কেলি তার পুস্তক প্রকাশ করেন সম্ভবত ১৯৪৭-৪৮-এ। তার পর দীর্ঘ একুশ বৎসর পরে, খবরের কাগজে পড়লুম, এক গণ্যমান্য মার্কিন অধ্যাপক অস্ট্রেলিয়াতে বক্তৃতা-প্রসঙ্গে বলেন, (কাটিং রাখিনি, মোদ্দাটা সাদামাটা ভাষায় বলছি) এখনও বিস্তর হিটলার রয়েছে; তারা সুযোগ পেলেই আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে।
এই মোক্ষম হক বাক্যটি আমরা যেন কখনও না ভুলি।
.
অনেকেই জিগ্যেস করেন, হিটলার কি শুধু ইহুদি এবং তার জর্মন-বৈরীদেরই (যেমন আমার সখা কার্ল, তথা কবীর-সখা ট্রটসু জলস) নির্যাতন করেছেন? দুঃখের সঙ্গে স্বীকার করতে হচ্ছে, শুধু তাই নয়। পোলিশ, চেকশ্লোভাক-বুদ্ধিজীবী, যুদ্ধে বন্দি রাশান অফিসার আরও বহুবিধ লোক তার দীর্ঘ হস্ত থেকে নিষ্কৃতি পায়নি। এমনকি, কয়েক হাজার নিতান্ত নিরীহ বেদের পালও কনসানট্রেশন ক্যাম্পে, গ্যাস-চেম্বারে প্রাণ দেয়; কী-এক অজ্ঞাত অখ্যাত ককেশাস না কোন এক অঞ্চলে ধৃত এক অতিশয় ক্ষুদ্র উপজাতি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, তারা স্লাভ
আর্য? জর্মন তথা বিশ্বের সর্ব বিশ্বকোষ এদের সম্বন্ধে কোনও খবর দেয় না। শেষটায় হিটলারের খাস-প্যারা হিমলার-চিত্রপ্ত–যিনি কনসানট্রেশন-নরকের কার্ড ইনডেক্সিং-এর চিফ সেক্রেটারি–তিনি রায় দিলেন, আল্লায় মালুম কোন দলিলদস্তাবেজ বিদ্যাবুদ্ধির ওপর নির্ভর করে যে, এরা স্লাভ, অর্থাৎ নাৎসি ধর্মানুযায়ী, বেকসুর বধ্য। ওরা মরে। যুদ্ধ শেষে তাবৎ খবর পাওয়ার পর বিশ্বপণ্ডিতরা নাকি ফতোয়া দিয়েছেন এরা আর্যদেরই কোন এক নাম-না-জানা উপজাতি। এবং কেউ কেউ বলেন, এই উপজাতি সমূলে নির্বংশ হয়েছে, কেউ কেউ বলেন, না, দু-একটা উটকো হেথা-হোথা বেঁচে আছে এবং বংশরক্ষার জন্য বন্ধু খুঁজে বেড়াচ্ছে। আমি সঠিক জানিনে।
কিন্তু এ বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই যে, ইহুদিরাই-সুদ্ধমাত্র ইহুদি পরিবারে জন্ম নেবার অপরাধ-এর ফলেই– প্রাণ দিয়ে খেসারত দেয় সর্বাধিক।
এ বাদে অন্যতম উল্কষ্ট দলিল সৌভাগ্যক্রমে বাংলা ভাষাতেই উকষ্টরূপে অনূদিত হয়েছে। একটি তেরো-চৌদ্দ বছরের ইহুদি মেয়ের ডাইরি বা রোজনামচা। যুদ্ধের সময় লেখা। বাংলাতে বইখানির নাম আন্ ফ্রাঙ্কের ডায়ারি, অনুবাদক শ্রীঅরুণকুমার সরকার ও শ্রীলংশুকুমার চট্টোপাধ্যায়। আমি মেয়েটির রোজনামচা থেকে কিছুটা তুলে দিচ্ছি; পরে সুযোগ পেলে সবিস্তার আলোচনা হবে। ডাইরিকে উদ্দেশ্য করে মেয়েটি লিখছে–
শুক্রবার, ৯ অক্টোবর, ১৯৪২
আজ তোমাকে কেবল খারাপ খবর শোনাব। আমাদের ইহুদি বন্ধুদের দলে দলে ধরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এইসব হতভাগ্য ইহুদিদের সাথে গেস্টাপো পুলিশ যে কী নির্দয় ব্যবহার করছে, তা তুমি কল্পনাও করতে পারবে না। এদের গরু-ছাগলের গাড়িতে বোঝাই করে ড্রেন্টের (Drente) ওয়েস্টারবর্ক (Westerbark) বন্দিশালায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। ওয়েস্টারবর্কের নাম শুনলেই গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে। একশো লোকের জন্য মাত্র একটি হাত-মুখ ধোবার কল। পায়খানা নেই বললেই চলে। স্ত্রী, পুরুষ ও শিত্তদের একই জায়গায় শোবার ব্যবস্থা। এর ফলে, ব্যাপকভাবে নরনারীর চরিত্রস্থলন হচ্ছে। বহুসংখ্যক স্ত্রীলোক, এমনকি অল্পবয়সী মেয়েরাও গর্ভবতী হয়ে পড়ছে।
বন্দিশালা থেকে পালানো অসম্ভব। বন্দিশালার অধিবাসীর মার্কা হিসেবে এদের সকলের মাথা ন্যাড়া করে দেওয়া হয়েছে। খাস হল্যান্ডেই যখন এই অবস্থা তখন দূরদেশে স্থানান্তরিত করে এদের ওপর যে কী অমানুষিক অত্যাচার করা হচ্ছে, তা সহজেই কল্পনা করা যায়। আমাদের বিশ্বাস যে, তাদের অধিকাংশকে হত্যা করা হচ্ছে। ব্রিটিশ রেডিও থেকে বলা হচ্ছে যে, তাদের গ্যাস দিয়ে মারা হচ্ছে।
বোধ করি, এইটিই হত্যা করার সবচেয়ে সহজ পন্থা। আমি ভীষণ ভয় পেয়ে গেছি। মিয়েপের মুখে এইসব ভয়ঙ্কর গল্প শোনার সময়, আমার রক্ত হিম হয়ে যাচ্ছিল, অথচ না শুনেও পারছিলাম না।
সম্প্রতি একজন বৃদ্ধা স্ত্রীলোক তার বাড়ির দরজার সামনে বসে ছিল। হঠাৎ পুলিশের গাড়ি তার বাড়ির সামনে এসে থামল, আর গাড়ি থেকে গেস্টাপো পুলিশ নেমে তাকে হুকুম করল, গাড়িতে উঠে এস। পঙ্গু হতভাগিনী চলতে পারে না, কোনওরকমে হামাগুড়ি দিয়ে গাড়িতে উঠতে গিয়ে চাকার তলায় পড়ে গেল। জর্মনরা তার উপর দিয়ে গাড়ি চালিয়ে তাকে পিষে মেরে ফেলল।
জর্মনদের আর একরকম অত্যাচারের নাম হল প্রতিশোধমূলক হত্যা। ব্যাপারটা এইরকম নিরীহ নাগরিকদের জামিনস্বরূপ জেলে পুরে রাখা হয়। যখনই হল্যান্ডের কোথাও জর্মনদের বিরুদ্ধে কোনও কার্যকলাপ অনুষ্ঠিত হয়, তখনই তার প্রতিশোধস্বরূপ, নির্দিষ্ট সংখ্যক লোককে জেল থেকে টেনে বের করে গুলি করা হয়। তার পর তাদের মৃত্যুসংবাদ কাগজে ছাপানো হয়। এই হল হিটলারতন্ত্রের আসল রূপ। এরা আবার নিজেদের আর্য বলে গর্ব করে।
—তোমারই আন
কত না অশ্রুজল
০১.
একখানা অপূর্ব সংকলনগ্রন্থ অধীনের হাতে এসে পৌঁছেছে। পুনরায়, বার বার বলছি অপূর্ব, অপূর্ব! এ বইখানিতে আছে, মানুষের আপন মনের আপন হৃদয়ের গভীরতম আত্মপ্রকাশ। কারণ মৃত্যুর সম্মুখীন মানুষ অতি অল্প অবস্থাতেই মিথ্যা কয় বা সত্য গোপন করে। এবং একটি দেশের একজন মানুষের সুখদুঃখের কাহিনী নয়; বহু দেশের বহুজনের। ফ্রান্স, জার্মান, ভারতবর্ষ, বেলজিয়াম, হলান্ড, রাশিয়া, আমেরিকা, ফিনল্যান্ড, ইংল্যান্ড, চীন, জাপান, কানাডা ইত্যাদি ইত্যাদি বস্তুত হেন দেশ প্রায় নেই যার বহু লোকের বহু কণ্ঠস্বর এই গ্রন্থে নেই।
