শক্তি দিয়ে যুঝে যেবা দেহ করে দান,
প্রভু রাখে তার তরে মহান নির্বাণ—
মা আমার, আমার অদ্বিতীয় কল্যাণী মা, আর আমার ছোট হান, আমার সর্ব ভালোবাসা সর্বকাল তোমাদের সঙ্গে সঙ্গে থাকবে; সাহস ধর–আমি যেরকম সাহস রাখব বলে দৃঢ়প্রত্যয়। —-নিত্যকালের
তোমার মেয়ে হিলডে
মাতাকে নিহত করে যারা শিওকে মাতৃদুগ্ধ থেকে বঞ্চিত করে তাদের কী নাম দিয়ে ডাকি? হিটলার সর্বদাই ইহুদি বেদের পরিচয় দিতেন তাদের Untemensch= Undermen নাম দিয়ে অর্থাৎ মানুষ যে স্তরে আছে ইহুদি বেদে তাদের নিচের স্তরে। তাই তাদের গ্যাসচেম্বারে পুরে মারা হয়। অথচ আমার যেটুকু অভিজ্ঞতা তার থেকে বলতে পারি, এই দুই জাতই মাতা মাত্রকেই অবর্ণনীয় অসাধারণ প্রীতিম্নেহের চোখে দেখে। এইবারে পাঠক চিন্তা করুন Untermensch পদবি ধরার হক সবচেয়ে বেশি কার?
মনকে এই বলে সান্ত্বনা দিই যে হিলডের যে দুটি চরম কামনা ছিল সে-দুটি পূর্ণ।
আর সান্ত্বনা দিই যে তাকে দীর্ঘকাল বৈধব্যশোক সইতে হয়নি। কিন্তু প্রশ্ন ওই-কটি মাসই তার কী করে কেটেছে? আর ওই-কটি মাসেই তার পিতা বড় হানস কী গর্ব, কী বেদনাই না অনুভব করেছিল।
আর সান্ত্বনা দিই এই ভেবে যে মাত্র ন মাসের শিশু মাতৃবিচ্ছেদের শোক হৃদয়ঙ্গম করতে পারেনি। কিন্তু প্রশ্ন, সে যে মাতৃদুগ্ধ না খেয়ে অন্য দুগ্ধ খাচ্ছে সেটা কি সে ইন্সটিক্ট দিয়ে (অনুভূতি-জাত সরাসরি জ্ঞান) বুঝতে পেরেছিল।
মনকে যতই চোখের ঠার মারি না কেন, যতই সান্ত্বনা খুঁজি না কেন, এ চিঠি গিলতে গিয়ে আমাদের সর্ব বুদ্ধি বিবেচনা সর্ব অনুভূতি চেতনা অসাড় হয়ে যায়।
এই পুণ্যশ্লোকা প্রাতঃস্মরণীয় কন্যা মৈত্রেয়ীর অনুজা। তিনি অমৃতের সন্ধানে ইহবৈভব ত্যাগ করেছিলেন (যেনাহং নামৃতা স্যাং কিমহমং তেন কুর্যাম)। ইনি মাতা ত্যাগ পুত্র ত্যাগ করলেন সত্যশিবের সন্ধানে।
এই অতিশয় অসাধারণ পত্রের পর অন্যের পত্র কি পাঠকের মনে সাড়া জাগাবে? কি আমি তো কোনও ক্লাইম্যাক্স সৃষ্টি করার জন্য চিঠিগুলো বাছাই করে করে ফুলের তোড়া সাজাচ্ছি না। যেমন যেমন পড়ে যাচ্ছি সঙ্গে সঙ্গে সেগুলো আমার হৃদয় স্পর্শ করছে সেগুলো অনুবাদ করে দিচ্ছি এবং আমি বাঙালি বলে আশা করছি বাঙালি হৃদয়ও এগুলো গ্রহণ করবে।
তাই চীন দেশের একটি কবিতা।
বাচ্চাটির বয়স যখন পাঁচ তখন তার বাপ যুদ্ধে মারা যায়। এবং তাকেও কৈশোরে পৌঁছতে না পৌঁছতেই যুদ্ধে যেতে হল। কবিতাটি ঈষৎ মডার্ন স্টাইলে ফ্লাশ-ব্যাক করে রচিত। মডার্নদের বুঝতে কোনও অসুবিধা হবে না, ভূমিকা হিসেবে উপরের দুটি ছত্র লিখতে বাধ্য হলুম প্রাচীনপন্থী পাঠকদের জন্য।
য়েন যুই : চীন।
যুদ্ধের সময় ১৯৪৩ খ্রিস্টাব্দে আহত, তারই ফলে ১৯৪৯ খ্রিস্টাব্দে মৃত্যু।
(সমরাঙ্গনের পুরোভূমিতে তরুণ)
এ তো একফোঁটা ছেলেমাত্র আর এরি মধ্যে যুদ্ধ।
হিম্মতে সে ভরপুর তবু হৃদয় থেকে যেন রক্ত ঝরছে।
তার বয়স তখন মাত্র পাঁচটি হেমন্ত– যখন বাপ যুদ্ধে মারা গেল।
বাড়ি দৈন্যে ঢাকা পড়ল, খাদ্য বস্ত্র খেলনা নেই।
ছেলেটির বয়স ক্ৰমে চোদ্দ হল, তাকেও যুদ্ধে নিয়ে গেল।
দুঃখ-বেদনায় মাতৃহৃদয় খণ্ড খণ্ড হয়ে গেল।
সমস্ত গ্রীষ্মকাল জুড়ে চলল রক্তপাত আর বহ্নি-দাহনের তাণ্ডব,
ছেলের সংবাদ– সে কোন সুদূরে মরে গেছে না জয়ী হবে।
তখন বিদায় নেবার সময় হায় রে নিষ্ঠুর নিয়তি
ছেলেটি জামাকাপড় পরেছিল বাচ্চাদের মতন তখনও।
তার পর সে বাড়ি ফিরল– বাপেরই মতো হয়েছে লম্বা
মায়ের চোখের দিকে তাকাল, মায়ের কোলে লুটিয়ে পড়ল।
চোখের জল ঝরে পড়ে মায়ের কাপড় দিলে ভিজিয়ে
অতীত কি কেউ কখনও ভুলতে পারে?
বাপ যা চেয়েছিল ছেলেকে সেটা এগিয়ে নিয়ে যেতে হল
আবার মায়ের কাছ থেকে বিদায় নিতে হল একটি কথাও বলেনি সে—
.
০৬.
জাঁদরেল থেকে জোয়ান –তা তিনি জর্মন হন বা ফিনই– বস্তৃত যারাই রুশদের বিরুদ্ধে লড়েছে তারা সকলেই একবাক্যে স্বীকার করেছে কষ্টসহিষ্ণুতা আর দার্টে রুশ সৈন্যের জুড়ি নেই। যে অবস্থায় অন্য যে কোনও দেশের সৈন্য ভেঙে পড়বে– বোধহয় একমাত্র জাপানি ছাড়া সেখানে রুশ জোয়ান খানিকক্ষণ ঘাড় চুলকোবে কোনও কিছু ঠিক ঠিক ঠাহর করতে তার বেশ একটু সময় লাগে তার পর এক হাতের তেলোতে আর এক হাত দিয়ে যেন অদৃশ্য ধুলো ঝাড়ছে ওই মুদ্রাটি এঁকে বলবে নিচ্ছিভো। ইট ইজ নাথিং, ডাজুনট ম্যাটার-এর দূরের অনুবাদ। কুছ পরোয়া নহি কই বাত নহি তবু অনেক কাছের অনুবাদ।
কিন্তু দার্ঢ্য– ওইটেই আসল কথা। কিন্তু ওইটেই কি শেষ কথা?
(কবিতা)
সেমেন গোদসেন্কো : সোভিয়েত ইউনিয়ন।
জন্ম ১৯২২। মে ১৯৪২-এর যুদ্ধে আহত হওয়ার ফলে ১৯৫৩ সালে মৃত্যু।
কুড়িটি বচ্ছর আমাদের বয়স বল,
তার পর এই যুদ্ধের বৎসরে,
সর্বপ্রথম আমরা দেখলুম রক্ত, দেখলুম মৃত্যু
সরল, সোজাসুজি, মানুষ যেরকম স্বপ্ন দেখে অক্লেশে।
আমার স্মৃতিপট থেকে কিছুই মুছে যাবে না,
যুদ্ধে প্রথম মৃত জনের সঙ্গে দেখা,
বরফের উপর প্রথম রাত্রিযাপন, শীতে জমে গিয়ে
একে অন্যকে পিঠ দিয়ে ঘুমুলুম।
আমি আমার পুত্রকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাব মৈত্রীর দিকে
তাকে যেন কখনো যুদ্ধ করতে না হয়–
সে যেন আমাদের মতো কাঁধে কাঁধ ছুঁইয়ে
মিত্রগণের সঙ্গে ধরণীর বুকে পা ফেলে চলে।
সে যেন শেখে : ন্যায্যভাবে
রুটির শেষ টুকরো ভাগাভাগি করতে।
…মসকোর হেমন্ত, স্মলেনসকের শীত ঋতু,
আমাদের অনেকেই মারা গিয়েছে।
কিন্তু সৈন্যবাহিনীর ঝঞ্ঝা, বসন্তের ঝঞ্ঝা
পরিপূর্ণ করে দিয়েছে এই নব ফাল্গুন।
বিরাট যুদ্ধ এই করে
মানুষের বুকের পাটা ভরে দেয় সাহস দিয়ে।
মুষ্টি হয় দৃঢ়তর, বাক্য হয় গুরু-ভার।
এবং বহু কিছু তখন হয়ে যায় পরিষ্কার।
…কিন্তু এখনও তুমি বুঝতে পারনি–
এইসব অভিজ্ঞতা সত্ত্বেও আমি হয়েছি আগের চেয়ে কোমলতর।
