*
অধ্যায়-১৮
প্রিন্স ব্যাগ্রেশন আমাদের দক্ষিণ ব্যূহের সর্বোচ্চ পৌঁছবার পর এবার নিচে নামতে শুরু করল। সেখান থেকে বন্দুকের আওয়াজ আসছে, কিন্তু ধোয়ার জন্য কিছুই দেখা যাচ্ছে না। তারা খাদের দিকে যত এগোচ্ছে ততই সবকিছু ধোঁয়ায় বেশি করে ঢেকে যাচ্ছে। আর ততই তারা বেশি করে বুঝতে পারছে যে সত্যিকারের যুদ্ধক্ষেত্র আরো কাছে এগিয়ে আসছে। এবার আহত সৈনিকদের সঙ্গে দেখা হচ্ছে, একজনের মাথা বেয়ে রক্ত পড়ছে, মাথায় টুপি নেই, অন্য দুটি সৈনিক তাকে জড়িয়ে দরে টেনে নিয়ে চলেছে। তার গলার মধ্যে ঘড় ঘড় শব্দ হচ্ছে, রক্ত-বমি হচ্ছে। তার গলায় অথবা মুখে গুলি লেগেছে। আর একজন নিজেই হেঁটে যাচ্ছে, হাতে বন্দুক নেই, একটা হাত বুলিয়ে আর্তনাদ করতে করতে চলেছে, ওই হাতটাতেই গুলি লেগেছে, যেন খোলা : বোতলের ভিতর থেকে রক্ত বেরিয়ে তার গ্রেটকোট বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে। এইমাত্র সে আহত হয়েছে, যন্ত্রণা অপেক্ষা ভয়ই তার মুখে বেশি করে ফুটে উঠছে। একটা রাস্তা পার হয়ে খাড়া উড়াই বেয়ে নামতে নামতে তারা দেখল, কয়েকজন মাটিতে শুয়ে আছে, একদল সৈনিকের সঙ্গেও তাদের দেখা হল, সৈনিকদের কেউ কেউ অক্ষত দেহেই আছে। অনেক কষ্টে শ্বাস টানতে টানতে তারা পাহাড় বেয়ে উঠছে, সেনাপতির উপস্থিতি সত্ত্বেও তারা জোর গলায় কথা বলছে, নানারকম অঙ্গভঙ্গি করছে। তাদের সামনে ধোয়ার ভিতর দিয়ে সারি সারি ধূসর জোব্বা চোখে পড়ল। একজন অফিসার ব্যাগ্রেশনকে দেখতে পেয়ে পশ্চাদপসরণকারী সৈনিকদের ডাকতে ডাকতে তাদের দিকে ছুটে গিয়ে তাদের ফিরে দাঁড়াবার হুকুম দিল। ব্যাগ্রেশন ঘোড়া ছুটিয়ে এগিয়ে গেল, এখানে-ওখানে গোলাগুলির শব্দে সৈন্যদের চেঁচামেচি ও হুকুমের শব্দ চাপা পড়ে গেল। বাতাসে ধোয়ার গন্ধ। ধোয়া লেগে সৈনিকদের মুখগুলো কালো হয়ে গেছে। কেউ কামানে বারুদ ভরছে, কেউ শিক দিয়ে বারুদ ঠাসছে, কেউ বা গোলা ছুঁড়ছে, যদিও কাকে লক্ষ্য করে কামান দাগছে, ধোয়ার জন্য সেটাই দেখতে পাচ্ছে না। মাঝে মাঝেই একটা মধুর গুঞ্জন ও বুলেটের শনশন শব্দ শোনা যাচ্ছে। সৈন্যদের দিকে এগিয়ে যেতে যেতে প্রিন্স আন্দ্রু ভাবল, এটা কি? এটা তো আক্রমণ হতে পারে না, কারণ সৈনিকরা নড়ছে না, এটা কোনো বাগানও হতে পারে না, কারণ সৈন্যদের সেভাবে জমায়েত করা হয় নি।
রেজিমেন্টের অধিনায়ক একহারা চেহারার দুর্বলদর্শন এক বৃদ্ধ, মুখে স্মিত হাসি, চোখের পাতা নেমে এসে চোখের প্রায় অর্ধেক ঢেকে ফেলেছে। ঘোড়ায় চেপে এগিয়ে গিয়ে সে ব্যাগ্রেশনকে স্বাগত জানাল–ঠিক যেন কোনো গৃহস্বামী স্বাগত জানাল তার সম্মানিত অতিথিকে। সে জানাল, ফরাসি অশ্বারোহী বাহিনী তার রেজিমেন্টকে আক্রমণ করেছিল, সে আক্রমণ এখন প্রতিহত হয়েছে, কিন্তু তার অর্ধেকেরও বেশি সৈন্য যুদ্ধে মারা গেছে। সে মুখে বলল বটে আক্রমণ প্রতিহত হয়েছে, কিন্তু আসলে এই আধ ঘণ্টা সময়ে তার সৈন্যদের কি হাল হয়েছে তা সে নিজেই জানে না, আর আক্রমণ প্রতিহত হয়েছে না কি তার সেনাদল ছত্রভঙ্গ হয়েছে সে কথাও সে নিশ্চিত করে বলতে পারে না। সে শুধু এইটুকই জানে যে, যুদ্ধের শুরুতে তার রেজিমেন্টের মাথায় গোলাগুলি সমানে উড়তে আরম্ভ করেছিল, আঘাতের পর আঘাত হানছিল, তারপরেই একজন চেঁচিয়ে বলল অশ্বারোহী বাহিনী! আর সঙ্গে সঙ্গে আমাদের সৈন্যরাও কামান দাগতে শুরু করে দিয়েছিল। তারা এখনো গোলাগুলি ছুঁড়ছে, কিন্তু অশ্বারোহী বাহিনীকে লক্ষ্য করে নয়, কারণ তারা সরে গেছে, এখন গুলির লক্ষ্য ফরাসি পদাতিক বাহিনী যারা খাদে নেমে আমাদের সৈন্যদের দিকে গুলি ছুড়ছে। প্রিন্স ব্যাগ্রেশন এমনভাবে মাথাটা নিচু করল যেন ঠিক এটাই ছিল তার বাসনা ও প্রত্যাশা। অ্যাডজুটান্টের দিকে ফিরে সে– আদেশ দিল, ষষ্ঠ পদাতিক বাহিনীকে (Chasseur) এখানে নামিয়ে আনা হোক। এই মুহূর্তে প্রিন্স ব্যাগ্রেশনের মুখের ভাবের পরিবর্তন লক্ষ্য করে প্রিন্স আল্লু অবাক হয়ে গেল। গ্রীষ্মের দিনে জলে ঝাঁপিয়ে পড়ার আগে শেষ বারের মতো দৌড়বার সময় কোনো লোকের মুখে যে ভাব ফুটে ওঠে সেই সংহত আনন্দিত সিদ্ধান্তের ভাবটি ফুটে উঠেছে তার মুখে। তার মুখে তখন না আছে সেই ঘুমঘুম ভাব, না আছে গভীর চিন্তার প্রকাশ। যদিও তার পদক্ষেপ এখনো ধীর ও মাপা, তবু কোনো কিছুর পর ভয় না রেখেই বাজপাখির মতো স্থির দৃষ্টি মেলে সে সাগ্রহে এবং ঘৃণার সঙ্গে সামনের দিকে তাকিয়ে আছে।
রেজিমেন্টের অধিনায়ক প্রিন্স ব্যাগ্রেশনের দিকে ঘুরে তাকে ফিরে যেতে অনুরোধ করল, কারণ জায়গাটা খুবই বিপজ্জনক। সে বলল, ঈশ্বরের দোহাই ইয়োর এক্সেলেন্সি, দয়া করে এখানে থাকবেন না! চারদিক থেকে ছুটে আসা বুলেটের হিস-হিস শনশন শব্দের প্রতি তার মনোযোগ আকর্ষণ করে বলল, ওই দেখুন! কোনো ভদ্রলোক তার কুড়লটা হাতে নিলে ছুতোর যে অনুনয় ও তিরস্কারের সুরে বলে, আমরা এতে অভ্যস্ত সাহেব, কিন্তু আপনার হাতে ফোস্কা পড়বে, ঠিক তেমনই সুরে সে কথাগুলি বলল। এমনভাবে বলল যেন বুলেটে তার মৃত্যু হতে পারে না, তার আধবোজা চোখ দুটি বুঝি বা তার কথাগুলিকে আরো বিশ্বাসযোগ্য করে তুলেছে। স্টাফ-অফিসারও কর্নেলের সঙ্গে সুর মেলাল, কিন্তু ব্যাগ্রেশন কোনো জবাব দিল না, শুধু গোলাবর্ষণ বন্ধ করার হুকুম দিয়ে সৈন্যদের এমনভাবে নতুন করে সাজাতে বলল যাতে নতুন দুটি ব্যাটেলিয়নকে জায়গা করে দেয়া যায়। কথা বলতে বলতেই বাতাসের বেগে ধোয়ার পর্দাটা ডান থেকে বায়ে সরে যেতে লাগল, যেন কোনো অদৃশ্য হাত পর্দাটাকে সরিয়ে দিল, আর বিপরীত দিককার পাহাড়ের উপর ফরাসিদের গতিবিধ চোখের সামনে দৃশ্যমান হয়ে উঠল। সৈনিকদের লোমের টুপিগুলি দেখা যাচ্ছে, অফিসার ও সৈনিকদের পার্থক্য বোঝা যাচ্ছে, দণ্ডের মাথায় পতাকাটিকেও উড়তে দেখা যাচ্ছে।
