ব্যাগ্রেশনের দলের একজন বলে উঠল, ওদের মাৰ্চটা চমৎকার।
সেনাদলের মাথার দিকটা ইতিমধ্যেই খাদের মধ্যে নেমে গেছে। খাদের এপাশেই সংঘর্ষ ঘটত…
আমাদের যুদ্ধরত রেজিমেন্টের অবশিষ্ট সৈন্যরা তাড়াতাড়ি নতুন করে নিজেদের সাজিয়ে নিয়ে ডানদিকে এগিয়ে গেল, পিছন থেকে শৃঙ্খলার সঙ্গে এগিয়ে এল ষষ্ঠ পদাতিক বাহিনী। বাঁদিক থেকে ব্যাগ্রেশনের পাশ দিয়ে এগিয়ে গেল সেই কোম্পানি কম্যান্ডারটি যে চালাঘর থেকে ছুটে বেরিয়ে গিয়েছিল। সেনাপতির পাশ দিয়ে যাবার সময় নিজেকে যতদূর সম্ভব করিৎকর্মা লোক হিসেবে প্রমাণিত করাই এই মুহূর্তে তার একমাত্র চিন্তা।
নবাগত ব্যাটেলিয়নের দিকে তাকিয়ে প্রিন্স ব্যাগ্রেশন বলল, বহুত আচ্ছা, ছেলেরা!
সৈনিকদের ভিতর থেকে একজন বলে উঠল, সাধ্যমতো কাজ করতে পেরে আমরাও খুশি ইয়োর এক্স-লেন-সি! একটি বিমর্ষ সৈনিক মার্চ করতে করতেই ব্যাগ্রেশনের দিকে চোখ ফিরিয়ে বলল, আমরাও সেটা জানি! অপর একজন চোখ না ফিরিয়েই মুখটা হাঁ করে জয়ধ্বনি দিয়ে এগিয়ে গেল।
থেমে গিয়ে কাঁধের গাঁঠরি নামার আদেশ দেয়া হল।
সেনাদলকে ভালো করে দেখে নিয়ে ব্যাগ্রেশন ঘোড়া থেকে নামল। হাতের রাশটা একজন কসাকের হাতে দিয়ে ফেল্ট কোটটা খুলে সেটাও তার হাতে দিল, তারপর পা দুটো টান করে টুপিটা ঠিকমতো মাথায় বসিয়ে নিল। অফিসারবৃন্দ পরিচালিত ফরাসি বাহিনীর মাথার দিকটা পাহাড়ের নিচ থেকে বেরিয়ে এল।
মুহূর্তের জন্য প্রথম সারির দিকে মুখ ফিরিয়ে ব্যাগ্রেশন বলল, আগে বাঢ়! ঈশ্বর তোমাদের সহায় হোন! তারপর দুই হাত ঈষৎ দোলাতে দোলাতে অশ্বারোহীর অদ্ভুত ভঙ্গিতে সে অসমান মাঠের উপর দিয়ে এগিয়ে চলল। প্রিন্স আন্দ্রুর মনে হল, একটি অদৃশ্য শক্তি তাকে সামনের দিকে চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছে, সে মনে মনে খুব খুশি হল।
ফরাসিরা ইতিমধ্যেই যেন এগিয়ে এসেছে। প্রিন্স আন্দ্রু ব্যাগ্রেশনের পাশে পাশেই হাঁটছে, ফরাসি সৈন্যদের চামড়ার কোমরবন্ধ, তাদের লাল স্কন্ধত্রাণ, এমন কি তাদের মুখগুলো পর্যন্ত স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে। প্রিন্স ব্যাগ্রেশন আর কোনোরকম হুকুম না দিয়ে সৈন্যদের আগে আগে নিঃশব্দে হেঁটে চলেছে। হঠাৎ ফরাসিদের একটার পর একটা গুলি এসে পড়তে লাগল, চারদিক ধোয়ায় ঢেকে গেল, বন্দুকের আওয়াজ শোনা যেতে লাগল। আমাদের কয়েকজন মাটিতে পড়ে গেল। কিন্তু প্রথম গুলি শব্দ শোনামাত্রই ব্যাগ্রেশন চারদিকে তাকিয়ে চিৎকার করে বলল হুররা!
সৈনিকদের ভিতর থেকেও উঠল তার দীর্ঘায়ত প্রতিধ্বনি হুররা–অ–আ!
ব্যাগেশনকে পার হয়ে তারা মহা উৎসাহে দলে দলে বিশৃঙ্খল শত্রুবাহিনীর দিকে ছুটে চলল।
*
অধ্যায়-১৯
ষষ্ঠ পদাতিক বাহিনীর আক্রমণের ফলে আমাদের ব্যূহের দক্ষিণ প্রান্তবর্তী সৈন্যরা পশ্চাদপসরণের সুযোগ পেল। মাঝখানে তুশিনের যে গোলন্দাজ বাহিনী শোন গ্ৰেবার্ন গ্রামে আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছিল, তারা ফরাসিদের অগ্রগতিক বিলম্বিত করে দিল। বাতাসের বেগে আগুন আরো ছড়িয়ে পড়ছে দেখে ফরাসি সৈন্যরা আগুন নেভাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল, আর তার ফলে আমাদের সৈন্যরা পশ্চাদপসরণের সময় পেয়ে গেল। কেন্দ্রস্থ সৈন্যরা অতি দ্রুত খাদের অপর পারে সরে গেল, কিন্তু একদল অন্য দলের সঙ্গে মিশে গেল না। কিন্তু আমাদের বাঁ দিকে আজভ ও পদল পদাতিক বাহিনী এবং পাভলোগ্রাদ অশ্বারোহী বাহিনী লানেসের অধীনস্থ বিরাট ফরাসি বাহিনীর যুগপৎ আক্রমণে দিশেহারা হয়ে পড়ল। অবিলম্বে পশ্চাদপসরণের হুকুম দিয়ে ব্যাগ্রেশন সেখানে পাঠিয়ে দিল ঝেরকভকে।
টুপি থেকে হাত না সরিয়ে ঝেরকভ ঘোড়া ছুটিয়ে দিল। কিন্তু ব্যাগেশনের কাছ থেকে সরে যেতে না যেতেই তার সাহসে ভাটা পড়ল। ভয় তাকে পেয়ে বসল, বিপদ যেখানে ঘন হয়ে উঠেছে সেখানে যাবার সাহসই তার হল না।
ব্যূহের বাঁ দিকে পৌঁছে সে গোলাগুলির ভয়ে সামনের সারির দিকে না এগিয়ে অধিনায়ক ও তার সহকারীদের যেখানে থাকবার কথা নয় সেখানেই তাদের খুঁজতে লাগল এবং স্বভাবতই সেনাপতির হুকুমটা জানাতেই পাল না। ব্রাউনাউতে কুতুজভ যে রেজিমেন্টটা পরিদর্শন করেছিল এবং যার সঙ্গে যুক্ত ছিল দলখভ, তার অধিনায়কের উপরেই পড়েছে বহের বাঁ দিককার বাহিনীর পরিচালনাভার। কিন্তু বাঁ দিককার একেবারে শেষ প্রান্তবর্তী সেনাদলটির পরিচালনভার পড়েছে পাভলোগ্রাদ রেজিমেন্টের অধিনায়কের উপর, আর সেই রেজিমেন্টেই আছে রস্তভ। ফলে দুই রেজিমেন্টের মধ্যে ভুল-বোঝাবুঝির সৃষ্টিহল। দুই অধিনায়কই একে অন্যের উপর চটে গেল এবং দক্ষিণ ব্যূহে আক্রমণ চালিয়ে ফরাসিরা যখন বেশ এগিয়ে এসেছে তখনো তারা আলোচনায় মেতে উঠে একে অপরকে আঘাত করতেই ব্যস্ত। অশ্বারোহী এবং পদাতিক কোনো রেজিমেন্টই আসন্ন যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হয় নি। সাধারণ সৈনিক থেকে অধিনায়ক পর্যন্ত কেউ যুদ্ধের কথা ভাবছেই না, তারা শান্তিতে দিন কাটাচ্ছে, অশ্বারোহী সৈন্যরা ঘোড়াদের দানাদানি খাওয়াচ্ছে, আর পদাতিক সৈন্যরা কাঠ যোগাড় করছে।
কিন্তু তখন আর নষ্ট করবার মতো সশয় নেই। তাড়াতাড়ি কাজ সারতে হবে। কামান ও বন্দুক একযোগে দক্ষিণ ও মধ্যভাগে আক্রমণ শুরু করেছে, লানেসের এসে ঘাঁটি গেড়েছে। পদাতিক বাহিনীর অধিনায়ক ঘোড়ায় চেপে পাভলোগ্রাদ অধিনায়কের কাছে গেল। দুই অধিনায়কই বিনম্র অভিবাদন জানাল, কিন্তু তাদের মনের মধ্যে তখনো ফুঁসছে গোপন বিদ্বেষ।
