ডাম্বলডোরের দৃষ্টি হঠাৎ করে উইসলি যমজ ভাইদের ওপর পড়ল।
তিনি বললেন–আমাদের কেয়ারটেকার মি. ফিলচ একটা সংবাদ তোমাকে জানাবার জন্য অনুরোধ জানিয়েছেন। দু ক্লাসের মাঝখানের বিরতিতে করিডোরে জাদুবিদ্যার কোন অনুশীলন চলবে না। টার্মের দ্বিতীয় সপ্তাহে কিভিচ খেলার অনুশীলন হবে। যারা এ খেলায় অংশগ্রহণ করতে চায় তারা তাদের হাউজের মাধ্যমে মাদাম হুচের সাথে যোগাযোগ করবে।
তোমাদেরকে আরেকটি কথাও আমাকে জানাতে হচ্ছে, চতুর্থতলার ডানদিকের করিডোরটি তোমাদের জন্য নিষিদ্ধ এলাকা। যারা এই নিষেধাজ্ঞা অমান্য করবে তাদের পরিণাম হবে যন্ত্রণাদায়ক মৃত্যু।
হ্যারি হাসল, কিন্তু তার সাথে আর কেউ হাসল না।
তিনি আসলে সত্যি কথা বলছেন না, ভয় দেখাচ্ছেন। হ্যারি পার্সিকে বলল।
তিনি সত্যি কথাই বলে থাকেন। পার্সি জবাব দিল–তিনি যখনই কোন কিছু আমাদের নিষেধ করেন তার কারণও জানিয়ে দেন। সবাই জানে বনে অনেক হিংস্র প্রাণী আছে। আমি মনে করি তিনি এ তথ্যটি প্রিফেক্টদের জানাতে পারতেন।
ডাম্বলডোর এবার তার জাদুদণ্ডে মোচড় দিলেন। একটি সোনালী রিন উড়ে গেল। টেবিলের ওপর সাপের মত উড়তে উড়তে সে কতগুলো শব্দ লিখে ফেলল–
হোগার্টস হোগার্টস হোগি ওয়ার্টি হোগার্টস
দয়া করে আমাদের কিছু শেখাও
আমরা বুড়ো বা টেকো মাথা হই
কিংবা ইস্পাত দৃঢ় হাঁটুর তরুণ
আমাদের মাথায় আছে কিছু কৌতূহলী জিনিস
এখন সেগুলো খালি, বাতাসভরা
কিছু মরা মাছি, কিছু পেজা তুলা
মূল্যবান কিছু আমাদের শেখাও
মনে করিয়ে দাও, যা আমরা ভুলে গেছি
যা উত্তম তাই তুমি করো
বাকিটা আমাদের জন্যে রেখে দাও
এবং মাথার ঘিলু পচে না যাওয়া তক
আমরা শিখতে থাকবো।
সবাই বার বার এ গান গাইতে লাগল। শেষ দিকটা যেন শব যাত্রার সঙ্গীতের মত। ডাম্বলডোর জাদুদণ্ড ঘোরালেন। আবার হর্ষধ্বনি।
তিনি বললেন-এখন শোবার সময়। তোমরা ঘুমোতে যাও।
সবাই গ্রেট হলের সিঁড়ি বেয়ে নেমে এল। হ্যারি খুব ক্লান্ত। সে খুব বেশি খেয়েছে। তার খুব ঘুম পাচ্ছে। তাই চারপাশের কথা তার কানে আসছে না। সিঁড়ির দুপাশে বিচিত্র দৃশ্য চোখে পড়ছে না। এর পর কিছু বেলুন উড়ল। কিছু হাঁটার ছড়ি আকাশে উড়ল। ব্যারনের কথা শোনা গেল। করিডোরের শেষে একটা মোটা মহিলার ছবি দেখা গেল। গোলাপী রঙের পোশাক। ছবিটা বলল–তোমার পাসওয়ার্ড জানাও।
পার্সি বলল–ক্যাপুট ড্রাকোনিস।
সঙ্গে সঙ্গে ছবিটা এগিয়ে গেলে দেখা গেল দেয়ালে একটা গোল ছিদ্র।
ওরা ছিদ্র দিয়ে ঢুকে পড়ল। আর এটাই নাকি কমনরুম। বাঃ বেশ আরামের। বেশ কয়েকটা আরাম চেয়ার রয়েছে।
পার্সি মেয়েদের ডর্মিটরি যাবার দরোজাটা দেখিয়ে দিল। ছেলেদের দরোজা পৃথক। একটা ঘোরানো সিঁড়ি দিয়ে তারা ওপরে উঠল। সুন্দর শোবার ঘর। লাল ভেলভেটের পর্দা। কয়েকটা পোস্টার ঝুলছে। শোবার পাজামা পরে তারা বিছানায় গড়িয়ে পড়ল।
হ্যারি একটু বেশি খেয়ে ফেলেছে। তাই সে অদ্ভুত স্বপ্ন দেখতে লাগল। স্বপ্নে দেখল, সে অধ্যাপক কুইরেলের পাগড়ি পরেছে এবং পাগড়ি তার সাথে কথা বলছে, তাকে বলছে সে যেন এক্ষুণি স্লিারিনে বদলি হয়, কারণ এটাই তার নিয়তি। হ্যারি পাগড়িকে বলল, সে শ্লিদারিনে বদলি হতে চায় না। পাগড়িটা ক্রমশই ভারি হয়ে উঠছে, সে ওটা খুলে ফেলতে চাইলো, কিন্তু সেটা খুব শক্ত হয়ে আঁকড়ে আছে। ব্যথাও দিচ্ছে তাকে। তার সাথে কথা বলছে। ম্যালফয় হাসছে। হঠাৎ এক লম্বা নাকওয়ালা শিক্ষক–ক্ষেইপ হয়ে গেল। স্নেইপ হাসছে কখনও উঁচু কখনও নিচু স্বরে তীব্র সবুজ আলোর ঝলক! হ্যারি জেগে উঠলো, সে ঘামছে ও কাঁপছে।
একটু পর হ্যারি অন্যদিকে কাত হয়ে আবার ঘুমিয়ে পড়ল। ঘুম থেকে ওঠার পর হ্যারি আগের স্বপ্নের সবকিছুই ভুলে গেল।
০৮. ওষুধের ওস্তাদ
ওইদিকে তাকাও।
কোনদিকে?
লম্বা লাল চুল ছেলেটার পরের ছেলেটা।
চশমা পরা?
ওর মুখটা দেখতে পাচ্ছ কি?
ওর কপালের দাগটা দেখেছ কি?
হ্যারি পরের দিন ডরমিটরি থেকে বের হলেই চারদিকে এ রকম ফিসফিস, গুঞ্জন। ক্লাসরুমের বাইরেও লোকজন পায়ের আঙুলের ওপর ভর দিয়ে উঁচু হয়ে ওকে দেখে বা হ্যারি যখন করিডোরে হেঁটে যায় তখন লোকেরা ওকে ভাল করে দেখার জন্য দ্বিতীয়বার ফিরে আসে। এসব হ্যারির ভালো লাগে না। হ্যারি লেখাপড়ায় মনোযোগ দিতে চায়।
হোগার্টসে একশ চল্লিশটা সিঁড়ি আছে–কোনটা চওড়া, কোনটা খাড়া, কোনটা সরু, কোনটা অস্থায়ী কাঠের। কিছু সিঁড়ি শুক্রবার দিন অন্য স্থানে নিয়ে যায়। কিছু সিঁড়ি আর মাঝপথে মাঝামাঝি গিয়ে শেষ হয়েছে। মনে রাখা প্রয়োজন এগুলো পার হতে হবে লাফ দিয়ে। কিছু দরোজা আছে নম্রভাবে কথা না বললে বা যথাস্থানে হালকাভাবে টোকা না দিলে খুলবে না। কিছু স্থান দরোজার মত মনে হয়, কিন্তু আসলে দরোজা নয়–শক্ত দেয়াল। এখানে কোন কিছু মনে রাখা কঠিন, কোন কিছু স্থির নয়, সব সময় স্থানের পরিবর্তন ঘটছে। মানুষের প্রতিকৃতিগুলোরও পরিবর্তন ঘটছে, এক ফ্রেমের ছবি থেকে অন্য ছবির ফ্রেমে চলে যাচ্ছে। হ্যারির ধারণা তা হলে নিশ্চয়ই অস্ত্রাগারে রাখা কোটগুলোও নিশ্চয়ই হেঁটে বেড়ায়।
ভূতেরাও কোন রকম সাহায্য করে না। কেউ কোন দরোজা খুলে কোথাও যাবে, হঠাৎ করে অপরদিক থেকে ভূতেরা সেই দরোজার মাঝখানে দাঁড়িয়ে চমকে দেয়। এদের মধ্যে মুণ্ডুহীন নিক ব্যতিক্রম, খুশি মনে পথ দেখিয়ে দেয়। কিন্তু পিভস তার চিরাচরিত অভ্যাস মত আড়ালে থেকে কিছু ফেলে তার উপস্থিতি জাহির করে, কেউ যদি ক্লাসে যেতে দেরি করে ফেলে তাকে দুটো তালাবদ্ধ দরজা ও গোলমেলে সিঁড়ি পার হতে যেটুকু সময় লাগে তার চেয়ে বেশি দেরি করিয়ে দেবে ক্লাসে যেতে। সে কারো মাথায় ওয়েস্ট পেপার বাস্কেট ফেলবে, পায়ের তলা থেকে কম্বল টেনে নেবে, চক ছুঁড়ে মারবে, চমকে দেয়ার জন্য দেখা না দিয়ে কারো পেছনে এসে দাঁড়াবে, পেছন থেকে নাক চেপে ধরে বলবে, কেমন লাগছে এখন।
