আসলে তার চেয়েও বেশি কিছু, বুঝেছ? আরও বড় কিছু। নিখাদ ভদ্রলোক তো বটেই, কিন্তু সেই সঙ্গে লড়াকু, যুদ্ধ করতে ভালোবাসে। শান্ত নিরীহ চেহারার আড়ালে এমন একটা শক্তি, ক্ষমতা লুকিয়ে আছে, যার মোকাবেলা করা ডরনিরও সাধ্য নেই। হতে পারে ও ক্ষিপ্র, অন্তত আমি তাই মনে করি, কিন্তু ডরনির সঙ্গে কেড্রিকের পার্থক্য হলো, মৃত্যুর আগ পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাবে কেড্রিক, ডরনি সেটা পারবে না।
প্রচণ্ড এক ধাক্কা খেয়েছে যেন লরেন কীথ। বারউইকের সঙ্গে এত বছরের জানাশোনা সত্ত্বেও তার এমন ক্রুদ্ধ ভয়াল চেহারা এই প্রথম দেখছে। আজ অবধি কাউকে এত সম্মান দেখিয়ে কথা বলতে তাকে দেখে নি সে-এ রকম ভয় পেতেও দেখা যায় নি। কেড্রিকের মাঝে কী দেখেছে বারউইক যা ওর নজর এড়িয়ে গেছে?
বিভ্রান্ত, বিরক্তিভরা দৃষ্টিতে বারউইকের দিকে তাকিয়ে আছে লরেন কীথ। কিন্তু বারউইকের অনুভূতি ওর মাঝেও সংক্রমিত হতে শুরু করেছে। অস্বস্তি ভর করল ওর মনে ঠোঁট কামড়ে পায়চারিরত বারউইকের দিকে চেয়ে রইল।
কেড্রিক একা নয়, তার সঙ্গে শ্যাডও আছে। ঠাণ্ডা, চোখা চেহারার টেক্সান। আর আছে লেইন- আবার কুঁচকে উঠল বারউইকের চোখ-তিনজনের মধ্যে ও-ই সবচেয়ে বিপজ্জনক। এখানে তার ব্যক্তিগত স্বার্থ জড়িত বলে ধরে নিয়েছে লেইন।
ব্যক্তিগত স্বার্থ মানে? জিজ্ঞাসু চোখে বারউইকের দিকে তাকাল কর্নেল কীথ, কী বলছ?
হাতের ঝাঁপটায় প্রশ্নটা এড়িয়ে গেল বারউইক। বাদ দাও। যাই হোক, ওদের এখন সরিয়ে দিতে হবে-যত তাড়াতাড়ি সম্ভব। ঘুরে দাড়াল সে, ঠাণ্ডা দৃষ্টি নিক্ষেপ করল কীথের উদ্দেশে। ওয়াশিংটনে সব ব্যাপারে তুমি সামনে ছিলে, কাজটা যদি কেঁচে যায়, তোমাকেই পস্তাতে হবে, ভুলে যেয়ো না। এবার যাও, কাজে নেমে পড়ো। হাতে সময় আছে, কাজের লোকেরও অভাব নেই। তা হলে আর দেরি কেন!
কীথ বেরিয়ে যাবার পর চেয়ারে এসে বসল বারউইক। শূন্য দৃষ্টিতে সামনে দরজার দিকে তাকাল। ঘটনা এতদূর গড়িয়েছে যে এখন ইচ্ছে করলেও আর পিছিয়ে আসা সম্ভব নয়, যদিও তেমন কোনও ইচ্ছে তার নেই। কীথ আর গুন্টারের চেয়ে ভালো লোক পাওয়া গেল না এটাই দুঃখ।
তবে এখনও সব দিক সামাল দেয়ার সুযোগ আছে। যে কোনও তদন্ত কমিটির মুখোমুখি হবার ক্ষমতা রাখে সে। এখানকার গোলমালকে অনায়াসে কাউ-কান্ট্রির স্বাভাবিক বিবাদ বলে চালিয়ে দেয়া যাবে। সবাই জানবে খামোকা তুচ্ছ বিষয়কে রঙ চড়িয়ে বিরাট রূপ দেয়া হয়েছিল। বাদী পক্ষের সাক্ষী না পেয়ে এগোতে পারবে না কমিটি। পুরো ব্যাপারটাকে চায়ের কাপের ঝড় বানানো সমস্যা হবে না। ব্ল্যানসারে ভয় করছে কীথ, বোঝাই যাচ্ছে, কিন্তু ওইসব র্যানসাম-টামের ঘোড়াই পরোয়া করে বারউইক।
ক্ষুদে অশ্বারোহীদল যখন শহর ছেড়ে মৃত্যু-অভিযানে যাচ্ছে, তখনও একই ভঙ্গিতে বসে আছে বারউইক। পিস্তলবাজের সংখ্যা বেড়েছে, লক্ষ্য করল সে, আরও চারজন দুর্ধর্ষ বেপরোয়া লোক যোগ দিয়েছে। কীথের সাহায্য ছাড়াও কাজ সারতে পারবে ওরা। উঠে দাঁড়াল বারউইক, জানালার কাছে গিয়ে বাইরে তাকাল। সামান্থার মৃত্যু তাকে দুঃখ দেবেমেয়েটাকে নিয়ে বিশেষ পরিকল্পনা ছিল। তবে ভুরুজোড়া কুঁচকে উঠল বারউইকের।
দূর মরুভূমিতে অস্থির হাওয়া বইছে। তামাটে আকাশে অনেক ওপরে একটা শকুন চক্কর দিচ্ছে, যেন নীচের পৃথিবীর উত্তেজনার আঁচ পেয়েছে সে।
উত্তরে, বেশ দূরে, ডুরাংগোর কাছাকাছি, একজন গরু ক্রেতা দলবলসহ থমকে দাঁড়াল। আকাশের দিকে তাকাল সে। ঝড়ের লক্ষণ নেই, অথচ গরু কেনার জন্যে ইয়েলো বাট আর মাস্ট্যাংয়ের উদ্দেশে ডুরাংগো ছাড়ার পর থেকেই একটা অস্বস্তিকর অনুভূতি ঘেঁকে ধরেছে ওকে। ওদিকে, গোলমাল হয়েছে শোনা গেছে, ওখানে ছোটখাট ঝামেলা লেগেই আছে, তাই ও নিয়ে আগে মাথা ঘামায় নি। কিন্তু এখন কেন যেন অস্বস্তি লাগছে। বাতাস যেন বিপদ-সঙ্কেত বয়ে আনছে।
দক্ষিণে, রিম থেকে দূরে, মাস্ট্যাংয়ের ট্রেইল থেকে ঘোড়া ঘুরিয়ে ইয়েলো বাটের পথ ধরল পল কেন্দ্রিক আর লরেড়ো শ্যাড। ওদের চলার পথ থেকে বেশি দূরে নয় জায়গাটা, ওখানকার ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিজের চোখে দেখতে চায়। কিন্তু ওরা যখন শহরে পৌঁছুল, পোড়া ধ্বংসাবশেষ আর বিধ্বস্ত দালান কোঠার কথা বাদ দিলে সব কিছু শান্ত বলেই মনে হলো। আট দশটা পরিবার আবার যার যার ঘরে ফিরে এসেছে, কেউ কেউ এখান থেকে একেবারেই নড়ে নি। দুজন ঘোড়সওয়ারকে এগিয়ে আসতে দেখে সতর্ক হয়ে উঠেছিল ওরা, কেড্রিকদের চিনতে পেরে মাথা দুলিয়ে স্বাগত জানাল।
ওরা জানে, কোম্পানির বিরুদ্ধে ওদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে কেড্রিক আর লরেড়ো।কিন্তু কঠোর পরিশ্রম আর প্রাণ বাঁচানোর সংগ্রামে ক্লান্ত, তাই কোনওরকম উচ্ছাস ছাড়াই ওদের স্বাগত জানাল ওরা। লিভারি-স্ট্যাবলের বিশাল অফিস-কামরায় স্থানান্তরিত হয়েছে স্যালুনটা। ভেতরে ঢুকল কেড্রিক আর লরেডো শ্যাড। দুজন লোক,বারের সঙ্গে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়েছিল, ঘুরে দাড়াল, কেড্রিকদের ইশারায় শুভেচ্ছা জানিয়ে আবার আলাপে ডুবে গেল।
বাইরে এরই মধ্যে ঠাণ্ডা পড়তে শুরু করেছে, ঘরের ভেতর উষ্ণ আরামদায়ক পরিবেশ। বারের দিকে এগিয়ে গেল পল আর লরেডো। ড্রিঙ্কের ফরমাশ দিয়ে দাম চুকিয়ে দিল কেড্রিক। মদের গ্লাস হাতে নিয়ে অস্বস্তির সঙ্গে নাড়াচাড়া করতে লাগল লরেডো শ্যাড। অবশেষে কেড্রিকের দিকে তাকাল সে।
