশু হলেও গঠনে দার্চ ধরত, যার থেকে মা অনুমান করে যে, কালে সে তন্বঙ্গী না হয়ে পূর্ণাঙ্গী হবে।
.
১১.
য়োরমা হাইসকানেন, ফিনল্যান্ড
জন্ম : ৩১ জুলাই ১৯১৪
মৃত্যু : জুন ১৯৪১
সোভিয়েত-ফিন সগ্রামে সীমান্তে নিহত সৈনিকের রোজনামচা থেকে উদ্ধৃত।
ডিসেম্বর ১৯৩৯ (ফিনিশ সীমান্তে) যুদ্ধের প্রথমদিনই আমি সুভিলাহতির গির্জা-চুড়োয় উঠলুম; সেখান থেকে আবার পর্যবেক্ষণ করব সীমান্তে যেখানে সগ্রাম চলছে… এখান থেকে স্পষ্টভাবে শোনা যাচ্ছে গোলাগুলির শব্দ; অকস্মাৎ একটা চিন্তা আমাকে যেন ঝাঁকুনি দিল : ওই যেখানে যুদ্ধ হচ্ছে সেখানে যে কোনও মুহূর্তে আমাদেরই একজন নিহত হতে পারে। তখন লক্ষ করলুম গির্জা-চুড়োতে আমি একা নই।
প্রতিরক্ষার জন্য রাখা একটা বালুর বস্তায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে একটি নাবালক বাচ্চা–বয়স এই এগারো-বারো। পরনে চামড়ার কোট, হাতে একটা দুরবিন। ওইটে দিয়ে সে দক্ষিণ পানে যুদ্ধক্ষেত্রের দিকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছিল– সেখান থেকে যুদ্ধের ক্ষীণ কোলাহল-ধ্বনি আসছিল। আমি তো অবাক এরকম অকুস্থলে তো ওর মতো ছোট্ট একটা বাচ্চার থাকার কথা নয়। বনের গাছগুলো ছাড়িয়ে উর্ধ্বে উঠেছে এই গির্জা-চুড়ো; যে কোনও মুহূর্তে শত্রুপক্ষের কামানের গোলা এটাকে হানতে পারে।
এখানে তুমি কী করছ?
বড় সুন্দর তাজা গলায় উত্তর এল : কেন? আমাকে তো জঙ্গি হাওয়াই জাহাজের গতিবিধি পাহারা দেবার জন্য এখানে পাঠানো হয়েছে।
তোমার বাড়ি কোথায়?
শান্তু কঠে উত্তর দিল, হাউটাভারা-য়।
আমি তাড়াতাড়ি শুধোলুম, তোমার বাপ-মা…?
অতি স্বাভাবিক কণ্ঠে উত্তর দিল, যেন এ নিয়ে কোনও প্রশ্নই উঠতে পারে না– বাড়িতে বইকি!
বাচ্চাটি আমার দিকে লুকিয়ে লুকিয়ে তাকাল–দুরবিন দিয়ে তদারকি-কর্ম সে তখনকার মতো ক্ষান্ত দিয়েছে।
আমার গলা শুকিয়ে কাঠ। আমি আর কোনও প্রশ্ন শুধোতে পারছিনে। বাচ্চাটি কি জানে তার বসগ্রাম হাউটাভারা শব্দার্থে সম্পূর্ণ চিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছে। ওই তো সীমান্তের শেষ গ্রাম। এটাতে কোনও সেনা-সেনানী নেই। কিন্তু ওরই উপর সকাল থেকে শত্রুপক্ষ সব কামান একজোট করে গোলা হেনেছে। এগ্রাম তো সম্পূর্ণ চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গিয়েছে। সেখানেই তো তার বাড়ি– সে বাড়ি কি আর আছে। তার বাপ-মা পরিবারের আর পাঁচজন? তাদের সঙ্গে এর কি আর কখনও দেখা হবে?
কিন্তু সে কি জানে এ সব? না, না, আমি এ প্রশ্ন ওকে শুধোতে পারব না।
ইতোমধ্যে যুদ্ধের আগুন আরও জোরে জ্বলে উঠেছে।
তুই কি এখানেই থাকবি না অন্য কোথাও যেতে চাস?
কেন? এখানেই তো আমার থাকবার কথা নয় কি? তবে আমাকে দিয়ে আর কোনও দরকার নেই? (অর্থাৎ সে চলে যেতে চায়নি অনুবাদক)।
বহুকাল ধরে তার এই শেষ কথাগুলো আমার কানে বেজে যেতে লাগল–বহুকাল ধরে, তার কাছ থেকে, সেখান থেকে বিদায় নেবার পরও।
.
জানেন শুধু ভগবান, এই পিতৃমাতৃহীন গৃহহীন শিশু যুদ্ধের তাড়নায় কোথায় ঘুরে মরেছিল– ফিনল্যান্ডের ডিসেম্বরের দারুণ শীতে–প্রভুই জানেন, সে অন্তত আশ্রয়টুকু পেয়েছিল কি না।
জেলে থেকে বোনেদের প্রতি লেখা বোনের শেষ পত্র– কবিতায়।
… আটদিন ধরে আমি শৃঙ্খলাবদ্ধ
আমার এ অবস্থা কি কখনও ভুলতে পারব?
শেকলগুলো আমাকে নিদারুণ যন্ত্রণা দিচ্ছে।
আমাকে নির্জন কারাগারে দণ্ডিত করা হয়েছে। হে প্রভু, তুমি আমাকে ত্যাগ করছ কেন?… (খ্রিষ্ট নাকি ক্রুশবিদ্ধ অবস্থায় এই হাহাকারই করেছিলেন অনুবাদক)
আমার বোনেরা মিমি, মিনা– তোমরা কি এখনও তোমাদের বোন লোরেনকে স্বরণে আন,
সে তোমাদের ভালোবাসে।
দুঃখবেদনা আমাদের সম্মিলিত করে একই পথে চালাবে,
এই তো ছিল আমাদের শপথ এবং একই অনুভূতি আমরা ভাগাভাগি করে নেব।
আমাকে তারা শিকল দিয়ে বেঁধেছে, কিন্তু আমার হৃদয়টাকে নয়।
আমি আশা রাখি, আমি বিশ্বাস রাখি, আলোকে আলোকে আলোকিত সূর্যরশ্মিময় ভবিষ্যৎ।
কাল যদি আমার মৃত্যু হয়।
তবে কীই-বা হবে?
শুধু আমি মুক্তি পাব আমার পায়ের শৃথল থেকে!
এই মেয়েটির নাম লোরেনস– বোনেদের নাম মিমি, মিনা। কিন্তু পারিবারিক নাম চিঠিতে নেই বলে এদের কাউকেই শনাক্ত করা যায়নি। যেটুকু জানা গিয়েছে তা এই :
ফ্রান্স জয় করার পর জর্মনি তার বৃহদংশে আপন রাজত্ব চালায়। তখন সে স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে যে আন্ডারগ্রাউন্ড সংগ্রাম চলে মাদমোয়াজেল লোরেন তারই একজন।
১৯৪২ খ্রিষ্টাব্দে তাকে প্রাণদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়। অবশ্য মৃত্যু আসন্ন জেনে এই তার শেষ পত্র।
.
১২.
রণদামামা বাজিয়ে সগর্বে যখন ১৯৩৯-এর সেপ্টেম্বরে হিটলার পোলান্ড আক্রমণ করলেন তখন তিনি বার্লিনের প্রধানতম রাজপথের দিকে তাকিয়ে ক্ষুব্ধ ও নিরাশ হলেন। তার মনে পড়ল ১৯১৪ সালের প্রথম বিশ্বযুদ্ধ-সূচনার কথা। তখন কী উৎসাহ-উত্তেজনার সঙ্গে কাইজারের সেই যুদ্ধং দেহি আবানে জর্মনির জনগণ সাড়া দিয়েছিল।(১) তারা যে এবারে তার এবং গ্যোবেলস্-এর কর্ণপটহবিদারক শত প্রোপাগান্ডা সত্ত্বেও এরকম জড়ভরতের মতো চোখেমুখে নির্বিকার ঔদাসীন্য মেখে পোলাভগামী যুযুধানদের দিকে শুধুমাত্র তাকিয়েই থাকবে– ঘন ঘন সাধুবাদ, করতালি, স্বতঃস্ফূর্ত সংগ্রাম-সঙ্গীত, প্রজ্বলিত মশালসহ সৈন্যবাহিনীর সঙ্গে সঙ্গে কদম কদম বাড়িয়ে তাদের সকলকে শুভেচ্ছা জানানো, সৈন্যদের ধরে ধরে পথমধ্যে তরুণী যুবতীদের যদৃচ্ছা চুম্বনালিঙ্গন কিছু না, কিছু না, সব ঝুট সব ঝুট; হিটলার ও ইয়ার গ্যোবেস তো রীতিমতো মুষড়ে পড়েছিলেন।
