অর্থাৎ বাইরের কার্যকলাপে, সগ্রামে শান্তিতে রুশজন যতই দার্চ ধরুক না কেন, অন্তরে সে পুষে রাখে কোমলতা, করুণা, মৈত্রী। ব্যক্তিগতভাবে আমি এই বিশ্বাস ধরি।
আধুনিক রুশ সাহিত্যের সঙ্গে আমার পরিচয় অতি অল্প। কাজেই বলতে পারব না, কবি গোদমেনুকো রুশ দেশে কতখানি খ্যাতিপ্রতিপত্তি ধরেন। তবে তার আর একটি কবিতা আমার বড় ভালো লেগেছে।
বাইরে যতই বড়ফট্টাই করুক না কেন, হিটলারের অনেক চেলাই যে ভিতরে ভিতরে গড়ড্যাম্ কাপুরুষ ছিল সেইটে কবি প্রকাশ করেছেন অতি অল্পতেই। ভলগা-অঞ্চলের স্তালিনগ্রাদের যুদ্ধ তখন (ফেব্রুয়ারি ১৯৪৩) শেষ হয়ে গিয়েছে। বিশ্বজন, এমনকি জর্মন জাঁদরেলরাও তখন জেনে গিয়েছেন যে জর্মনির জয়াশা আর নেই। জয়াশা ত্যাগ করে মুণ্ডহীন দেহে যত্রতত্র বিচরণ করাটা তখন স্বাস্থ্যের পক্ষে ভালো ছিল না। কবিতাটি স্তালিত্যাদে লেখা।
স্তালিদগ্রাদ, মে–নভেম্বর, ১৯৪৩
ফেব্রুয়ারি শেষ হল।
নীলাকাশ
দেওয়ালের ফুটোগুলোর ভিতর দিয়ে
যেন চিৎকার করছে।
প্রতি চৌরাস্তায় তীরের চিহ্ন
জর্মন সৈন্যদের পথনির্দেশ করছে
কোথায় গিয়ে আত্মসমর্পণ করতে হবে।
এ তো ইতিহাস।
এ তো স্মরণের কাহিনী।
সংগ্রামের চিৎকার ভলগা-অঞ্চল থেকে সরে গিয়েছে।
এখন, কীভাবে ইস্কুলগুলো ফের বানাতে হবে
তাই নিয়ে দিবারাত্তির মহকুমা-শহরে গভীর আলোচনা হচ্ছে
বাচ্চারা নিয়ে এল অতিশয় সযত্নে
একখানা বেঞ্চি– কোনও জখম-চোট লাগেনি
যেন কাচের তৈরি পলকা মাল মাটির নিচের ঘর থেকে।
…সেই ঘর থেকে বেরিয়ে এল।
–হঠাৎ আলোতে-অন্ধপ্রায় হামাগুড়ি দিয়ে বেরিয়ে এল।
এক জর্মন সৈন্য।
ওহ্! কী কাঁপতে কাঁপতে সে দেওয়ালে পিঠ দিয়ে দাঁড়াল।
তার ওভারকোট ছেঁড়া, টেনা টেনা– পা দুটো নড়বড়ে।
ওই শেষ জর্মন সৈন্য স্তালিনগ্রাদে।
একদা বার্লিনে সে যে হামাগুড়ি দিত হুবহু সেইভাবে।
(নাৎসি-প্রধানদের সম্মুখে অনুবাদক)
এভাল্ট ফন ক্লাইস্ট-শ্লেনৎসিন।
জন্ম ২২ মার্চ ১৮৮৯।
ফাঁসিতে মৃত্যু ১৫ এপ্রিল ১৯৪৫।
জনৈক ধর্মভীরু নিষ্ঠাবান ক্যাথলিক ক্রিশ্চানের পূত্রাংশ। ইনি হিটলারের আদেশে প্রাণদণ্ডে দণ্ডিত হন :
ভগবানের দিকে যে জাতি যতখানি নিয়োজিত করেছে, সেই দিয়ে তার মূল্য বিচার করতে হয়। একটা অ-ক্রিস্টান জাতও ক্রিস্টানদের তুলনায় (যেমন আমরা অনুবাদক) ভগবানের অনেক নিকটতর হতে পারে। আজকের দিনের ক্রিস্টানরা ভগবানের কাছ থেকে অনেক দূরে।
.
০৭.
কনসানট্রেশন ক্যাপের (ক. ক) কেলেঙ্কারি কেচ্ছা এতদিনে হটেনটটরাও শুনে গিয়ে থাকবে কিন্তু তার গৌরবময় যুগে সে তার কীর্তিকলাপ এতই ঢেকে চেপে সারতে পেরেছিল যে সাধারণ নিরীহ জর্মন ক-কর ভিতরে কী হয় না-হয় সে সম্বন্ধে নানারকম গুজব শুনতে পেত বটে, পাকা খবর পাবার কোনও উপায় ছিল না। তদুপরি সুবুদ্ধিমান জর্মনমাত্রই জানত, এ বাবদে অত্যধিক কৌতূহল প্রকাশ করা আপন স্বাস্থ্যের জন্য প্রকৃষ্টতম পন্থা নয়। যেমন ১৯৪৫-এ যখন যুদ্ধ জয়ের কোনও আশাই ছিল না তখন হিটলার-হিমলার আইন জারি করেন যে, কেউ যদি বলে যে এ যুদ্ধে জর্মনির জয়াশা নেই তার মুণ্ডচ্ছেদ করা হবে; ওই সময় এক জর্মন তার বউকে গোপনে বলে, যুদ্ধে জয়লাভ করার ভরসাটা বরঞ্চ ভালো। মুণ্ডুহীন ধড় নিয়ে হেথাহোথা ছুটোছুটি কাটা স্বাস্থ্যের পক্ষে আদপেই ভালো নয়।
গল্পটি সেই সময়কার।
ট্যুনিস আর শ্যেল দুই নিরীহ, সদাশান্ত জর্মন। দুজনাতে দোস্তি। পথিমধ্যে দেখা। ট্যুনিস শুধোল, যা রে শ্যেল, অ্যাদ্দিন কোথায় ছিলি বল তো!
হুঁহহ!
সে কী রে? কথা কইছিস না কেন? আমি তো শুনলুম, তোকে কনসানট্রেশন ক্যামপে ধরে নিয়ে গিয়েছিল। ওই জায়গাটা সম্বন্ধে তো নানান কথা শুনি! কীরকম ছিলি সেখানে
শ্যেল বলল, ফার্স্ট ক্লাস। উত্তম আহারাদি। পরিপাটি ব্যবস্থা। সকালে বেড়-টি। জামবাটি ভর্তি চা। একটি আপেল, দুখানা খাস্তা বিস্কুট। তার পর আটটা-ন্টায় ব্রেকফাস্ট। ডাবরভ সর-দুধ, কবৃফ্লেক, চাকতি চাকতি কলা, উত্তম মধু। সঙ্গে তো টোস্ট, মাখন, চিজ আছেই। তার পর দুখানা অ্যাবড়া আন্ত মাছভাজা ফ্রেশ মাখমে। তার পর দুটো ফুল-সাইজ পোচ, ডিম ভাজা বা মমলেট– যা তোর প্রাণ চায়– বেকনসহ, কিংবা হ্যামও নিতে পারিস। তার পর
ট্যুনিস সন্দিগ্ধ নয়নে তাকিয়ে বলল, সে কী করে?
হা হা হা। ন-সিকে খাঁটি কথা কইছি। ক-ক’র বাইরে বসে তোরা তো নিত্যি নিত্যি খাচ্ছিস lunch-এর নামে লাঞ্ছনা, supper-এর নামে suffer। আমরা খাচ্ছিলুম… পুনরায় সসিজ, কটলেট, এসপেরেগাস, চিকেন রোসটের সবিস্তর বর্ণনা।
ট্যুনিস বলল, আমি তো কিছুই বুঝতে পারছিনে। হালে মুলারের সঙ্গে দেখা। সে-ও মাস ছয় ক-কতে কাটিয়ে এসেছে। সে তো বলল সম্পূর্ণ ভিন্ন কাহিনী। সে বলল
বাধা দিয়ে বাঁকা হাসি হেসে শ্যেল বলল, বলতে হবে না, সে আমি জানি। তাই তো বাবুকে ফের ওখানে ধরে নিয়ে গিয়েছে।
শ্যেল আর ওখানে ফিরে যেতে চায় না। তাই ইংরেজিতে যাকে বলে সে তার বর্ণনা-টোস্টে প্রেমসে লাগাচ্ছে প্রয়োজনাতিরিক্ত গাদা গাদা মাখন।
কিন্তু শেল-বর্ণিত ঘটনা সত্য সত্যই ঘটেছিল ক-কতে তবে ভিন্নভাবে। যাকে বলে–
উল্টো বুঝলি রাম, ওরে উল্টো বুঝলি রাম।
কালে করলি ঘোড়া, আর কার মুখে লাগাম ॥
