ইংল্যান্ড, ২৪ জুন ১৯৪৪
…এসব তো হল, ওলো, প্রাচীন প্রিয়া (ওন্ড গারল)! বাচ্চাদের আমার হয়ে আদর দিয়ে বল, আমি ইউরোপ থেকে ওদের জন্য সুন্দর টুকিটাকি নিয়ে ফিরে আসব– যখন নিষ্প্রদীপ বিশ্ব আবার আলোকোজ্জ্বল হবে।
ফেরেনি। এক মাস পরে রণাঙ্গনে তার মৃত্যু।
.
০৯.
আডাম ফন ট্রটৎসু (Zu) জলৎসু, জর্মন।
জন্ম : ১৯০৯
মৃত্যু : ২৬ আগস্ট ১৯৪৪
হিটলারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করার জন্য বার্লিনের প্ল্যোসেজে কারাগারে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত।
ইহলোক থেকে মাতার কাছে বিদায় জানিয়ে মৃত্যুর ক্ষণকাল পূর্বে লেখা শেষ পত্র।
বার্লিন-প্ল্যোসেনজে, ২৬ আগস্ট ১৯৪৪
সবচেয়ে আদরের মা!
তবু ভালো, তোমাকে সামান্য কয়টি ক্ষুদ্র ছত্র লেখার সুযোগ শেষটায় আমি পেয়েছি– তার জন্য ঈশ্বরকে ধন্যবাদ; তুমি সবসময়ই আমার কাছে ছিলে, এবং এখনও আছ–আরও নিবিড় হয়ে কাছে আছ। তুমি-আমি যে অনন্ত অনন্তকালীন যোগসূত্রে বাধা, আমি সেটি কৃতজ্ঞতার সঙ্গে জোর আঁকড়ে ধরে আছি। এ কয়েক সপ্তাহ ধরে ঈশ্বর আমাকে তার দাক্ষিণ্য দিয়ে ভরে রেখেছেন এবং সব প্রায় সবকিছুর জন্য আমাকে আনন্দময় সরল-স্বচ্ছ শক্তি দিয়েছেন। এবং তিনি আমাকে বুঝিয়ে দিয়েছেন এ জীবনে আমি কীভাবে, কোন কোন বিষয়ে কৃতকার্য হতে সক্ষম হইনি। কিন্তু এসবের চেয়েও সবচেয়ে বড় কথা : এই যে তোমাকে কঠিন শোক পেতে হবে, তার জন্য আমি তোমার কাছে ক্ষমা ভিক্ষা করছি, এবং বৃদ্ধ বয়সে তুমি যে আমার ওপর নির্ভর করতে, সেই নির্ভর থেকে তোমাকে বঞ্চিত করার জন্য আমি ক্ষমা ভিক্ষা করছি।
তোমায়-আমায় আবার মিলন হওয়ার পূর্বে একটি শেষ চুম্বন–কৃতজ্ঞতা আর স্নেহ ভরা।
তোমার পুত্র তোমাকে যে বড় ভালোবাসে।
— আডাম
তোমার পূত আত্মায়, হে প্রভু আমি নিজেকে সমর্পণ করি…
ইহলোক থেকে পত্নীর কাছে বিদায় জানিয়ে মৃত্যুর ক্ষণকাল পূর্বে লেখা শেষ পত্র।
বার্লিন-গ্লোৎসেনজে, ২৬ আগস্ট ১৯৪৪
প্রিয়া কণিকা ক্লারিটা,
দুঃখের বিষয়, সম্ভবত এই আমার শেষ চিঠি। আশা করি ইতোপূর্বে লেখা আমার দীর্ঘতর পত্রগুলো তোমার কাছে পৌঁছেছে।
আর কিছু বলার পূর্বে এবং সর্বোপরি আমি যা বলতে চাই : নিতান্ত অবাঞ্ছিতভাবে তোমাকে যে গভীর শোক দিতে হল, তার জন্য আমি মাফ চাইছি।
আমি প্রত্যয় দিচ্ছি, আমি চিন্ময়রূপে পূর্বের মতো তোমার সঙ্গে সঙ্গে থাকব, এবং দৃঢ়তম প্রত্যয় ও বিশ্বাস নিয়ে মৃত্যুবরণ করছি।
আকাশ আজ নির্মল, ঘন নীল (পিকক ব্লু) এবং গাছে গাছে মর্মরধ্বনি। আমাদের আদর-সোহাগের মিষ্টি মিষ্টি কথা বাচ্চা দুটোকে শিখিয়ে, তারা যেন পরমেশ্বরের এ প্রতীকগুলো বুঝতে পারে এবং তাদেরও গভীরে যে-প্রতীকগুলো আছে, সেগুলোও চিনতে শেখে। –কৃতজ্ঞতাসহ, কিন্তু গ্রহণ করার সময় যেন থাকে সক্রিয় বীর্যবান সাহস।
আমি তোমাকে বড় ভালোবাসি।
তার পর অনেক অনেক কিছু বলার রইল। কিন্তু তার জন্য আর সময় নেই।
ঈশ্বর তোমাকে রক্ষা করুন (আমাদের ঈশ্বর রতু-অনুবাদক) আমি জানি, তুমি কক্ষনও পরাজয় স্বীকার করবে না। আমি জানি, তুমি জীবনসগ্রামে ক্রমাগত এগিয়ে যাবে, এবং যদিও সে সংগ্রামে তোমার মনে হয় তুমি একা, তবু জেনো, আমার অদেহী স্বরূপ অহরহ তোমার সঙ্গে সঙ্গে থাকবে। আমি প্রার্থনা করছি, তুমি যেন শক্তিলাভ কর, তুমিও আমার জন্য সেই সেই প্রার্থনা করো। এই শেষের ক-দিনে পুরগাতোরিয়ো এবং মেরি স্টুয়ার্ট পড়বার সুযোগ আমার হয়েছিল।… এছাড়া পড়বার মতো এ ধরনের বিশেষ কিছু আমার ছিল না কিন্তু মনের ভিতর অনেককিছু উল্টে-পাল্টে দেখেছি এবং শান্তচিত্তে সেগুলো পরিষ্কার করে বুঝে নিয়েছি। তাই বলছি, আমার জন্য অত্যধিক শোক করো না–কারণ তলিয়ে দেখলে বুঝতে পারবে, সবকিছুই অত্যন্ত সরল, পরিষ্কার, যদিও সেগুলো গভীর বেদনাদায়ক।
আমার জানতে বড় ইচ্ছে করে, এই যা সব ঘটল, তার ফলে তোমাদের জীবনযাত্রায় কোনও পরিবর্তন হল কি না? তুমি কি রাইনবে যাবে, না যেখানে আছ, সেখানেই থাকবে? অবশ্যই তারা সকলে তোমাকে অত্যন্ত আদরের সঙ্গে গ্রহণ করবেন আমার প্রিয়া, ছোট্ট বউটি আমার! আমার পূর্বের পত্রগুলোতে তোমাকে বলেছিলুম আমার যে বহু বন্ধুবান্ধব আছেন তাদের শুভেচ্ছা জানাতে– এটা আমার অন্তরতম কামনা। তুমি ওদের সকলের সঙ্গে সুপরিচিত; তাই আমার সাহায্য ছাড়াও তুমি আমার শুভেচ্ছা ঠিকমতো তাদের জানাতে পারবে।
আমি সর্ব হৃদয় দিয়ে তোমাকে আলিঙ্গন করছি, অনুজ করছি তুমি আমার সঙ্গে আছ। ভগবান তোমাকে ও বাচ্চাদের আশীর্বাদ করুন।
তোমার প্রতি অবিচল প্রেমনিষ্ঠ,
–আডাম
এ চিঠি দুটি অন্যান্য চিঠির তুলনায় অসাধারণ বলে না-ও মনে হতে পারে। কিন্তু আম। ছিলেন অতিশয় অসাধারণ পুরুষ। অত্যন্ত ধর্মনিষ্ঠ ছিলেন তিনি ছেলেবেলা থেকেই এবং হিটলার তার অভিযান আরম্ভ করার সময় থেকেই তিনি বুঝে যান, এইসব নীতি-বিবর্জিত অখ্রিস্টান আন্দোলন জর্মনি তথা তাবৎ ইয়োরোপকে মহতী বিনষ্টির পথে নিয়ে যাবে। আপন দেশে লেখাপড়া করার পর তিনি অক্সফোর্ডে রোর্ডস্ স্কলাররূপে বেলিয়েল কলেজে খ্যাতিলাভ করেন। খোলা-দিল সাদা মনের মানুষ ছিলেন বলে সেসময় তিনি একাধিক ভারতীয়ের সঙ্গে আলাপ-পরিচয় করেন। যুদ্ধের পর যখন তার পূর্ণাঙ্গ জীবনী লেখা হচ্ছিল তখন তাঁর অক্সফোর্ডের বন্ধু শ্ৰীযুত হুমায়ুন কবীরকেও মাল-মসলা দিয়ে সাহায্য করতে অনুরোধ করা হয়।
