অধিনায়ক বলল, আর একবার বলছি কর্নেল, অর্ধেক সৈন্যকে জঙ্গলের মধ্যে ফেলে রেখে আমি এখান থেকে সরে যেতে পারি না। আপনাকে মিনতি করছি, যথাযথভাবে সেনাসমাবেশ করে আক্রমণের জন্য প্রস্তুত হোন।
অশ্বারোহী বাহিনীর জার্মান কর্নেল বিরক্ত হয়ে বলল, আমিও আপনাকে অনুরোধ করছি, যেটা আটনার কাজ নয় তা নিয়ে মাথা ঘামাবেন না। আপনি যদি অশ্বারোহী বাহিনীতে থাকতেন…
আমি অশ্বারোহী বাহিনীর লোক নই, কিন্তু আমি একজন রুশ অধিনায়ক, আর আপনি যদি এ বিষয়ে
সচেতন না হয়ে থাকে বাহিনীর লোক নই, কিন্তু যদি অশ্বারোহী বাহিৰূপনাকে অনুরোধ করা প্রস্তুত হোন।
ঘোড়ার পিঠে হাত রেখে মুখটা লাল করে কর্নেল হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠল, আমি খুব সচেতন ইয়োর এক্সেলেন্সি। আপনি কি দয়া করে সামনে এগিয়ে একবার নিজের চোখে দেখে আসবেন যে এ জায়গাটা মোটেই ভালো নয়? আপনার সুখের জন্য আমার লোকগুলোকে তো আমি মেরে ফেলতে পারি না।
আপনি নিজেকে ভুলে যাচ্ছেন কর্নেল। আমি নিজের সুখের কতা ভাবছি না, আর সে কথা কেউ বললে তা সহ্য করব না।
কর্নেলের কথাগুলিকে তার সাহসের প্রতি কটাক্ষ বলে ধরে নিয়ে অধিনায়কটি বুক ফুলিয়ে ঘোড়ায় চড়ে সামনের দিকে এগিয়ে গেল, যেন বুলেটের ভিতর দিয়েই তাদের বিরোধের মীমাংসা হবে। দুজনই সামনের সারিতে পৌঁছে গেল, কয়েকটা বুলেটও তাদের উপর দিয়ে উড়ে গেল। নীরবেই তারা থামল। সেখান থেকে নতুন কিছু দেখবর ছিল না, কারণ ঝোঁপঝাড়ের মধ্যে ও অসমান জমিতে অশ্বারোহীদের পক্ষে কিছু করা অসম্ভব, তাছাড়া ফরাসিরা বাঁ দিক থেকে আমাদের ঘিরে ফেলেছে। সংঘর্ষের জন্য অপেক্ষমাণ দুটো লড়াইয়ে মোরগের মতো অধিনায়ক ও কর্নেল অর্থপূর্ণ কঠোর দৃষ্টিতে পরস্পরের দিকে তাকাল, বৃথাই একে অন্যের চোখে ভীরুতার চিহ্ন খুঁজতে লাগল। দুজনই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হল। কারো কিছু বলার নেই, গুলির পাল্লার ভিতর থেকে আগে সরে যাবার অপবাদ কেউ মাথায় নিতে রাজি নয়, কাজেই একজন অপরজনের সাহসকে পরীক্ষা করার জন্য তারা হয়তো দীর্ঘ সময় সেখানেই অপেক্ষা করে থাকত, কিন্তু ঠিক সেই সময় তাদের পিছনে জঙ্গলের ভিতর থেকে বন্দুকের গুলির আওয়াজ ও একটা হল্লার শব্দ কানে এল। যে সৈন্যরা জঙ্গলের মধ্যে কাঠ যোগাড় করছিল ফরাসিরা তাদের আক্রমণ করেছে। পদাতিক বাহিনীর সঙ্গে পশ্চাদপসরণ করা এখন আর হুজার-বাহিনীর পক্ষে সম্ভব নয়। ফরাসির বাঁ দিক থেকে এসে তাদের পশ্চাদপসরণের পথটা কেটে দিয়েছে। জায়গাটা ঘাঁটি হিসেবে যতই অসুবিধাজনক হোক না কেন, নিজেদের বেরিয়ে যাবার একটা পথ করে নেবার জন্য এখন আক্রমণ করতেই হবে।
রস্তভ যে অশ্বারোহী সেনাদলের সঙ্গে যুক্ত তারা ঘোড়ায় চড়ারও সময় পেল না, তার আগেই তাদের শত্রু সৈন্যের মুখোমুখি হতে হল। এনস সেতুর মতোই আর একবার এই সেনাদল ও শত্রুপক্ষের মধ্যে আর কোনো বাধাই নেই, আর একবার তাদের মাঝখানে আছে শুধু অনিশ্চয়তা ও ভয়ের এক ভয়ংকর সীমারেখা-জীবন ও মৃত্যুর মধ্যবর্তী সীমারেখারই মতো। সেই অদৃশ্য সীমারেখার কথা সকলেই জানে, সে সীমারেখা পার হবে কি হবে না, এবং কেমন করেই বা পার হবে, এই চিন্তাই তাদের বিচলিত করে তুলেছে।– ঘোড়া ছুটিয়ে কর্নেল সকলের সামনে এগিয়ে গেল, সক্রোধে অফিসারদের প্রশ্নের জবাব দিল এবং একগুয়ে লোকের মতো একটা হুকুম জারি করল। মুখে কেউ স্পষ্ট করে কিছু বলল না, কিন্তু আক্রমণের গুজব সেনাদলের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ল। শ্রেণীবদ্ধ হবার হুকুম ঘোষিত হল, আর কোষমুক্ত তরবারি ঝনঝনিয়ে উঠল। তবু কেউ এগিয়ে গেল না। পদাতিক ও হুজার বাম প্রান্তের সকল সৈন্যই বুঝতে পারছে যে অধিনায়ক নিজেই জানে না কি করতে হবে, তার এই অস্থির মানসিকতা সৈনিকদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়েছে।
এতকাল হুজার-বন্দুকের মুখে প্রত্যক্ষ আক্রমণের আনন্দময় অভিজ্ঞতার যেসব কথা সে শুনে এসেছে এই প্রথম সে সুযোগ তার সামনে এসেছে এ কথা মনে করে রস্তভ ভাবল, এরা যদি আর একটু তাড়াতাড়ি করত!
দেনিসভের কণ্ঠস্বর ধ্বনিত হল, এগিয়ে যাও! ঈশ্বর তোমাদের সহায় বাছারা! এগিয়ে যাও কদমে!
সামনে ডান দিকে তাকিয়ে রস্তভ তার হুজারদের প্রথম সারিটা দেখতে পেল, আরো সামনে একটা কালো রেখা চোখে পড়লেও সেটাকে সে পরিষ্কার দেখতে পেল না, তবু সেটাকেই শত্রুপক্ষের সৈন্য বলে ধরে নিল। গুলির শব্দ শোনা যাচ্ছে, তবে বেশ কিছুটা দূর থেকে।
হুকুম হল আরো জোরে! রস্তভ সবেগে আর ঘোড়া রুককে কদমে ছুটিয়ে দিল।
ঘোড়ার তীব্র গতিবেগ রস্তভকে ক্রমেই উল্লসিত করে তুলল। তার সামনে একটা নির্জন গাছ ছিল। যে রেখাটা অত্যন্ত ভয়ংকর মনে হয়েছিল গাছটা ছিল তার ঠিক মাঝখানে–এবার সেই গাছটাকে সে পেরিয়ে গেল, সেখানে ভয়ংকর কিছু তো চোখে পড়লই না, বরং সমস্ত কিছুই ক্রমেই আরো আনন্দময় ও উৎসাহব্যঞ্জক বলে মনে হতে লাগল। তরবারির হাতল চেপে ধরে রস্তভ ভাবল, আঃ, তাকে একখানা মারা যা মারব!
হুররা-আ-আ-আহ! বহু কণ্ঠের গর্জন উঠল। আসুক না কেউ আমার সামনে-এই কথা ভেবে রস্তভ জোর কদমে রুককে ছুটিয়ে অন্য সকলকে ছাড়য়ে চলে গেল। সামনে শত্রুপক্ষকে এখন পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। সহসা বাৰ্চগাছের ঝাটার মতো একটা কিছু সৈন্যদলের মাথার উপর দিয়ে উড়ে এল। রস্তভ আঘাত করার জন্য তরবারি তুলল, কিন্তু সেই মুহূর্তে অশ্বারোহী নিকিতেংকো তীরগতিতে তাকে ছাড়িয়ে চলে গেল, আর রস্তভের মনে হল স্বপ্নের ঘোরে সে যেন অস্বাভাবিক ক্ষিপ্র গতিতে সম্মুখে ছিটকে এগিয়ে গেল, অথচ যেখানে ছিল সেখানেই রয়ে গেল। আর এক পরিচিত হুজার বন্দারচুক পিছন থেকে এসে তার সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে ক্রুদ্ধ দৃষ্টিতে তার দিকে তাকাল। বন্দারচুকের ঘোড়া পাশ কাটিয়ে জোর কদমে ছুটে গেল।
