একি? আমি এগোচ্ছি না কেন? আমি পড়ে গেছি, আমি মরে গেছি! প্রশ্ন করে রস্তভ নিজেই সঙ্গে সঙ্গে তার জবাব দিল। মাঠের মধ্যে সে একা। চলন্ত আর খড়ের নাড়া। তার বগলের নিচে গরম রক্তের স্পর্শ।
, আমি আহত হয়েছি, আর আমার ঘোড়াটা মারা গেছে। সামনের পায়ে ভয় দিয়ে রুক উঠে দাঁড়াতে চেষ্ট করল, কিন্তু সওয়ারের পায়ের উপর চেপে পড়ে গেল। তার মাথা থেকে রক্ত ঝরছে, অনেক চেষ্টা করল, কিন্তু উঠতে পারল না। রস্তভও উঠতে চেষ্টা করল, কিন্তু পড়ে গেল, তার তরবারির চামড়ার কোষ ঘোড়ার জিনের সঙ্গে জড়িয়ে গিয়েছিল। আমাদের সৈন্যরা কোথায় আছে, কোথায়ই বা আছে ফরাসিরা, সে কিছুই জানে না। কাছাকাছি কেউ কোথাও নেই।
পাটা ছাড়িয়ে নিয়ে সে উঠে দাঁড়াল। কোথায় কোনদিকে সেই রেখাঁটি যা দুটি বাহিনীকে পরিষ্কার দুই ভাগে ভাগ করে দিয়েছে? সে প্রশ্ন করল, কিন্তু জবাব দিতে পারল না। আমার কি খারাপ কিছু হয়েছে? উঠে দাঁড়িয়ে সে ভাবল, আর সেই মুহূর্তে তার মনে হল, তার অবশ বাঁ হাত থেকে একটা অপ্রয়োজনীয় কিছু ঝুলছে। মনে হল, কব্জিটা বুঝি তার নিজের নয়। হাতটা ভালো করে দেখল, কিন্তু তাতে রক্তের দাগ দেখতে পেল না। কিন্তু লোককে তার দিকে দৌড়ে আসতে দেখে সে সানন্দে ভাবল, আঃ, ওই তো লোকজন আসছে। ওরা আমাকে সাহায্য করবে। প্রথমে এগিয়ে গেল শাকো টুপি ও নীল জোব্বা পরা একটি লোক, মোটাসোটা শরীর, রোদে পোড়া মুখ, বাঁকা মুখ, বাঁকা নাক। পরে আরো দুজন এল, তাদের পিছনে আরো অনেকে দৌড়ে এল। তাদের একজন অদ্ভুত কিছু বলল, ভাষাটা অবশ্যই রুশ নয়। পিছনদিকার শাকো পরিহিত আরো অনেকের মধ্যে একজন রুশ হুজারও রয়েছে। দুই হাত ধরে তাকে নিয়ে আসা হচ্ছে, তার ঘোড়াটাকেও পিছনে হাঁটিয়ে নিয়ে আসা হচ্ছে।
ও নিশ্চয়ই আমাদের কেউ, বন্দি হয়েছে। হ্যাঁ তাহলে এরা কি আমাকেও বন্দি করবে? এরা কারা? রস্তভ ভাবতে লাগল, নিজের চোখ সে বিশ্বাস করতে পারছে না। ওরা কি ফরাসি? সে আর একবার এগিয়ে-আসা ফরাসিদের দিকে তাকাল। ওরা কারা? ওরা ছুটে আসছে কেন? ওরা কি আমার দিকে আসছে। কিন্তু কেন? আমাকে মেরে ফেলতে? অথচ আমাকে তো সকলেই কত ভালোবাসে? মায়ের ভালোবাসা, পরিবারের লোকজনদের ভালোবাসা, বন্ধুদের ভালোবাসার কথা তার মনে পড়ল, তার মনে হল, শত্রুপক্ষ তাকে মেরে ফেলতে চাইবে এটা একেবারেই অসম্ভব। কিন্তু হয়তো তাই তারা করবে! পরিস্থিতি বুঝতে না পেরে দশ সেকেন্ডেরও বেশি সময় সে সেখানেই দাঁড়িয়ে রইল। বাঁকা-নাক ফরাসিটি ততক্ষণে এত কাছে এসে পড়েছে যে তার মুখের ভার পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। লোকটির উত্তেজিত বিরূপ মুখ, পাশে ঝোলানো বেয়নেট, তার রুদ্ধশ্বাস গতি-এসব দেখে রস্তভ ভয় পেল। সে পিস্তলটা চেপে ধরল, কিন্তু গুলি না করে সেটাকে ফরাসি লোকটির দিকে ছুঁড়ে দিয়ে সে যথাসাধ্য দ্রুতগতিতে জঙ্গলের দিকে ছুটে গেল। এনস সেতু ধরে দৌড়বার সময় তার মনে যে সন্দেহ ও সংঘাত ছিল এখন সেসবের কিছুই নেই, এখন সে ছুটছে শিকারি কুকুরের তাড়া খাওয়া খরগোসের মতো। শুধুমাত্র নিজের সুখী তরুণ জীবনকে হারাবার আতঙ্কই তার সমস্ত সত্তাকে আচ্ছন্ন করে ফেলেছে। সে প্রাণপণে মাঠ ভেঙে ছুটছে আর মাঝে মাঝে পিছন ফিরে তাকাচ্ছে। তার শরীরের ভিতর দিয়ে ত্রাসের একটা শিহরণ বয়ে গেল, না, পিছনে না তাকানোই ভালো। তবু জঙ্গলের কাছে পৌঁছে সে আর একবার পিছন ফিরে তাকাল। ফরাসিরা পিছিয়ে পড়েছে, সকলের আগের লোকটি দৌড়ানোর বদলে এবার হাঁটতে শুরু করেছে, মুখ ফিরিয়ে চিৎকার করে আরো পিছনের জনৈক সহকর্মীকে সে যেন কি বলল। রস্তভ থামল। ভাবল, না তো, কিছু ভুল হয়েছে। ওরা আমাকে খুন করতে চায় নি। কিন্তু সেইসঙ্গে তার এটাও মনে হল যে তার বাঁ হাতটা এত ভারি বোধ হচ্ছে যেন একটা পাঁচ স্টোন ওজনের বোঝা তাতে বেঁধে দেওয়া হয়েছে। সে আর দৌড়াতে পারছে না। ফরাসিরাও থেমে গিয়ে তাকে লক্ষ্য করে বন্দুক তুলল। রশুভ চোখ বুজে উপুড় হল। প্রথমে একটা বুলেট, তারপর আর একটা হিস করে তার পাশ দিয়ে চলে গেল। অবশিষ্ট শক্তিতে ভর করে ডান হাত দিয়ে বাঁ হাতটাকে চেপে ধরে সে জঙ্গলে পৌঁছে গেল। তার ঠিক পিছনেই আছে কিছু রুশ বন্দুকধারী।
*
অধ্যায়-২০
যেসব পদাতিক সেনাদল জঙ্গলের বহিঃপ্রান্তে অতর্কিতে আক্রান্ত হয়েছিল তারা ছুটে জঙ্গল থেকে বেরিয়ে এসেছে, বিভিন্ন কোম্পানির সৈন্য একসঙ্গে মিশে গিয়ে বিশৃঙ্খলভাবে পশ্চাদপসরণ করেছে। একটি সৈন্য আতংকে চেঁচিয়ে উঠেছিল, আমরা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছি! রণক্ষেত্রে এ আতংক বড় সাংঘাতিক, অচিরেই তা ছড়িয়ে পড়ল সব সৈন্যদের মনে।
আমাদের ঘিরে ফেলেছে। আমরা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছি! আমাদের সর্বনাশ উপস্থিত! পলায়নপর সৈন্যরা চিৎকার করতে লাগল।
পিছন থেকে গুলির শব্দ ও চিৎকার কানে আসা মাত্রই সেনাপতি বুঝতে পারল তার রেজিমেন্টে একটা ভয়ংকর কিছু ঘটেছে, সঙ্গে সঙ্গে তার মনে হল, অনেক বছর ধরে অফিসার হিসেবে তার কার্যকলাপ একটি দৃষ্টান্তস্থল, তার কোনো কাজে কখনো কোনো ত্রুটি হয় নি, অথচ এবার হয়তো কর্তব্যে অবহেলা বা অযোগ্যতার দরুণ হেড-কোয়ার্টারে তাকেই দোষী করা হবে। এই চিন্তা তাকে এতই বিচলিত করে তুলল যে অশ্বারোহী বাহিনীর অবাধ্য কর্নেলের কথা ভুলে গিয়ে, সেনাপতি হিসেবে স্বীয় মর্যাদার কথা ভুলে গিয়ে, এমনকি সমূহ বিপদ ও আত্মরক্ষার কথা পর্যন্ত ভুলে গিয়ে সে তার রেজিমেন্টের উদ্দেশ্যে ঘোড়া ছুটিয়ে দিল। চারদিকে মুষলধারে গুলিবর্ষণ চলছে, কিন্তু সৌভাগ্যক্রমে কোনো গুলিই তার গায়ে লাগে নি। তার একমাত্র বাসনা প্রকৃত অবস্থা জেনে নিয়ে নিজের কোনো ভুল হয়ে থাকলে তাকে সংশোধন করা বা তার প্রতিকার করা, যাতে বাইশ বছরের চাকরি জীবনে যে কখনো নিন্দিত হয় নি সেই অফিসার হয়েও তাকে কোনোরকম দোষের ভাগী না হতে হয়।
