মানচুরিয়া
বেশিদিন তো হয়নি তোমার সঙ্গে ছিলুম অথচ ইতোমধ্যেই তোমার সঙ্গ পাবার জন্য আবার আমার কী দুরন্তু আকুলি-বিকুলি। আমরা একসঙ্গে কাটিয়েছি অল্পকালই, তবু তোমার সে-সময়কার চলাফেরা-ওঠাবসার কত না ছবি আমার চোখের সামনে ফুটে উঠছে। আর সবচেয়ে জীবন্ত হয়ে ফুটে ওঠ তুমি, যেখানে তুমি কোমল, মৃদু। আমাদের উভয়ের শিশুসন্তানটি জন্ম দেবার পর থেকে তুমি আরও সুন্দর হয়ে উঠেছ। তোমার সৌন্দর্যে যেটুকু শুষ্কতা ছিল সেটা রসঘন হয়ে গিয়েছে, তুমি পেয়ে গেলে এক নবীন পবিত্র সৌন্দর্য মাতৃত্বের সৌন্দর্য। আমার স্মরণে আছে সেদিনকার ছবি, যেদিন আমি টোকিও ছেড়ে চলে এলুম– সামান্য একটু প্রসাধন করে তুমি তখন বসে আছ খাটের উপর।
তখন কী সরল হাসিটি তোমার! অথচ যখন তুমি আমার কল্যাণ কামনা করে বিদায় নিতে এলে আমাদের আঙিনায়, তখন, এই বুঝি, এই বুঝি তুমি কান্নায় ভেঙে পড়বে। নিতান্ত সেই নীরবতা ভাঙবার জন্য আমি তোমাকে বললুম, সাবধান থেক। তার পর আমি ইজুমি আর প্রতিবেশীদের সঙ্গে রাস্তায় নেমে পড়লুম। আমি তখন মনে মনে আমাদের বাড়ির দিকে পিঠ ফিরিয়ে নিয়েছি। আমার ভাবনাচিন্তা তখন যুদ্ধক্ষেত্রের দিকে। আমি হৃদয়ে হৃদয়ে অনুভব করছিলাম, আমার মাতৃভূমির সবকিছু যেন সেই সময়েই অন্তর্হিত হল। আমার এই অনুভূতিটি তোমার পক্ষে বোঝাটা হয়তো কঠিন হবে কিন্তু তুমি আমার হয়ে একবার আমার এই অবস্থাটি কল্পনায় বুঝতে চেষ্টা কর। আমার মনে হয়েছিল, ওই বিদায়মুহূর্তে যেন আমার দেহ উর্ধপানে ধেয়ে গিয়ে অনন্তে চলে গেল।
কিন্তু এখন? আজ রবিবারের এই সকালে আমার সর্ব দেহমন ধেয়ে চলেছে তোমা পানে।
বুঝিয়ে বলি; আমার হৃদয় কামনা করছে, তোমার অক্ষিপল্লব মৃদু মৃদু স্পর্শ করতে, তোমাকে শান্ত আলিঙ্গনে ভরে নিতে। তুমি যখন স্মিতহাস্য কর তখন তুমি বড় সুন্দর এবং সবচেয়ে সুন্দর তোমার দন্তপক্তি। হ্যাঁ, তোমার বর্ণ উজ্জ্বল শুদ্র নয়, কিন্তু মানতেই হবে, সে বর্ণ পরিপক্ক গোধূম বর্ণ–তোমার চর্ম সম্পূর্ণ অকুঞ্চিত কোমল। তোমার বক্ষ পূর্ণস্তন–মাতৃত্বের স্ফীতবক্ষ। এবং বর্ণ সেখানে প্রায় স্বচ্ছ ও। আমি তোমার বুকের উপর শিশুটির মতো ঘুমিয়ে পড়তে চাই। বহুবার কামনা করেছি, তোমার সুডৌল গোল বাহুতে মাথা রেখে আরাম লাভ করতে। তোমার সুন্দর সুবিন্যস্ত ওষ্ঠাধরে চুম্বন দিতে দিতে আমি মৃদু হাস্য করি আর তুমি প্রত্যুত্তরে মোহনীয়া মৃদু হাস্য দিয়ে আমাকে জাদু করছ। এরমধারা যত আমার কামনা এগিয়ে যায় ততই ভোমাকে কাছে পাবার বাসনা দুর্বার হয়ে ওঠে। না– এরকম ধরনে আমি আর লিখতে পারব না। এ লাইনটি পড়ে তুমি হয়তো হেসে উঠবে, কারণ এটা আমার স্বভাবের বিপরীত। কিংবা হয়তো তুমি আশ্চর্য হচ্ছ, তোমার কাছে আমার মূল্য বেড়ে যাচ্ছে নয় কি? কিংবা হয়তো ভাবছ, আমি শিও বুড়ো খোকা এবং তাই আমাকে সোহাগ করতে চাইছনা?
এসব নির্মল স্মৃতি আমার চোখের সামনে বার বার ভেসে ওঠে আর সে-সময়কার কথা বার বার মনে পড়ে।
তোমার পূর্ণ বক্ষ আমার চোখের সামনে মায়াময় কায়া ধরে ফুটে ওঠে। আমার ইচ্ছে যায় যে নিটোল বক্ষে হাত বুলোই ধীরে অতি ধীরে–তোমার মধুর নাসিকা, তোমার মুখ চুম্বনে চুম্বনে ভরে দিই। তুমি তখন মধুর হাসি হেসে উঠবে, আমাকে আদর-সোহাগ করবে। বল দেখি, অন্য কোথা; কোথায় আছে এই বিশ্বভুবনে, এরকম হৃদয়কাড়া সৌন্দর্য
সুস্থ শরীর-মনে থেক। তোমার চিত্তটিকে সৌন্দর্যময়, প্রেমময় করে রেখ। এরকম যে-মা তার কাছে আমি ফিরে আসছি শিগগিরই।
আমাকে আলিঙ্গন কর, তোমার পূর্ণ বক্ষ, উষ্ণ স্তন দিয়ে।
একটুখানি ধৈর্য ধরে থাক–ব্যস, ওইটুকু শুধু।
.
হায়! বহু যুগ পূর্বে শ্রীরাধার সখী তাকে বলেছিলেন, ধৈর্যং কুরু, ধৈর্যং কুরু গচ্ছং মম মথুরাবে কিন্তু শ্রীকৃষ্ণ ফিরে আসেননি।
পূর্বে নিবেদন করেছি জাপানিরা রহস্যময়। কিন্তু এ চিঠি তো আদৌ রহস্যময় নয়। এ তো সেই রামগিরির বিরহী যক্ষ, মালয়ের কবি আমির হামজার মতো উষ্ণ দীর্ঘশ্বাস ফেলছে!
আর এ পত্রে প্রেম ও কামের কী অনবদ্য সমন্বয়।
.
১৯৪৪ খ্রিস্টাব্দের গ্রীষ্মে ফ্রান্সে সৈন্য অবতরণ করে জর্মনি জয়ের জন্য, ইংলভ তার তাবৎ কমনওয়েলথের এবং অন্যান্য সৈন্য সেখানে জমায়েত করেছিল। তারা এসেছে অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, আরও মেলা দেশ এবং প্রধানত, সবচেয়ে বেশি আমেরিকা থেকে।
ওই সময়ে জনৈক ক্যানাডাবাসীর পত্র- তার বউকে।
ডনালড আলবেরট ডানকান, কানাডা।
১৯৪৪ সালে, জুলাই মাসের শেষের দিকে, ফ্রান্সে সৈন্যবিতরণের সময় নিহত।
ইংল্যান্ড, ১৪ মে ১৯৪৪
…ইংল্যান্ড এখন আর ইংরেজের (জমিদারি) নয়। এ দেশটা এখন সম্পূর্ণ দখল করেছে মার্কিনরা। একই সঙ্গে চার-চারটে বেস্ বল খেলার মাঠ তৈরি হয়েছে হাইড পার্কে। ইংরেজরা অবশ্যই অনেকখানি সহিষ্ণু, কিন্তু একথা নিশ্চিত মনে বলা যেতে পারে, তারা মার্কিনদের সঙ্গে গভীর পীরিতি-সায়রে নিমজ্জমান হয়নি! মার্কিনদের কাঁড়ি কাঁড়ি কড়ি! তদুপরি কেড়ে নিয়েছে হুঁড়িদের, বাসা বেঁধেছে সেরা সেরা হোটেলে। (প্রথম বিশ্বযুদ্ধের গোড়ার দিকে ইংরেজও কড়ির পদে প্যারিসে তাই করেছিল। এই কলকাতাতেই আমরা মার্কিনদের সে রোওয়াব দেখেছি!) কিন্তু ইংরেজ করবে কী? ফ্রান্সে নেমে জর্মনিকে রাজিত করতে হলে যে ইয়াংকিদের প্রয়োজন।
