মিসাক মানুচিয়ান, তুরস্ক
১৯০৬ খ্রিস্টাব্দে আদি-ইয়মনে (তুর্কি– আরমেনিয়ায়) জন্ম; ২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৪৪-এ প্যারিসে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত।
২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৪৪ [প্যারিস]
(আমার মৃত্যুর পর) যারা বেঁচে থাকবেন তারাই ধন্য, কারণ তারা মধুর স্বাধীনতা উপভোগ করবেন। আমার মনে কোনও সন্দেহ নেই যে ফরাসি জাতি এবং অন্যান্য স্বাধীনতা যুদ্ধের সংগ্রামী আমাদের স্মৃতিকে যথোপযুক্ত সম্মান দেবে। মৃত্যুর সম্মুখে দাঁড়িয়ে আমি পরিষ্কার ভাষায় বলছি, আমি জর্মন জাতের প্রতি কোনও ঘৃণা অনুভব করি না… প্রত্যেক মানুষ তার কর্মফল অনুযায়ী তিরস্কার পাবে। জর্মন ও অন্যান্য জাত যুদ্ধশেষে শান্তিতে, ভ্ৰাতৃভাবে জীবনধারণ করবে; এ যুদ্ধ শেষ হতে আর বিলম্ব নেই। বিশ্বজন সুখী হোক।
গভীর বেদনা অনুভব করি আমি যে, আমি তোমাকে সুখী করতে পারিনি। আমি চেয়েছিলুম, তুমি আমাকে একটি সন্তান দেবে, এবং তুমিও সবসময় তাই চেয়েছিলে। তোমার প্রতি তাই আমার অনুরোধ, আমার শেষ ইচ্ছা পূর্ণ করার জন্য যুদ্ধের পর তুমি অতি-অবশ্য পুনরায় পরিণয় করে সন্তান লাভ করবে।
আজ রোদ উঠেছে। এরকম দৃশ্য আর সুন্দর প্রকৃতির পানে তাকিয়ে আমি তোমাকে নিত্যদিন কতই না ভালোবেসেছি। তাই বিদায় বিদায়! বিদায় নিচ্ছি এ জীবনের কাছ থেকে, তোমাদের সকলের কাছ থেকে, আমার প্রিয়াপেক্ষা প্রিয়তমা পত্নীর থেকে, এবং আমার ভালোবাসার বন্ধুজনের কাছ থেকে। আমি তোমাকে নিবিড় আলিঙ্গন করছি, তোমার ছোট বোনকেও এবং দূরের এবং নিকটের পরিচিত সব বন্ধুজনকে।
———–
১. সলমন দ্বীপপুঞ্জের বৃহত্তম দ্বীপ অস্ট্রেলিয়ার অধীনে।
২. তাজিমামরি গীতটি আমি জোগাড় করতে পারিনি কোনও গুণীন পাঠক যদি সেটি সংগ্রহ করে অনুবাদসহ প্রকাশক মহাশয়কে পাঠান তবে লেখক তার কাছে কৃতজ্ঞ থাকবে।
.
০৩.
একথা অনেকের কাছেই অবিদিত নয় যে, প্রাচ্যে মাতার প্রতি বয়স্ক পুত্রের যতখানি টান থাকে, পশ্চিমে বিশেষ করে ফ্রান্স জর্মনি ইংলন্ড প্রভৃতি দেশে পুত্রের টান তার চেয়ে অনেক কম। এসব দেশের কবিরা মাতার উদ্দেশে কবিতা রচেছেন অত্যল্পই। তার একটা কারণ বোধহয় এরা বিয়ে করে মার সঙ্গে বাস করে না–বউ নিয়ে আলাদা সংসার পাতে। আমাদের বড় এবং মাঝারি শহরেও এ রীতি কিছুটা আরম্ভ হয়ে গিয়েছে।
তা সে যাই হোক, যুদ্ধের সময় অনেক সৈন্যই মাতাকে বার বার স্মরণ করে। হৃদয় খুলে তার সব কথা জানায়। তাই যুদ্ধের সময় ভিন্ন ভিন্ন পরিবেশে লেখা চিঠিতে পাঠক মানব-হৃদয়ের নতুন নতুন মর্মস্পর্শী পরিচয় পাবেন।
যুদ্ধ তার রুদ্রতম নিকটতম বদন দেখায় সিভিল উয়োর বা ভ্রাতযুদ্ধের সময় এবং আশ্চর্য সেসময় মানুষের করুণাধারাও যে কীরকম উছলে পড়ে সেটা বহু চিঠিতে বহুভাবে প্রকাশ পায়।
গত বিশ্বযুদ্ধের শেষের দিকে ইতালিতে ভ্রাতৃযুদ্ধ চলেছে। এ চিঠিটা সে সময়কার।
রবেতো নানিঃ ইতালি, বলনা স্কুলের ছাত্র।
জন্ম ১৯২৮। প্যারাশুট থেকে ভূপৃষ্ঠে সংঘর্ষে ২৮ মার্চ ১৯৪৫(১) সালে নিহত।
২১ জানুয়ারি ১৯৪৫
(মাতাকে লিখিত)
আজ এই প্রথম ইউনিফর্ম পরে গিঞ্জের উপাসনায় আমি যোগ দিয়েছিলুম।(২) আর বিশ্বাস কর মা আমার হৃদয় কী অনুভূতিতেই না ভরে উঠেছিল। ছেলেবেলায় তুমি যে আমাকে সঙ্গে করে গিঞ্জেয় নিয়ে যেতে সে-সময়কার কথা ভাবছিলুম। আমার কাছে পরিষ্কার হয়ে গেল যে, যত দিন যায় মানুষের বয়স বাড়ে বটে কিন্তু প্রকৃতপক্ষে হৃদয়ের গভীরে সে ছেলেমানুষই থেকে যায়। আমরা সমবেত কণ্ঠে অসংখ্য জনের প্রার্থনা গীতি গাইবার সময় যখন পুণ্যময়ী মাতার নাম এল তখন শুধু যে আমারই দু চোখ জলে ভিজে গেল তাই নয়, আমার বন্ধুদেরও তাই হল। তোমার কাছ থেকে চিঠি পাবার যে সুযোগ সুবিধা ও আনন্দ পাবার অধিকার আমার আছে তার মূল্য আমি তখন বুঝতে পারলুম কারণ আমার বহু সাথীর পরিবারবর্গ শক্র-অধিকৃত এলাকায় আছে বলে তারা কোনও চিঠি পায় না।
আমার বিশ্বাস, যে নাম মানুষ বিপদের মুখোমুখি হলে সঙ্গে সঙ্গে স্বতঃস্ফূর্ত হয়ে ডেকে ওঠে সে নাম মা।
শত্রুপক্ষের যাকে আমি দুবাহুতে করে ফার্স্ট এডের ঘাঁটিতে নিয়ে যাচ্ছিলুম সে চেঁচিয়ে ডেকেছিল মা। যেতে যেতে তার মনের মধ্যে শুধু ছিল একটিমাত্র চিন্তা : তার মা। কাতর হয়ে আমাকে শুধোচ্ছিল, আমরা তার মাকে কিছু করিনি তো? আমি যতই না বলছিলুম সে বিশ্বাস করতে পারছিল না। আমাকে মিনতি জানাচ্ছিল আমি যেন সদা আমার মাকে অবশ্য অরণে রাখি, তোমার সম্বন্ধে খবর জানতে অনুরোধ করছিল, জিগ্যেস করছিল আমি তোমার কাছ থেকে চিঠি পাই কি না, তোমার কোনও ফটো আমার কাছে আছে কি না, কারণ তার আপন মায়ের কোনও ছবি তার কাছে ছিল না এবং তাই তোমার ফটোতে সে তার আপন মায়ের ছবিও দেখতে চেয়েছিল।
৮ সেপ্টেম্বর(৩) নিয়ে যারা অবহেলার সঙ্গে আলোচনা করে কণামাত্র জানে না ওইদিন আমাদের পিতৃভূমির জন্য কী দুর্ভাগ্য আর পরিপূর্ণ বিনাশ নিয়ে এসেছে। তারা যদি আমি যা এইমাত্র বর্ণনা করলুম সে দৃশ্যের সম্মুখে থাকত! কারণ, বুঝলে মা, যে লোকটাকে আমি গুলি করে আহত করতে বাধ্য হয়েছিলুম, যাতে করে সে আমার উপর আগেই গুলি না করতে পারে; সে আর আমি তো একই ভাষাতে কথা বলি, এবং মা বলে সে ডেকে উঠেছিল, এই এখন আমি তোমাকে যে নাম ধরে ডাকছি…
