ফরাসিদের ভিতর দিয়ে নিরাপদে ঘোড়া ছুটিয়ে সে জঙ্গলের পশ্চাদবর্তী একটা মাঠে পৌঁছে দেখল, সব হুকুমকে উপেক্ষা করে সৈন্যরা ছুটছে, উপত্যকার দিকে নেমে যাচ্ছে। সে নৈতিক সংকল্প-শিথিলতা একটা যুদ্ধের ভাগ্য নির্ধারণ করে থাকে সেই মুহূর্তটা সমাসন্ন। এই বিশৃঙ্খল সৈন্যরা কি তাদের অধিনায়কের কথা শুনবে, না কি তাকে উপেক্ষা করেই পালাতে থাকবে তার অবিরাম চিৎকার, তার কুদ্ধ, বিকৃত, রক্তাভ মুখছবি, হাতের কোষমুক্ত উদ্যত তরবাদি–সবকিছু সত্ত্বেও সৈনিকরা নিজেদের মধ্যে কথা বলতে বলতে শূন্যে গুলি ছুঁড়ে সব হুকুম অমান্য করে পালাতেই থাকল। যুদ্ধের ভাগ্য-নির্ধারক নৈতিক সংকল্প-শিথিলতা পরিণত হয়েছে সর্বগ্রাসী আতংকে।
অবিরাম চিৎকার ও বারুদের ধোয়ার ফলে কাশতে কাশতে সেনাপতি হতাশ হয়ে থেমে গেল। সবই বুঝি শেষ হয়ে গেল। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে আক্রমণকারী ফরাসিরা হঠাৎ যেন বিনা কারণেই পশ্চাদপসরণ করে জঙ্গলপ্রান্ত থেকে অদৃশ্য হয়ে গেল, আর জঙ্গলের ভিতর থেকে বেরিয়ে এল একদল বন্দুকধারী। এরা তিমোখিনের অধীনস্থ সেনাদল, একমাত্র এরাই জঙ্গলের মধ্যে সুশৃঙ্খল অবস্থায় ছিল এবং একটা নালার মধ্যে আত্মগোপন করে থেকে অপ্রত্যাশিতভাবে ফরাসিদের উপর আক্রমণ হেনেছে। একখানি মাত্র তরবারি হাতে নিয়ে তিমোখিন এমন বেপয়োরা চিৎকার ও উন্মত্ত সংকল্পের সঙ্গে শত্রুপক্ষের উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে যে অতর্কিতে আক্রান্ত হয়ে ফরাসিরা বন্দুক ফেলেই পালিয়েছে। তিমোখিনের পাশে ছুটে গিয়ে দলখভ খুব কাছে থেকে একজন ফরাসিকে হত্যা করল এবং আত্মসমর্পণকারী ফরাসি অফিসারের কলার চেপে ধরল। আমাদের পলায়নপর সৈন্যরা ফিরে এল, ব্যাটেলিয়নগুলিকে নতুন করে সাজানো হল, আর যে ফরাসিরা আমাদের বা দিককার বৃহটাকে প্রায় ভেদ করে ফেলেছে তাদের তখনকার মতো পর্যদস্ত করা হল। আমাদের সংরক্ষিত সেনাদলও এসে যোগ দিল, যুদ্ধ শেষ হল। রেজিমেন্ট-কমান্ডার ও মেজর একনমভের দিকে মুখ ফেরাল।
দলখভ কিন্তু চলে গেল না, মাথায় বাঁধা রুমালখানার গিট খুলে নামিয়ে নিয়ে চুলের ভিতর জমাট-বাঁধা রক্তের তাহ দেখাল।
বেয়নেটের আঘাত। আমি যুদ্ধক্ষেত্রে ছিলাম। মনে রাখবেন ইয়োর এক্সেলেন্সি!
তুশিনের গোলন্দাজ বাহিনীর কথা সকলেই ভুলে গিয়েছিল, যুদ্ধের একেবারে শেষকালে তখনো ব্যূহের মধ্যভাগে কামান-গর্জনের শব্দ শুনে প্রিন্স ব্যাগ্রেশন প্রথমে স্টাফ-অফিসার ও পরে প্রিন্স আন্দুকে পাঠিয়েছিল তার সৈন্যগণকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব পশ্চাদপসরণের হুকুম জানাতে। তুশিনের কামানগুলোর রক্ষক সৈনিকদের যখন কারো হুকুমে ব্যূহের মধ্যভাগে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হল, তখনো কামানগুলো থেকে সমানে গোলা ছোঁড়া চলতে লাগল। তাদের বন্দি করা দূরে থাক, ফরাসিরা ভাবতেই পারে নি যে সম্পূর্ণ অরক্ষিত চারটি কামান থেকে গোলাবর্ষণের দুঃসাহস কারো হতে পারে। উপরন্তু তাদের গোলাবর্ষণের রকম দেখে ফরাসিরা ধরে নিয়েছিল যে এখানে-ব্যহের মধ্যভাগে-মূল রুশ সেনাপতির সমাবেশ ঘটানো হয়েছে। দুবার তারা এই অংশটার উপর আঘাত হানবার চেষ্টা করেছে, কিন্তু পাহাড়ের উপরকার চারটিমাত্র কামানোর ছররা গোলার আঘাতে প্রতিবারই প্রতিহত হয়ে ফিরে গেছে।
প্রিন্স ব্যাগ্রেশন তাকে ছেড়ে যাবার পরেই তুশিন শোন গ্রেবার্নে আগুন ধরিয়ে দিয়েছিল।
দেখ, ওরা ছুটে পালাচ্ছে। গ্রামটা জ্বলছে! ওই দেখ ধোয়া! চমৎকার! সাবাস! ওই দেখ ধোয়া, ধোঁয়া! মহা উৎসাহে গোলন্দাজরা চিৎকার করে উঠেছিল।
হুকুমের জন্য অপেক্ষা না করেই সবগুলো কামান থেকে সেই জ্বলন্ত গ্রাম লক্ষ্য করে গোলা ছোঁড়া অপেক্ষা না করেই সবগুলো কামান থেকে সেই জ্বলন্ত গ্রাম লক্ষ্য করে গোলা ছোঁড়া চলতে লাগল। প্রতিটি গোলার সঙ্গে সঙ্গেই একজন সৈনিক অপর জনকে লক্ষ্য করে বলে উঠল : সুন্দর! খুব ভালো!…তাকিয়ে দেখ।…চমৎকার! বাতাসে ভর করে আগুন ক্রমেই ছড়িয়ে পড়তে লাগল। যে ফরাসি সেনাদলটি গ্রাম ছাড়িয়ে এগিয়ে এসেছিল তারা ফিরে গেল, কিন্তু হয় তো এই পরাজয়ের প্রতিশোধ নেবার জন্যই শত্রুপক্ষ দশটা কামানকে গ্রামের ডান দিকে বসিয়ে তুশিনের কামান লক্ষ্য করে গোলা ছুঁড়তে লাগল।
দুর্বল পায়ে অদ্ভুত ভঙ্গিতে ছুটে ছুটে ছোট্ট তুশিন বারবার আর্দালিকে বলছে, আমার পাইপটায় তামাক ভরে দাও, তারপর পাইপ থেকে আগুনের ফুলকি ছড়িয়ে ছোট হাতটা চোখের উপর তুলে ফরাসিদের দিকে দৃষ্টি রেখে সে সামনে ছুটে গেল। কামানের চাকা চেপে ধরে নিজেই ইস্ক্রপ ঘুরিয়ে বলতে লাগল, পেটাও হে। বাছারা, পেটাও!
এমন সময় তার মাথার উপর থেকে একটি অপরিচিত কণ্ঠস্বর হাঁক দিল : ক্যাপ্টেন তুশিন! ক্যাপ্টেন!
তুশিন ঘুরে দাঁড়াল। এ সেই স্টাফ-অফিসারের কণ্ঠস্বর যে তাকে গ্রন্থের ঘর থেকে বের করে দিয়েছিল। ধরা গলায় সে হাঁক দিয়ে বলল :
আপনি কি পাগল হয়ে গেছেন? আপনাকে দুবার পিছিয়ে যেতে বলা হয়েছে, আর আপনি…
ঊর্ধ্বতন অফিসাকে দেখতে পেয়ে তুশিন সভয়ে ভাবল : এরা আমাকে নিয়ে পড়ল কেন?
দুটো আঙুল টুপি পর্যন্ত তুলে সে তো-তো করে বলল, আমি…জানতাম না…আমি…
কিন্তু স্টাফ-অফিসার তার বক্তব্য শেষ করতে পারল না, একটা গোলা খুব কাছ দিয়ে উড়ে আসায় সে ঘোড়ার পিঠেই মাথা নামিয়ে গোলাটাকে এড়িয়ে গেল। একটু থেমে আবার কিছু বলবার চেষ্টা করতেই আর একটা গোলা এসে তাকে থামিয়ে দিল। ঘোড়ার মুখ ঘুরিয়ে সে কদমে ছুটল।
