১৯৪৫-এর মে মাসে যুদ্ধশেষে বিজয়ী রুশ সেনা যেমন যেমন জর্মনির অন্তর্দেশে ঢুকল, সঙ্গে সঙ্গে ক-ক’র বন্দিদের খালাস করে ভ্রাতভাবে আলিঙ্গন করল– কারণ এই বন্দি ছিল হিটলারবৈরী, জমনের দুশমন।
ওই সময়কার অবস্থা বর্ণনা করে চিঠি লিখছে এক চেকোস্লোভাক বন্দি। চিঠিখানি দীর্ঘ। আমি কাটছাঁট করে অনুবাদ দিচ্ছি :
য়ারোস্লাভ য়ান পাউলিক; চেকোস্লোভাকিয়া।
জন্ম ২০ ফেব্রুয়ারি ১৯৮৫।
মৃত্যু ১৩ মে ১৯৪৫।
উত্তর জর্মনি, মে ১৯৪৫
ওলাফ ঝড়ের বেগে, যেন হোঁচট খেয়ে ঢুকল আমার গারদে। রুপোলি চুলে মাথাভরা ওলাফ। খোঁড়া-পা ওলাফ, তার ক্রাচ দুটিয়ে নিয়ে। তার সেই মধুর হাসি হেসে সে আমায় আলিঙ্গন করল।
মুক্তি মুক্তি মুক্তি।
স্বাধীনতা স্বাধীনতা।
আমরা সবাই এখন মুক্ত, স্বাধীন। এমনকি ডাকাত, খুনিরাও মুক্তি পেয়েছে। সবাই মিলে লেগে গেল আশপাশে ডাকাতি লুটতরাজ করতে। আমি কিন্তু তাদের সঙ্গে যোগ দিতে পারলুম না। ওই যে পেটুক মুলার বলে, আমি ওসব ব্যাপারে একটা আস্ত বুদ্ধ। তদুপরি আমি ভুগে ভুগে অত্যন্ত দুর্বল; রোগে কাতর, সর্ব নড়নচড়নে অথর্ব। আর এই হট্টগোলের মাঝখানে এই প্রথম অনুভব করছি সেটা কতখানি। এদিকে আসছে বাসন বাসন ভর্তি আলু, রুটি, চিনি। অমুক (পত্ৰলেখক ইচ্ছে করেই নামটা ফাঁস করেননি–অনুবাদক) একটা খাসা, বেড়ে সুটকেস লুট করেছে– ভেতরে আছে, শার্ট-কলার-গেঞ্জি-রুমাল এবং চিনি, কোকো, সিগার, মাখন, এক বোতল হৃদয়ভেদী ব্র্যান্ডি, হেনেসি ব্র্যান্ডির চেয়েও উৎকৃষ্ট। তার সোওয়াদটা আমার জিভে এখনও লেগে আছে।
ওদিকে আঙিনার উপর ডাই ভঁই আলু। তন্দুরের ভিতর গাদা গাদা পাউরুটি ছুঁড়ে ছুঁড়ে ফেলা হচ্ছে, তৈরি হয়ে উড়ে উড়ে বাইরে চলে আসছে। পেপে আমাকে একটা ছেঁড়া সুয়েটার, একটা ছোরা আর একজোড়া জুতো দিয়েছে (ক-কর বন্দিরা দুরন্ত শীতে খড়, ন্যাকড়া দিয়ে পা বাধত অনুবাদক)। সত্যিকার জুতো! যতই চেয়ে দেখি প্রাণটা কী যে আনন্দে ভরে আসে।
রুশ সৈন্যবাহিনীর ট্যাঙ্ক, মোটরগাড়ি, বাইসিকল আমাদের সামনে দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। নমস্কার নমস্কার! কীরকম আছেন? (জুদ্রাসভুইয়েতে, কাহ্ন পজিভাইয়িতে?) বলছে তারা। তারা তাদের গাড়ির থেকে আমাদের দিকে ছুঁড়ে ফেলছে সিগারেট, রুপোলি-মোড়কে প্যাচানো ৫০ গ্রামের তামাক, মিষ্টি, মাখন-চর্বি, টিনের যাবতীয় বাদ্য, পাজ, টুথপেস্ট, দুধের গুঁড়ো, সিরাপ।
সকালবেলা খেলুম; আন্ডাবেকন, জামবাটি ভর্তি পরিজ, সঙ্গে বিস্তর মার্মালেড, রুটি মাখন প্যাজ, সত্যিকার কফি, চিনিসহ।
(দ্বিতীয় চিঠি)
হয়েছে। আমার একটি অনবদ্য, পুরো পাক্কা আমাশা হয়েছে। ফরাসি পাঁচকরা কালকের দিনে যা বেঁধেছিল (এই সময়ে একাধিক ফরাসি পাঁচকও ক-কতে বন্দি ছিল ও দ্রব্যাদি তথা মালমসলা পেয়ে বহুদিন পর মুখরোচক জিনিস তৈরি করছিল–অনুবাদক) কলিজা-ভাজা তার সঙ্গে সরে-দুধে মাখানো আলুভাতে, তাবত বস্তু পাজ-ফোড়নে, ওহ, সে কী সুন্দর, কী মধুর!
এখন আমাকে কী করতে হচ্ছে, ওইসবের সামনে দাঁড়িয়ে?
দুধ আর আঙুর রস! এই আমার পথ্যি।
দুপুরের খাবার সময় হয়ে এসেছে।
হায় আমার খিদে নেই, রুচি নেই। আমার প্রিয়া, আমার ছোট্ট বউটি এখন কী করছে, কী ভাবছে।
কাল তাকে পাবার জন্য আমার বুক যা আকুলি-বিকুলি করছিল।
মনে হচ্ছে, এইবারেই নাক-বরাবর ওরই দিকে ছুটে যাব।
.
হায়, যুদ্ধশেষের পাঁচ দিন পরই হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়।
.
০৮.
ভিন্ন ভিন্ন জাতের বৈশিষ্ট্য সম্বন্ধে বহু চুটকিলা প্রচলিত আছে।
জর্মনির দুই নম্বরের মোড়ল হারমান গ্যোরিঙ যখন বন্দি অবস্থায় রবেরগ মোকদ্দমায় আসামি তখন জেলের গারদে যেসব মার্কিন মনস্তাত্ত্বিক তাকে পর্যবেক্ষণ করতে আসতেন তাদের সঙ্গে দু-দণ্ড রসালাপ করে নিতেন। এক মোকায় তিনি বলেন,
তোমরা মার্কিন। ইয়োরোপীয় জাতগুলোর বৈশিষ্ট্য বুঝবে কী প্রকারে শোন :
একজন ইংরেজ শিকারি (ম্পোর্টসম্যান)
দুজন ইংরেজ একটা ক্লাব স্থাপন,
তিনজন ইংরেজ হার ম্যাজেটি কুইনের জন্য একটা কলোনি জয়।
তার পর হেসে বলতেন,
একজন ইতালীয় গাইয়ে,
দুজন ইতালীয়– ডুয়েট গাইয়ে
তিনজন ইতালীয় যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পলায়ন! হাঃ হাঃ হাঃ।
এবারে শুনুন,
একজন জর্মন–পণ্ডিত,
দুজন জর্মন একটি নতুন পলিটিকাল পার্টি স্থাপনা (এ বাবদে অবশ্য আমরা, বাঙালিরা এখন হেসে-খেলে জর্মনদের সঙ্গে পাল্লা দিতে পারি।
তিনজন জর্মন? হাঃ হাঃ- বিশ্বের বিরুদ্ধে সংগ্রাম ঘোষণা! তার পর ফিসফিস করে বলতেন, আর জাপানিরা।
একজন জাপানি–রহস্যময়!
দুজন জাপানি সে-ও রহস্যময়!
তিনজন জাপানি? এবারে এসে গ্যোরিঙ রহস্যপূর্ণ দৃষ্টিতে শ্রোতাদের দিকে তাকাতেন, তার পর বলতেন,
তিনজন জাপনি–সে-ও রহস্যময়। বলেই ঠা ঠা করে উচ্চহাস্য করতেন– সঙ্গে সঙ্গে তার ভালুকি থাবা দুটো দিয়ে তার বিশাল উরুতে থাবড়াতেন– যে উরুর একটা দিয়ে অক্লেশে যে কোনও বঙ্গসন্তানের দুটো কোমর হোতে পারে।
আমার এবং আমার বন্ধুজনেরও ওই ধারণা। যেন অনুভূতির কোনও বালাই-ই জাপানিদের আদৌ নেই। কিন্তু পরের পৃষ্ঠার চিঠিটি পড়ুন :
গরু কিকিয়ু।
জন্ম : ১৯১০
মৃত্যু : ফিলিপিনের যুদ্ধে, ২০ আগস্ট ১৯৫৪
স্ত্রী য়াকোকে লেখা :
