জনৈক জর্মন সৈন্যদ্বারা লিখিত :
হেরবেরট ডুকস্টাইন : জর্মনি।
জন্ম ২৩ ফেব্রুয়ারি ১৯০৯ মাগডেবুরগ।
মৃত্যু ২ জুন, ১৯৪৪, যো আনিনা, গ্রিস-এ যুদ্ধে নিহত।
গ্রীষ্ম ১৯৪৪
ডিটমার বা মণিকা– আমার অজাত সন্তান!
যাত্রা এখনও আরম্ভ হয়নি তোমার যাত্রা আমার যাত্রা কারওরই না। সেই বিরাট ঘটনার প্রাক্কালে আমরা উভয়েই প্রতীক্ষমাণ, তুমি তোমার তোমার জন্মগ্রহণ করার, আর আমি আমার যুদ্ধ এবং কাল-ঘূর্ণাবর্ত আমাকে যেখানে টেনে নিয়ে যাবে। সেইহেতু এ পত্র প্রধানত তোমার মায়ের উদ্দেশে লেখা- যে মাতা তার আপন দেহ দিয়ে তোমার আমার মধ্যে সংযোগ স্থাপনা করেছেন। আমি তোমাকে ভালোবাসি যতদিন তোমার হৃৎপিণ্ড স্পন্দন তোমাকে নিয়তি-নির্দিষ্ট যে পথে যেতে হবে সে পথ দেখিয়ে দিয়ে যায়।
আমার হৃদয় সমস্ত ভালোবাসা দিয়ে, যতখানি শক্তি সে ধরে– কিন্তু হায়, সে শক্তি বুঝিবা তার নেই যে তোমার বিরাট অভিযানের প্রথম পদক্ষেপগুলো দেখা যাবে শুভেচ্ছা জানায় তোমার মাতাকে ইহসংসারে তোমার সর্বশ্রেয়া যিনি এবং তোমাকে–
— এখনও যার সঙ্গে তোমার পরিচয় হয়নি, তোমার পিতা।
হস্য হসিআও-হসিঅ্যান, চীন।
১৯৪৩-এ যুদ্ধে নিহত।
(একটি ক্ষুদ্র কবিতা)
সংঘ-প্রাচীরের পিছনে
আমাদের বন্ধুত্ব হল নিবিড়তর।
আমরা বিরাট বিরাট যত সব প্ল্যান করলুম
আমাদের আদর্শ আকাঙ্ক্ষা ছিল সুদূরব্যাপী…
কিন্তু বিদায়ের সময় শুধু নাড়লাম মাথা–
একটি মাত্র কথা না বলে একে অন্যের দিকে।
কেননা সেনাবাহিনী তখন এসে দাঁড়িয়েছে
প্রাচীর দুর্গতোরণের সম্মুখে ॥
———–
১. কিন্তু পত্ৰলেখকের স্বপ্ন বাস্তবে পরিণত হয়েছিল। এর ঠিক এক বত্সর পর বিজয়ী রুশ সেনা নাৎসিদের বিতাড়িত করে বুলগারিয়ায় সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত করে। ওই সময় বিস্তর নাসিমিত্র নবীন রাষ্ট্র কর্তৃক মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হয়। আশা করি, পত্রলেখক যে কামনা করেছিলেন এবারে সেটা পূর্ণ হয়েছিল অর্থাৎ নবীন রাষ্ট্র পত্রলেখক বৈরী-নাসিমিত্রদের মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করার পূর্বে তাদের শিশুসন্তানদের কথা ভেবেছিল।
.
০৫.
যুদ্ধের সময় মাতারাই যে তাদের সন্তান হারিয়েছে তাই নয়, শিশুও মাকে হারিয়েছে– বিশেষ করে গত যুদ্ধের সময়। তাই এ যুদ্ধে মাকে লেখা মেয়ের চিঠিও আছে।
হিটলার গদিতে বসার আগে থেকেই তাঁর শক্র কম্যুনিস্ট ও সোশ্যালিস্টরা তার বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে এবং গোপনে সগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছিলেন। যারা ধরা পড়েন তাদের বিরুদ্ধে মাঝে মাঝে বিচারের নামে পরিহাস করা হত বটে, কিন্তু অধিকাংশকেই বিনা-বিচারে কনট্রেশন ক্যামূপে বন্ধ করে তাদের ওপর পাশবিক নির্যাতন চালানো হত।
যুদ্ধ না লাগলে হয়তো হিমলার হিটলার এদের অনেককে প্রাণদণ্ডে দণ্ডিত করতেন না। কিন্তু হিটলার রুশ-রণাঙ্গনে যতই হারতে লাগলেন ততই তার নিষ্ঠুরতা জিঘাংসা উত্তেজিত হতে লাগল– এই বিদ্রোহী পক্ষের প্রতি। হিটলার তখন স্ত্রী-পুরুষে আর কোনও পার্থক্য রাখলেন না। এমনকি নবজাত শিশুর মাতাও তার বর্বরতা থেকে নিষ্কৃতি পেল না।
১৯৪২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে স্বামী হানস কপপিসহ স্ত্রী হিলডে কপি গ্রেপ্তার হন। এঁরা দুজনেই হিটলারের বিরুদ্ধে সক্রিয় সোশ্যালিস্ট ছিলেন। কারাগারে হিডে একটি শিশুপুত্রের জন্ম দেন। পিতা নামেই এই শিক্ম নামকরণ করা হয় হাস–এ রেওয়াজ পৃথিবীর বহু দেশে আছে। ছোট হাসের ভূমিষ্ঠ হওয়ার এক মাস পর পিতা বড় হানকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়, এবং মাতা হিডেকে আট মাস পরে ১৯৪৩ সালের ৫ আগস্ট। তখন তার বয়স ৩৪।
মাতাকে লেখা কন্যার পত্র
আমার মা, গভীরতম ভালোবাসার মা-মণি,
সময় প্রায় এসে গিয়েছে যখন আমাদের একে অন্যের কাছ থেকে চিরতরে বিদায় নিতে হবে। এর ভিতর কঠিনতম ছিল আমার ছোট হানমের কাছ থেকে চিরবিদায় নেওয়া– সেটা হয়ে গিয়েছে। সে আমাকে কী আনন্দই না দিয়েছে! আমি জানি, সে তোমার মেহনিষ্ঠ মাতৃহস্তে অতি উত্তম রক্ষণাবেক্ষণ পাবে এবং আমার তরে মা-মণি- প্রতিজ্ঞা কর তুমি সাহসে বুক বাঁধবে। আমি জানি, তোমার বুকে বাজছে, এই বুঝি তোমার হৃদয় ভেঙে পড়বে, কিন্তু তুমি নিজেকে শক্ত করে নিজের হাতে চেপে ধর–খুব শক্ত করে। তুমি ঠিক পারবে–তুমি তো কঠিনতম বাধাবিঘ্নের সামনে সর্বদাই জয়ী হয়েছ– এবারেও পারবে না মা? তোমার কথা যতই ভাবি, তোমাকে যে নির্মম বেদনা আমি দিতে যাচ্ছি সেই কথা– এটাই আমার কাছে সবকিছুর চাইতে অসহনীয়– এই ভাবনা যে, জীবনের যে বয়সে আমাকে দিয়ে তোমার সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন তখনই আমায় ছেড়ে যেতে হচ্ছে তোমাকে। তুমি কি কখনও কোনওদিন আমাকে ক্ষমা করতে পারবে? তুমি তো জান মা, আমার যখন বয়স কম ছিল– অনেকরাত্রে ঘুম আসত না– তখন যে-চিন্তা আমার মনকে সজীব করে তুলত সেটা–আমি যেন তোমার আগে ও-পারে যেতে পাই। এবং তার পরবর্তীকালে আমার মাত্র একটি আকাঙ্ক্ষা ছিল; সে আকাক্ষা দিবারাত্র, জানা-অজানায় আমার সঙ্গে সঙ্গে থাকত– এ সংসারে একটি সন্তান না এনে কিছুতেই আমি মরব না। তা হলে দেখ মা, আমার এই দুই মহান কামনা এবং তাই দিয়ে আমার জীবন পরিপূর্ণ সফলতা পেয়েছে। এখন আমি যাচ্ছি আমার বড় হানসের মিলনে। ছোট হান– আমি আশা ধরি আমাদের দুজনার ভিতর যা ছিল ভালো, সেইটে পেয়েছে। এবং যখনই তুমি তাকে তোমার বুকে চেপে ধরবে, তোমার এই শিশুটি সর্বদাই তোমাকে সঙ্গ দেবে আমার চেয়ে বেশি, আমি তো আর কখনও তোমার অত কাছে আসতে পারব না। ছোট হাস্- আমার আশা যেন সুদৃঢ় শক্তিশালী হয়, সে যেন মুক্তহৃদয় হয়, দরদী সেবাশীল হৃদয় ধরে এবং তার বাপের অকলঙ্ক চরিত্র পায়। আমরা একে অন্যকে নিবিড়, বড় নিবিড়ভাবে ভালোবেসেছিলুম। প্রেমই আমাদের সর্বকৰ্ম নিয়ন্ত্রিত করেছিল।
