যুদ্ধের সময় সৈন্য তো জানে না কোন মুহূর্তে তার মৃত্যু আসবে। সে যখন ওই সময় ট্রেনচে বসে আপন মা, বউ, প্রিয়া বা বোনকে চিঠি বা তাদের জন্যে ডাইরি লেখে তখনও সে মিথ্যা কথা বলছে, এ সন্দেহ করার মতো সিনিক বা ব্যঙ্গপ্রবণ অবিশ্বাসী আমি নই।
এ বইয়ে আছে গত বিশ্বযুদ্ধে যারা জড়িয়ে পড়েছিল, অর্থাৎ ইচ্ছা-অনিচ্ছায় সৈনিকরূপে একে-অন্যকে নিধন করতে হয়েছিল, তাদের শেষ চিঠি, ডাইরির শেষ পাতা। এ বিশ্বযুদ্ধ থেকে অল্প দেশই রেহাই পেয়েছিল সেকথা আমরা জানি। শান্তিকামী ভারত, এমনকি যুদ্ধে যোগদান না করেও নিরীহ এসৃকিমাও এর থেকে নিষ্কৃতি পায়নি।
এবং শুধু তাদেরই লেখা নেওয়া হয়েছে যারা এ যুদ্ধে নিহত হয় বা যুদ্ধে মারাত্মকরূপে আহত হওয়ার ফলে যুদ্ধের কয়েক বৎসর পরেই মারা যায় কিংবা যারা যুদ্ধক্ষেত্র থেকে বহুদূরে শান্তিপূর্ণ দেশে বাস করার সময় যুদ্ধের বীভৎসতা, আত্মজন বিয়োগের শোকে কাতর হয়ে আত্মহত্যা করে।
কিন্তু এত দীর্ঘ অবতরণিকা করার কণামাত্র প্রয়োজন নেই। দু-একটি চিঠির অনুবাদ পড়ে সহৃদয় পাঠক বুঝে যাবেন, এ অবতরণিকা কতখানি বেকার।
গত যুদ্ধে ফ্রান্স পরাজিত হলে পর জর্মন সৈন্যরা সেখানে কায়েম হয়ে দেশটাকে অকুপাই করে। সঙ্গে সঙ্গে বহু ছেলেমেয়ে, তরুণ-তরুণী, বৃদ্ধ-বৃদ্ধারা গড়ে তোলে আন্ডারগ্রাউন্ড মুভমেন্ট। তারা মোক পেলে জর্মন সৈন্যকে গুলি করে মারে, রেললাইন, তাদের বন্দুক-কামানের কারখানা ডাইনামাইট দিয়ে উড়িয়ে দেয় এবং আরও কত কী! এ প্রতিষ্ঠানটি আমাদের আপন দেশেও ইংরেজদের বিরুদ্ধে সম্পূর্ণ অজানা নয়।
এই আন্দোলনে যোগদান করার ফলে একটি মোল বছরের ফরাসি বালক জর্মনদের হাতে ধরা পড়ে এবং মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হয়। মৃত্যুর কয়েক মিনিট পূর্বে সে তার জনক-জননীকে একখানি চিঠি লেখে। এবারে আমি সেটি অনুবাদ করে দিচ্ছি :
…আমার প্রতি যারা সহানুভূতিশীল, বিশেষ করে আমার আত্মীয় ও বন্ধুদের আমার ধন্যবাদ জানিও; তাদের বলল যে (মাতৃভূমি) ফ্রান্সের প্রতি আমার অনন্ত বিশ্বাস। আমার হয়ে ঠাকুর্দা, ঠাকুমা, কাকারা, মাসিরা ও ওদের মেয়ে আমার বোনেদের প্রগাঢ় আলিঙ্গন করো। আমার পাদ্রিসাহেবকে বলো আমি বিশেষ করে তাকে ও তাঁর আত্মজনকে স্মরণে রেখেছি; আমি মসেনার (প্রধান পাদ্রি)-কে ধন্যবাদ জানাই। তিনি আমাকে যেভাবে গৌরবান্বিত করেছেন, আশা করি, আমি যে তার উপযুক্ত পাত্র সেটা প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছি। মৃত্যুর সময় আমি আমার স্কুলের বন্ধুদেরও আদর-সম্ভাষণ জানাই। আমার ক্ষুদ্র পুস্তক সঞ্চয়ন (লাইব্রেরিটি) পিয়েরকে,(১) আমার ইস্কুলের বই বাবাকে, আমার অন্যান্য সঞ্চয়ন আমার সবচেয়ে প্রিয় আমার মাকে দিয়ে গেলুম। আমার বাসনার ধন স্বাধীন ফরাসিভূমি এবং সুখী ফ্রান্সবাদী দস্ত্রী ফ্রান্স, পৃথিবীর সর্বাণী নেশন ফ্রান্স আমার কাম্য নয়; বরঞ্চ কর্মনিষ্ঠ ফ্রান্স,(২)-–কর্মনিষ্ঠ এবং আত্মমর্যাদাশীল ফ্রান্স। আমি প্রার্থনা করি ফ্রান্সবাসী যেন সুখী হয় সেইটেই সবচেয়ে বড় সত্য। তারা যেন শেখে জীবনে শিবকে আলিঙ্গন করতে।(৩)
আমার জন্য তোমরা কোনও চিন্তা কর না; জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আমি আমার সাহস ও সহজ রসবোধ (গুড হিউমার) বজায় রেখে যাব; আমি যাবার সময় সেই সাঁবর-এ-ম্যজ(৪) গানটি গেয়ে যাব, যেটি তুমি, আমার আদরের মা আমাকে শিখিয়েছিলে।
পিয়েরকে(৫) শাসনে রেখ কিন্তু স্নেহের সঙ্গে। আর লেখাপড়ার কাজ চেক আপ করে নিও এবং সে যেন ঠিকমতো খাটে(৬) তার ওপর জোর দিও। তাকে আলস্য-অবহেলা করতে দিও। আমি যেন তার শ্লাঘার পাত্র হই। সেপাইরা আসছে আমাকে নিয়ে যেতে। আমার হাতের লেখা হয়তো অল্প একটু কাঁপা-কাঁপা হয়ে গেল, তার কারণ পেনসিলটি বড় ছোট্ট; মৃত্যুভয় আমার আদৌ নেই; আমার আত্মা অত্যন্ত শান্ত।
বাবা, আমি তোমাকে অতিশয় অনুরোধ জানাই, প্রার্থনা করো। শুধু এই কথাটুকু বিবেচনা করো, এই যে আমি এখানে মরতে যাচ্ছি, সেটি আমাদের সক্কলের জন্য। এরচেয়ে শ্লাঘনীয় আমার কী মৃত্যু হতে পারত? আমি স্বেচ্ছায় পিতৃভূমির জন্য মৃত্যুবরণ করছি; স্বর্গভূমিতে আমাদের চারজনাতে(৭) ফের দেখা হবে। প্রতিহিংসাকামীদের মৃত্যুর পরও তাদের অনুগামী পাবে। বিদায় বিদায়! মৃত্যু আমাকে ডাকছে। আমার চোখে ফেটা বেঁধে আমাদের গুলি করবে সে আমি চাইনে, আমাকে হাতে-পায়ে বাধতেও হবে না। আমি তোমাকে সবাইকে আলিঙ্গন করি। তৎসত্ত্বেও কিন্তু বলি, বাধ্য হয়ে মরাটা কঠিন কাজ। সহস্র চুম্বন।
ফ্রান্স– জিন্দাবাদ!
ষোড়শ বসরে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত
এচ ফেরতে
হাতের লেখা আর ভুলচুকের জন্য মাফ চাইছি; আবার পড়ার সময় নেই।
পত্র-প্রেরক: আঁরি ফেরুতে, স্বর্গলোক, কেয়ার অব ভগবান।(৮)
———-
একাধিক পাঠক অনুযোগ করেছেন, অধমের রচনা ইদানীং বড্ডই টীকা কন্টকাকীর্ণ। আমার নিবেদন, টীকা না পড়লে কেউ ক্ষতিগ্রস্ত হবেন না। যারা নিতান্ত একটু-আধটু আশকথা-পাশকথা জানতে চান কিংবা এই আক্রাগার বাজারে বই কিনেছেন বলে প্রতিটি পিঁপড়ে নিঙড়িয়ে নিঙড়িয়ে গুড় বের করতে চান– এ টীকা শুধু তাদের জন্য।
১. পিয়ের খুব সম্ভব পত্রলেখক আঁরির (Henri=Henry) ছোট ভাই। তাই পিয়েরকে তার ছোটখাটো পুস্তক সঞ্চয়ন দিয়ে যাচ্ছে।
