এবারে একটি কবিতার গদ্যানুবাদ
আমি হামজা : মালয়, রাজপরিবারজাত কবি।
জন্ম ২০ ফেব্রুয়ারি ১৯১১, সুমাত্রায়। যুদ্ধাবসানের অরাজকতার সময় ১৯৪৬ সালে সুমাত্রায় নিহত।
(প্রিয়মিলন তৃষ্ণা)
কী মধুর! হে সমারোহময় মেঘরাশির শোভাযাত্রা
তুমি ঢেকে নিয়েছ সুনীল আকাশের নীলাঞ্জন।
দাঁড়াও ক্ষণেক তরে এই কুটিরের ’পরে
দূরের প্রবাসী তিয়াসী এক পথিকের কুটিরের ’পরে—
এক লহমার তরে, এক পলকের তরে
আমি তোমাকে শুধু শুধদতে চাই,
তোমাকে হে মেঘ তোমাকে শুধোতে চাই
তুমি কোন দিকে যাবে মনস্থির করেছ?
কোন দেশে গিয়ে তুমি দাঁড়াবে?
হে মেঘ, আমার প্রিয়ার কাছে নিয়ে যাও আমার বিরহ ব্যথা
তাকে কানে কানে বলো আমার বিরহ বেদনা
তার তরুণ সোনালি হাঁটু দুটিকে তুমি আলিঙ্গন করো,
যেন আমি নিজে সে দুটিকে আলিঙ্গন করছি।
এ কবিতা তো আমাদের বহুদিনকার চেনা কবিতা!!
———-
১. এর ঠিক এক মাস পরে ইতালিতে যুদ্ধের অবসান হয়। তাই বলে দুঃখ হয় যে সতেরো বছরের ছেলেটির মা যখনই একথাটা ভাববে তখনই তার শোক কত না গম্ভীর হবে।
২. জর্মন ইতালির ফ্যাসি সম্প্রদায় সৈন্যদের উর্দি পরে গিঞ্জে যাওয়াটা পছন্দ করত না। তারা গির্জেকে রাষ্ট্রের শত্রুভাবে দেখত এবং উর্দি না পরে গির্জে যাওয়াটাও অতি কষ্টে বরদাস্ত করত।
৩, ওইদিনই প্রথম খবর প্রকাশ পায়, ইতালির রাজা তার মিত্রশক্তি জনিকে ত্যাগ করে মার্কিন-ইংরেজের সঙ্গে সন্ধি করে ফেলেছেন, ফলে দেশে ভ্রাতৃযুদ্ধ আরম্ভ হয়। যে সৈন্য আহত হয় সে ছিল পার্টিজান দলের। (বর্তমান লেখকের ভেন্দেত্তা দ্রষ্টব্য)।
.
০৪.
ইভান লাকফ : বুলগারিয়া।
জন্ম দ্রিয়ানভো-তে ১ জানুয়ারি ১৯১৫। মৃত্যু ২২ নভেম্বর ১৯৪৩, বুলগারিয়ার পুলিশ কর্তৃক নিহত।
২১ নভেম্বর ১৯৪৩
যে একটিমাত্র বাসনা আমার আছে সেটি বেঁচে থাকার। তোমার খাস চেপে ধরে বন্ধু করে দিল, তোমাকে ছিনিয়ে নিয়ে গেল, ধীরে ধীরে তোমার চৈতন্য লোপ পেল; গারদের কুটুরি আরও ছোট হয়ে গেল, এ কুটুরিতে কখনও বাতাস ঢোকে না। তৎসত্ত্বেও বেঁচে থাকবার জন্য কী অদম্য স্পৃহা!
আর আমার ছোট ছেলেটি! এখন থেকেই সে আমার অভাব অনুভব করতে আরম্ভ করে দিয়েছে। যে কথাগুলো সে আমায় বলেছিল সেগুলো এখনও আমার মনকে চঞ্চল করে তোলে : বাবা, তুমি যখন ফিরে আসবে তখন আমার জন্য একটা ট্রাম-লাইন কিনে দেবে আর ছোট একটি গাড়ি, আর একজোড়া জুতো!
আমার পুত্র আমার অনুপস্থিতি অনুভব করে। আমার আদরসোহাগ সে কামনা করে, আমার কথা ভেবে সে ব্যাকুল হয়। আমি যখন তাকে বললুম, এরা আমাকে তোর কাছে যেতে দেয় না, তখন সে আমাকে বলল, তুমি যে আমার কাছে আসতে চাও না, তার মানে তুমি আমাকে ভালোবাসো না– না বাবা? শিশুসন্তানের এ কী সরল ভালোবাসা, তার আত্মাটি কত না বিরাট ভালোবাসা ধরতে জানে!
কিন্তু এই এরা যারা আমাদের মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করলেন, এদের কি তবে শিশুসন্তান নেই? এঁরা কি নিজেদের ভুল বুঝতে পারেন না, অন্যের প্রতি কি এদের কোনও সমবেদনা নেই? অতি অবশ্যই সর্বদাই এরা কোনও কিছু দিয়ে নিজের মনকে বোঝাতে জানেন। যখন তাদের উচিত আমাদের মৃত্যুর চরম দণ্ডাদেশ না দিয়ে লঘুতর দণ্ড দেওয়া অন্যসব কারণ বাদ দিয়ে হোক না সে শুধু আমাদের শিশুসন্তানদের মুখের দিকে তাকিয়ে তখন তারা বলেন, শাসনদণ্ডের আইন সে অনুমতি দেয় না। এ কী মূর্খতা। কিন্তু বোধহয় এঁরা আপন শিশুসন্তানের প্রতি আমাদের মতো এ গভীর ভালোবাসা পোষণ করেননি। কারণ তাই যদি হত তবে তাদের আচরণ অন্য রকমের হত। আমার এখনও স্মরণে আসছে জেনারেল কচো স্টয়ানফের কথা আমাকে কী বলেছিলেন : বিচারকেরা সন্তানদের কথা স্মরণ রাখেন। কিন্তু আমি এখনও বুঝতে পারছিনে, হয়তো কখনওই বুঝতে পারব না, তাই যদি হবে, সন্তানদের কথা যদি তারা স্মরণে রাখেন তবে এরকম দণ্ডাদেশ দেন কী প্রকারে?
রাষ্ট্র শক্তিমান এবং রাষ্ট্র কাউকে পরোয়া করে না (ডিফাই)। কিন্তু তাই যদি হবে তবে এরা আমাকে গুলি করে মারছে কেন?
২১ নভেম্বর ১৯৪৩
পুত্রকে–
আমি জানি পিতৃহীন হয়ে তোমার জীবনধারণ কঠিন হবে এবং তোমাকে অনেক দুঃখ-যন্ত্রণা সইতে হবে। কিন্তু যে সমাজতন্ত্রের জন্যে আমি এ জীবন আহুতি দিচ্ছি সে ব্যবস্থা আসবে(১) এবং তোমাদের জীবনযাপনের জন্য মহত্তর পরিবেশ সৃষ্টি করবে।
তুমিও সংগ্রামী হও এবং ন্যায়ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হও। তোমার মাকে ভালোবাসবে, হে প্রিয়পুত্র। জীবনের বিপদ-আপদে তিনি তোমাকে রক্ষা করবেন।
বুলগারিয়ার রাজনৈতিক পটভূমি বড়ই জটিল। পাঁচশো বৎসর তুর্কদের কবলে পরাধীনতার পর বুলগারিয়া ১৮৭২-এ রুশদের সাহায্যে স্বাধীনতা পায়, কিন্তু গৃহযুদ্ধ লেগেই থাকে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আরম্ভে বুলগারিয়ার জনসাধারণ ছিল রুশ-মিত্র, পক্ষান্তরে রাজা বরিস ও তার ফৌজি অফিসাররা ছিলেন হিটলার-প্রেমী। কারণ এই রাজ্যবিস্তার লোভী দলকে হিটলার অনেক লোভ দেখিয়ে হাত করেন এবং প্রকৃতপক্ষে সেখানে তাঁরই চেলাচামুণ্ডারা বুলগার অফিসারদের সাহায্যে নৃশংসভাবে রাজত্ব চালাত। পত্রলেখক স্পষ্টত নাৎসিবৈরী জনসাধারণের অন্যতম ও নাৎসিদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার জন্য মৃত্যুবরণ করেন।
