২. ফ্রান্সে যুদ্ধ হবার পর অনেকেই বিশ্বাস করত, ফরাসিদের আলসেমিই তাদের ওই পরাজয়ের কারণ।
৩. শিবকে আলিঙ্গন- এটা মনে হচ্ছে, জর্মন কবি গ্যোটে থেকে উদ্ধৃত। পত্রলেখক আরি জর্মনদের হাতে নিহত হচ্ছে, অথচ সে বিশ্বপ্রেমিক বলে বিশ্বকবি– জর্মন-গ্যোটেকে উদ্ধৃত করছে।
৪. সাব এবং ম্য ফ্রান্সের দুই নদী। আমাদের যেরকম গঙ্গা-যমুনা। বিগলিত করুণা জাহ্নবী যমুনা তুলনীয়।
৫, এক নম্বর টীকা দ্রষ্টব্য।
৬. দুই নম্বর ও পাঁচ নম্বর দ্রষ্টব্য।
৭. স্বর্গে বাপ, মা, পিয়ের ও সে নিজে এই চারজন সম্মিলিত হবে আশা করছে।
৮. কনটিনেন্টে পত্রলেখককে তার ঠিকানা দিতে হয় (যেমন আমাদের ইনল্যান্ড-লেটার)। তাই আঁরি তার ঠিকানা দিয়েছে। এর থেকেই পাঠক বুঝতে পারবেন, সে যে গর্ব করেছে জীবনের শেষ মুহূর্ত অবধি (তার) হিউমার বজায় রেখে যাবে, সেটা কিছুমাত্র মিথ্যা দম্ভ নয়। কারণ এই-কটি শব্দই ইহজীবনে তার শেষ বাক্য।
যে-বই থেকে এই পত্রটি অনুবাদ করেছি তার নাম-ঠিকানা : Die Stimme des Menschen Briefe und Aufzeichnungen aus der ganzen Welt i 1939-1945 Gesam melt und herausgegeben von Hans Walter Baenl Piper Verlag, 1961, Muenchen.
.
০২.
এবারে একজন জাপানির চিঠি তুলে দিচ্ছি :
জিরুকু ইওয়াগায়া (Jinoku lwagaya), শিক্ষক, জন্ম ১৯২৩ সালে। ১৯৪৪ সালে ফিলিপাইন যাবার সময় যুদ্ধজাহাজডুবিতে সলিলসমাধি।
শিজুয়োকা, ১২ জুন ১৯৪৩
বুগাভিস(১) দ্বীপের কাছে যে নৌযুদ্ধ হয়ে গেল তার খবর আজ কাগজে বেরিয়েছে। প্রকাশ, একখানা বিরাট সৈন্যবাহী জাহাজ গুরুতরভাবে জখম হয়েছে ও একখানা জঙ্গি-জাহাজ সমুদ্রগর্ভে নিমজ্জিত হয়েছে। এভাবে মানুষ কেন সমুদ্রগর্ভে নিমজ্জিত হয়ে অতলে লীন হবে? জাপানিরা মারা গেলে শুধু জাপানিরাই, বিদেশিরা মারা গেলে শুধু বিদেশিরাই অবর্ষণ করে কেন? মানুষ শুধুমাত্র মানুষ হিসেবে সম্মিলিত হয়ে অবর্ষণ করে না কেন, আনন্দের সময় সম্মিলিতভাবে আনন্দ প্রকাশ করে না কেন? এ তত্ত্বটি যে কোনও শান্তিকামী জনের চিত্র আলোড়িত করবে। যেহেতু একটা বিদেশি মরেছে অতএব জাপানিরা বেশ পরিতৃপ্ত। এটা আমার কাছে চিরকাল অবোধ্য থেকে যাবে। তিন দিন চার দিন ধরে একটা লোক সমুদ্রে সাঁতার কাটতে কাটতে শেষটায় অবসন্ন হয়ে জলে ডুবে গেল এটা কী নিদারুশ! মৃত্যুর সঙ্গে আমার যদি সমুদ্রে কখনও দেখা হয় তবে কি আমি তাকে সজ্ঞানে চিনতে পারব?
৩ মার্চ ১৯৪৪
বিদায় নেবার পূর্বে আমি ক্লাসের ছেলেদের দিয়ে তাজিমামরি(২) গানটি গাওয়ালুম। আমি জানি না কেন, শুনে আমার বড় আনন্দ হল। এ গানটি আমি কখনওই ভুলব না; এটি আমাকে সবসময়ই স্মরণ করিয়ে দেবে যে আমি শিক্ষক ছিলুম।
মার্চ ১৯৪৪
আমি যুদ্ধে চললুম, কিন্তু আমি যুদ্ধ চাইনি। হয়তো আমার এ কথাটা কেউই বুঝবে না। কিন্তু কোনও মানুষকে হত্যা করার জন্য আমি কোনও তাগিদ অনুভব করি না। আমার মনে হয়, আমাকে যেন একটা দ টেনে নিয়ে ডুবিয়ে দিচ্ছে।
একাধিক জাতের বিশ্বাস এবং তারা যুদ্ধের সময় প্রোপাগান্ডা করে যে, জাপানিমাত্রই যুদ্ধের জন্য হামেহাল মারমুখো। এ চিঠি পড়ে পাঠক বুঝতে পারবেন, কথাটা সম্পূর্ণ সত্য নয়। এ ধরনের আরও চিঠি আছে। স্থানাভাবে তার অল্পাংশও তুলে দেওয়া সম্ভব নয়। আমার উদ্দেশ্য ভিন্ন ভিন্ন দেশের, ভিন্ন ভিন্ন টাইপের চিঠি অনুবাদ মারফত বহুবিধ মানবের চিন্তাধারা, হৃদয়ানুভূতি এবং তৎসত্ত্বেও সেগুলো সর্বজনীন– এগুলোর সঙ্গে পাঠকের পরিচয় করিয়ে দেওয়া।
যুগোস্লাভিয়ার জনৈক নাম-না-জানা সৈনিক,
অজাত শিশুর প্রতি পত্র,
(যুদ্ধের সময়ে)
হে আমার সন্তান, এখনও তুমি অন্ধকারে ঘুমুচ্ছ এবং ভূমিষ্ঠ হবার জন্য শক্তি সঞ্চয় করছ; আমি তোমার সর্বমঙ্গল কামনা করি। তুমি এখনও তোমার প্রকৃত রূপ (Gestalt) পাওনি; তুমি এখনও শ্বাসগ্রহণ করছ না; তুমি এখনও অন্ধ। তবু, যখন তোমার সে লগ্ন আসবে, তোমার এবং তোমার মাতার সে লগ্ন আসবে (তোমার সে মাতাকে আমি সর্বহৃদয় দিয়ে ভালোবাসি) তখন তুমি বাতাস এবং আলো পাবার জন্য সংগ্রাম করার মতো শক্তিও পাবে। আলোকের জন্য অক্লান্ত সগ্রাম করার অধিকার তোমার ন্যায্য প্রাপ্য। সেই কারণেই তুমি নারীদেহ থেকে শিশুরূপে জন্মগ্রহণ করবে, অবশ্যই তুমি প্রকৃত কারণ না জেনেই জন্মগ্রহণ করবে।
বেঁচে থাকতে যে আনন্দ আছে সেটাকে তুমি রক্ষা কর, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে মৃত্যুভয় ঝেটিয়ে বিদায় করে দিও। এই যে জীবন- এটাকে ভালোবাসা উচিত, নইলে এটা বৃথাই নষ্ট হয়, কিন্তু এটাকে মাত্রাধিক ভালোবাসা উচিত নয়।
নতুন নতুন জ্ঞান সঞ্চয়ের জন্য হৃদয় সর্বদা উন্মুক্ত রেখ; মিথ্যাকে ঘৃণা করার জন্য হৃদয় প্রস্তুত রেখ; অশিবকে তাচ্ছিল্যের সঙ্গে বর্জন করার মতো শক্তি সর্বধা হৃদয়ে ধারণ কর। আমি জানি, আমাকে এখন মরতে হবে, এবং তোমাকে জন্মগ্রহণ করতে হবে এবং আমার। যতসব ভুলত্রুটির জঞ্জালের উপর তোমাকে দাঁড়াতে হবে। আমাকে ক্ষমা করো। আমি নিজের কাছে নিজে লজ্জিত যে তোমাকে এই অরাজক আরামহীন সংসারের পিছনে রেখে চলে যাচ্ছি। কিন্তু এছাড়া তো কোনও গতি নেই। আমি কল্পনায় তোমার কপালে চুম্বন রাখছি- শেষবারের মতো তোমাকে আশীর্বাদ জানাবার জন্য। গুনাইট, বাছা আমার গুড় মরনিং এবং শুভ প্রভাতে তুমি জাগ্রত হও।
