তারা দোকানের ভেতর প্রবেশ করার সাথে সাথেই দোকানের বেশ ভেতর থেকে টুং করে ঘণ্টা বাজল। কেউ আসলেই এটা বাজে। ভেতরটা খুবই ছোট, বসার জন্য একটা মাত্র চেয়ার। সেখানে হ্যাগ্রিড বসলেন। সেখানকার নিস্তব্ধতা হ্যারির কাছে মনে হলো যেন কোন পাঠাগারে তারা প্রবেশ করছে। ছোট ছোট বাক্সে সিলিং পর্যন্ত বই। ধুলো জমেছে। পিন পতন নিস্তব্ধতা। গুড আফটারনুন শব্দ কানে ভেসে আসায় হ্যারি চমকে উঠল। হ্যাগ্রিডও চমকে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। এক বৃদ্ধ লোক তাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। তার চোখ দুটো চাঁদের আলোর মত জ্বল জ্বল করছে।
***
আহ্ হা, দোকানে বৃদ্ধ লোকটি হ্যারিকে বললেন–হ্যাঁ, হ্যারি আমি ভাবছিলাম–তোমার সাথে শিগগিরই আমার দেখা হবে। তোমার চোখ ঠিক তোমার মায়ের মতো। মনে হচ্ছে যেন গতকালই তিনি এখানে এসেছিলেন। তার জাদুদণ্ড কিনছেন। জাদুকাঠির দৈর্ঘ্য ছিল সোয়া দশ ইঞ্চি।
তোমার বাবা মেহগনি কাঠের জাদুকাঠি পছন্দ করতেন। তার কাঠির দৈর্ঘ্য ছিল ১১ ইঞ্চি।
মি. অলিভাল্ডার হ্যারির কপালের বিদ্যুৎ চমকানোর সাদৃশ্য কাটা দাগে তার লম্বা ও সাদা আঙ্গুল স্পর্শ করলেন। তারপর বললেন, আমি দুঃখিত, যে জাদুর কাঠি এই ঘটনা ঘটিয়েছে তা আমিই বিক্রি করেছি। সাড়ে তের ইঞ্চি লম্বা খুবই শক্তিশালী এই কাঠি ভুল মানুষের হাতে পড়েছিল। আমি যদি জানতাম এই জাদুকাঠিটা পৃথিবীতে কি করতে যাচ্ছে…।
তিনি সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য হ্যারির মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। তার চোখ পড়লো হ্যাগ্রিডের দিকে, রুবিয়াস। রুবিয়াস হ্যাগ্রিড! কি ভাল লাগছে তোমাকে দেখে… ওফ, ষোল ইঞ্চি, একটু বাঁকা, তাই না?
জী স্যার, ওটা তা-ই ছিল, হ্যাগ্রিড বললেন।
ওটা খুবই ভাল জাদুকাঠি ছিল। তুমি যখন বহিষ্কৃত হলে তখন ওরা ওটাকে দুটুকরো করে দিয়েছিল, ঠিক তাই না। মি. অলিভান্ডার পেছন ফিরে বললেন।
হ্যাঁ, তারা দু টুকরো করেছিল। পদচারণা করতে করতে হ্যাগ্রিড বললেন খণ্ডগুলো অবশ্য আমার কাছেই আছে। কথাটা বলে তার মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
কিন্তু তুমি তো ওগুলো এখন ব্যবহার করো না?
মি. অলিভান্ডার বেশ জোর দিয়ে বললেন।
না স্যার—হ্যাগ্রিড দ্রুত উত্তর দিলেন।
হ্যারি লক্ষ্য করলো হ্যাগ্রিড যখন কথা বলছেন, তখন তিনি খুব শক্ত করে তার গোলাপী ছাতা আঁকড়ে ধরেছিলেন।
তারপর মি. অলিভান্ডার হ্যারির দিকে ফিরে বললেন। এখন কি ধরনের জাদুর কাঠি চাই তোমার? তিনি মাপ নেওয়ার জন্য তার পকেট থেকে রূপোর দাগ দেওয়া লম্বা মাপের ফিতা বের করলেন। তিনি হ্যারিকে মাপলেন, কাঁধ থেকে আঙ্গুল, তারপর কব্জি থেকে কনুই, কাঁধ থেকে ভূমি, কনুই থেকে বগল ও মাথা চক্রাকারে। তিনি যখন মাপ নিচ্ছিলেন তখন বলে চলছিলেন, প্রত্যেকটি অলিভান্ডার জাদুর কাঠিতে শক্তিশালী জাদুর পদার্থ থাকে মি. পটার। আমরা ইউনিকর্নের চুল, ফিনিক্সের লেজ ও ড্রাগনের হার্টস্ট্রিং ব্যবহার করি। তবে সব জাদুকাঠি এক হয় না। যেমন সব ইউনিকর্ন, ড্রাগন বা ফিনিক্স সমান হয় না। এটা নিশ্চিত যে তুমি এর চেয়ে ভাল জাদুকাঠি আর কোথাও পাবে না। এক সময় হঠাৎ করে হ্যারি দেখলো মাপার ফিতাটি নিজে নিজেই তার মাপ নিচ্ছে। মি. অলিভান্ডার তখন বিভিন্ন তাক খুঁজে বাক্স নামাচ্ছিলেন। এটাই তোমার জন্য ভাল হবে। মি. অলিভান্ডার বললেন, পরীক্ষা করে দেখ। বীচ কাঠ এবং ড্রাগন হার্টস্ট্রিং-এর তৈরি। নয় ইঞ্চি লম্বা। সুন্দর এবং বাঁকানো যায়। এটা নিয়ে ঢেউয়ের মত নাড়াও।
হ্যারি কাঠিটি নিয়ে যেই একটু ঢেউ খেলালো এবং কোন কিছু অনুভব করার আগেই মি, অলিভান্ডার দ্রুত তার হাত থেকে কাঠিটি কেড়ে নিলেন। না-এটা দেখ! এবনি গাছের কালো কাঠের এবং ইউনিকর্ন চুলের, সাড়ে আট ইঞ্চি। দেখ, চেষ্টা কর।
হ্যারি চেষ্টা করে। একের পর এক কাঠি দিয়েই যাচ্ছেন মি. অলিভান্ডার। হ্যারি বুঝতেই পারে না, ঠিক কোনটার জন্য মি. অলিভাণ্ডার অপেক্ষা করছেন। উঁচু টুলটিতে একের পর এক জাদুকাঠি জমে এক বড় স্তূপে পরিণত হলো। মি. অলিভান্ডারের যেন কোন কষ্টই হচ্ছে না, আনন্দেই একের পর এক জাদুরকাঠি তাক থেকে নামাচ্ছেন আর হ্যারিকে দিয়ে চেষ্টা করছেন।
আমরা ঠিক কাঠিটাই পেয়ে যাব।
তিনি স্বগতোক্তি করলেন। হ্যাঁ বোধহয় এটাই–বেরি গাছের কাঠ মাঝখানে ফাঁপা এবং ফনিক্স পাখির পাখা, এগার ইঞ্চি, সুন্দর ও বাঁকানো। যায়।
হ্যারি জাদুর কাঠিটা হাতে নিল। সে তার আঙ্গুলে হঠাৎ করে তাপ অনুভব করলো। কাঠিটা সে তার মাথারও উঁচুতে উঠালো এবং শো শো করে নিচে নামালো, কাঠিটির প্রান্ত থেকে তারা বাতির মতো লাল ও সোনালী আলো বিভূতির মতো বিচ্ছুরিত হলো, ঘরের দেয়াল আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে উঠলো। হ্যাগ্রিড তালি দিয়ে উঠলেন। মি. অলিভান্ডার চিৎকার করে উঠলেন, ওহ, ব্রাভো, খুব ভালো, ঠিক… ঠিক… কি আশ্চর্য… তিনি হ্যারির জাদুর কাঠিটি বাক্সে ভরলেন, এবং বাদামী কাগজে মোড়াতে মোড়াতে বিড় বিড় করে বললেন, কি অদ্ভুত… কি অদ্ভুত…
আপনি আশ্চর্য হলেন কেন? হ্যারি জিজ্ঞেস করলো। মি. অলিভান্ডার হ্যারির দিকে বিষণ্ণভাবে তাকালেন আমার স্মরণ আছে, প্রত্যেকটি জাদুকাঠি যা এ পর্যন্ত আমি বিক্রি করেছি, মি. পটার। প্রত্যেকটি জাদুকাঠিই। তোমার জাদুকাঠিতে যে ফিনিক্স পাখিটার লেজের পালক দেওয়া হয়েছে সেই পাখিরই আর একটা পালক–শুধু আর একটাই মাত্র। আশ্চর্যজনক, তোমার ভাগ্য নির্ধারিত ছিল এই জাদুদন্ডটাতেই এই জোড়ার অপরটা তোমার কপালের এই দাগের কারণ।
