হিটলারকে সরাবার জন্য গ্রাফ ফ স্টাউনফেনবের্গ তার পায়ের কাছে, টেবিলের তলায়, পোর্টফোলিও ভিতর একটি মারাত্মক টাইম বম্ রেখে বাইরে চলে যান। কিন্তু কিম্মৎ হিটলারকে বাঁচিয়ে দিল। যদ্যপি সেই কনফারেন্সৰুমের একাধিক লোক সঙ্গে সঙ্গে নিহত হন, হিটলারের বিশেষ কিছুই হল না।
ক্রোধোন্মত্ত হিটলার এই চক্রান্তকারীদের ওপর দাদ নেবার জন্য দোষী-নির্দোষী প্রায় পাঁচ হাজার জনকে ফাঁসি দেন। আডাম ছিলেন স্টাউনফেনবের্গের অন্তরঙ্গ বন্ধু এবং তাকে এই কর্মে সর্বপ্রকারের সাহায্য করেছিলেন। তারও ফাঁসি হয়।
অসাধারণ দৃঢ়-চরিত্র ধরতেন বলেই আডাম তার মা-বউকে শেষ চিঠি লেখার সময় সজ্ঞানে যতখানি পারেন অনুভূতি চেপে রেখেছিলেন- পাছে ওদের মনে আরও না লাগে। অথচ তিনি লিখতে পারতেন বড় সুন্দর মরমিয়া জর্মন।
.
ওই সময়ের অল্প পূর্বে একদল ছাত্র মুনিকে প্রথমত গোপনে, পরে অর্ধপ্রকাশ্যে হিটলারের বিরুদ্ধে আন্দোলন চালায়। তারই একজন ধরা পড়ে ফাঁসি যাওয়ার পূর্বে তার মাকে লেখে
মামণি,
তুমি আমাকে জন্ম দিয়েছিলে, আমি কৃতজ্ঞতা জানাই। আমি যখন আদ্যন্ত চিন্তা করে দেখি তখন মনে হয় আমার সমস্ত জীবন একই রাস্তা ধরে চলেছিল যার অন্তে আছেন– স্বয়ং ভগবান। এখন কিন্তু শোক করো না, যে, রাস্তার শেষাংশটুকু আমাকে এক লক্ষে পেরুতে হল। শিগগিরই আমি এ জীবনে তোমার যত না কাছে ছিলুম, তারচেয়ে অনেক বেশি কাছে চলে আসব।
ইতোমধ্যে তোমাদের সকলের জন্য একটি রাজকীয় অভ্যর্থনার ব্যবস্থা করছি।
.
মৃত্যুর প্রাক্কালেও এরকম চিঠি! এতখানি রসবোধ! ফাঁসিতে লক্ষ দিতে হয় বই কি, আর স্বর্গপুরীতে মায়ের জন্য রাজসিক অভ্যর্থনার ব্যবস্থা করবে সে।
শিশুকন্যাকে লেখা মায়ের চিঠি।
রোজে (গোলাপ) শ্যোএজিগারের জন্ম ১৯০৭ খ্রিস্টাব্দে। নাসবিরোধী আন্দোলন চালানোর সময় ১৮ সেপ্টেম্বর ১৯৪২ তিনি বন্দি হন এবং ৫ আগস্ট ১৯৪৩-এ মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হন। তার স্বামী বোডো শ্লোএজিগার ছিলেন জর্মন মিলিটারি পুলিশে দোভাষী। তার স্ত্রীর প্রাণদণ্ড হয়েছে, এ খবর পেয়ে তিনি পিস্তলের গুলিতে আত্মহত্যা করেন।
.
আমার সোহাগের ক্ষুদে, দড়(১) মারিয়াননে।
অনুমান করতে পারছিনে তুমি কবে এ চিঠি পড়তে পারবে। তাই এটি তোমার ঠাকুরমা বা বাবার কাছে রেখে যাচ্ছি, যাতে করে তুমি বড় হয়ে এটি পড়তে পার। এখন তোমার কাছ থেকে আমাকে বিদায় নিতে হবে, কারণ খুব সম্ভব আমরা একে অন্যকে আর দেখতে পাব না।
তা সে যাই হোক না কেন, তুমি যেন স্বাস্থ্যবতী, সুখী এবং সবলা হয়ে বড় হয়ে ওঠো। আমি আশা করছি, পৃথিবী তার যেসব সুন্দরতম জিনিস দিতে পারে সেগুলো তুমি উপভোগ করবে–আমি যেরকম উপভোগ করেছি এবং তোমাকে যেন সেসব দুঃখ-বেদনার ভিতর দিয়ে না যেতে হয়– যেগুলোর ভিতর দিয়ে আমাকে যেতে হয়েছিল। সবচেয়ে বড় কথা : তোমাকে কর্মদক্ষ ও অধ্যবসায়ী হতে হবে। এ দুটি থাকলে বাকি সব আনন্দ-সুখ আপনার থেকেই আসে।
তোমার স্নেহ-ভালোবাসা মুক্ত হস্তে বিলিয়ে দিও না। এ সংসারে তোমার বাবার মতো কম লোকই আছে যারা তার মতো সৎ এবং প্রেমে নির্মল। তাই সমস্ত প্রেম উজাড় করে দেবার আগে একটু ধৈর্য ধরতে শেখো। তা হলে প্রেমে ধোকা খাওয়ার যন্ত্রণা থেকে তুমি বেঁচে যাবে। কিন্তু এমন একজন যেদিন আসবে, যে তোমাকে এতই গভীর ভালোবাসে যে, তোমার সব যন্ত্রণা সে-ও সঙ্গে সঙ্গে সইবে এবং যার জন্য তুমিও সইতে প্রস্তুত–এরকম পুরুষকে তুমি তোমার প্রেম নিবেদন করতে পারো। আমি প্রত্যয় দিচ্ছি, তাকে পেয়ে তার সঙ্গে যে আনন্দ তৃপ্তি তুমি উপভোগ করবে তার থেকে তুমি বুঝতে পারবে, তার প্রতীক্ষায় তুমি যে ধৈর্য ধরে ছিলে, সেটা নিফল হয়নি।
তোমার জন্যে আমি বহু বৎসরের আনন্দ প্রার্থনা করছি; আমার কপাল মন্দ, আমি পেয়েছি অল্প কয়েক বৎসরই। এবং তোমাকে সন্তানের জন্ম দিয়ে মা হতে হবে : যখন তোমার নবজাত শিটিকে তোমার বুকের উপর রাখবে তখন হয়তো আমার কথা তোমার স্মরণে আসবে। তোমাকে যখন আমি প্রথমবারের মতো দুবাহু দিয়ে জড়িয়ে ধরেছিলুম সেটি আমার জীবনের চরম মুহূর্ত তুমি তখন মাত্র একটি গোলাপি পুঁটুলি।
তার পরে স্বরণে আন, আমরা রাত্রে পাশাপাশি শুয়ে জীবনের কত না গভীর বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছি আমি চেষ্টা করেছিলুম তোমার সব প্রশ্নের উত্তর দিতে। আবার স্মরণে আন, আমরা যে সমুদ্রপারে তিন হপ্তা কাটিয়েছিলুম–তিন মধুর সপ্তাহ। সেখানকার সূর্যোদয় এবং তোমাতে-আমাতে খালি পায়ে বেলাভুমি বেয়ে বেয়ে বাসিন থেকে উকেরিস গিয়েছিলুম; তার পর জলে রবারের দোলনাতে তোমাকে ঠেলে ঠেলে নিয়ে যাচ্ছিলুম; তার পর আমরা দুজনাতে একসঙ্গে বই পড়তুম। বাছা, তোমাতে-আমাতে কতই না সৌন্দর্য উপভোগ করেছি এবং এগুলো তোমাকে নতুন করে উপভোগ করতে হবে, এবং তারও বাড়া অনেককিছু বেশি।
হ্যাঁ, তোমাকে আরও একটি কথা বলতে চাই, মৃত্যুবরণ করার সময় আমাদের মনে বড় বেদনা লাগে যে আমাদের প্রিয়জনকে অনেক অপ্রিয় কথা বলেছি। আমরা যদি দীর্ঘতর দিন বেঁচে থাকতে পারতুম তা হলে আমরা সেটা স্মরণে এনে নিজেদের অনেক বেশি সংযত করতে পারতুম। হয়তো আমার এ কথাটি তুমি স্মরণে রাখবে তাতে করে তোমার জীবন এবং সর্বশেষে তোমার মৃত্যু– তুমি নিজের জন্যে এবং অন্যদের জন্যেও সহজতর করে তুলতে পারবে।
