হিসাবরক্ষক বলল, তাহলে এই দিয়েই ওরা আঘাত হানে? কী ভীষণ!
যে যেন খুশিতে ডগমগ হয়ে উঠেছে। তার কথা শেষ হতে না হতেই আর একটা প্রচণ্ড শিস শোনা গেল, মার সেটাও হঠাৎই একটা নরম কিছুর মধ্যে সশব্দেগ ফেটে পড়ল। সঙ্গে সঙ্গে তাদের ডাইনে ও হিসাবরক্ষক কসাকটির সামনে থেমে গিয়ে তাকে ভালো করে পরীক্ষা করে দেখল, লোকটি মারা গেছে, কিন্তু তার ঘোড়াটা তখনো ছটফট করছে।
প্রিন্স ব্যাগ্রেশন চোখ কুঁচকে চারদিকে তাকাল, গোলমালের কারণটা বুঝতে পেরে নির্বিকারভাবে চোখ ফিরিয়ে নিল, যেন বলতে চাইল, এসব তুচ্ছ জিনিসের প্রতি নজর দিয়ে কি হবে? কুশলী সওয়ারের মতো
অতিসহজে ঘোড়ার রাশ টেনে ঈষৎ ঝুঁকে পড়ে সে নিজের তরবারি কোষমুক্ত করল। তরবারিখানা সেকেলে ধরনের, আজকাল কেউ বড় একটা ব্যবহার করে না। প্রিন্স আন্দ্রুর মনে পড়ে গেল, সুভরভই ইতালিতে ব্যাগ্রেশনকে এই তরবারি দিয়েছিল, এই মুহূর্তে কথাটা তার বড়ই ভালো লাগল। ততক্ষণে তারা কামান মঞ্চের কাছে পৌঁছে গেছে।
বারুদের গাড়ির পাশে দাঁড়ানো একটি গোলন্দাজ সৈনিককে প্রিন্স ব্যাগ্রেশন জিজ্ঞেস করল, এটা কার কোম্পানি?
মুখে বলল, এটা কার কোম্পানি? কিন্তু আসলে সে জানতে চাইল, তুমি কি এখানে ভয় পেয়েছ? গোলন্দাজটি তার কথা বুঝতে পারল। সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে মুখবর্তি দাগওয়ালা লাল-চুল গোলন্দাজটি খুশির সুরে বলল, ক্যাপ্টেন তুশিনের ইয়োর এক্সেলেন্সি।
কি যেন ভাবতে ভাবতেই ব্যাগ্রেশন বিড় বিড় করে বলল, হ্যাঁ, হ্যাঁ, তারপরই কামানশ্রেণীর পাশ দিয়ে একেবারে শেষ কামানটির দিকে এগিয়ে গেল।
কাছাকাছি যেতেই একটা গোলার শব্দ তাদের সকলেরই কানে তালা লাগিয়ে দিল, ধোঁয়ার কুণ্ডলি হঠাৎ কামানটাকে ঢেকে ফেললেও তার ভিতর দিয়েই দেখা গেল, একনম্বর গোলন্দাজটি কামানটাকে আঁকড়ে ধরে পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে নেবার চেষ্টা করছে, আর দুনম্বর কাঁপা হাতে কামানের মুখে বারুদ ভরছে। চওড়া-কাঁধ, ছোটখাট ক্যাপ্টেন তুশিন কামানবাহী শকটের পিছন থেকে লাফিয়ে সামনে এসে সেনাপতির উপস্থিতি খেয়াল করেই ছোট হাতটা চোখের উপর তুলে সামনে তাকাল।
তার শরীর দুর্বল, গলার স্বরও দুর্বল, তবু যথাসাধ্য কর্তৃত্বের ভঙ্গিতে সে হাঁক দিয়ে বলল, আরো দুটো ধাপ তুলে দাও, তাহলেই ঠিক হবে। দুনম্বর! মেদভেদেভে কামান দাগো।
ব্যাগ্রেশন তুশিনকে ডাকল, তুশিনও এমন সলজ্জ অদ্ভুত ভঙ্গিতে তিনটে আঙুল টুপিতে ছোঁয়াল যে সামরিক অভিবাদনের বদলে সেটাকে পুরোহিততের আশীর্বাদ বলেই মনে হল। যদিও উপত্যকা লক্ষ্য করে গোলাবর্ষণ করাই ছিল তুশিনের কামানগুলির উদ্দেশ্য, আসলে সে কিন্তু আগুনে বোমা ছুঁড়ছিল ঠিক সামনের দিককার শোন ঘেবার্ন গ্রামটিকে লক্ষ্য করে, সেই গ্রামের সামনে দিয়েই একটা মস্ত বড় ফরাসি বাহিনী এগিয়ে আসছে।
কোথায় ও কাকে লক্ষ্য করে কামান দাগা হবে সে হুকুম কেউ তুশিনকে দেয় নি, সার্জেন্ট-মেজর জাখারচেংকোকে সে শ্রদ্ধার চোখে দেখে, তার সঙ্গে পরামর্শ করেই তুশিন স্থির করেছে গ্রামটাতে আগুন ধরিয়ে দেওয়াটাই ভালো হবে। অফিসারের বিবরণ শুনে ব্যাগ্রেশন বলল, খুব ভালো, তারপর সম্মুখে প্রসারিত রণক্ষেত্রটাকে ভালো করে দেখতে লাগল। আমাদের ডানদিকে ফরাসিরা বেশ এগিয়ে এসেছে। সে উঁচু জায়গাটাতে কিয়েভ সেনাদলকে মোতায়েন করা হয়েছে তার নিচে যে খাদের ভিতর দিয়ে ছোট নদীটা বয়ে চলেছে সেখান থেকে বন্দুকের ফট ফট আওয়াজ শোনা যাচ্ছে এবং ডানদিকে বেশ কিছুটা দূরে দেখা যাচ্ছে, একটা ফরাসি বাহিনী আমাদের ঘিরে ফেলবার চেষ্টা করছে। বাঁ দিকে একটা জঙ্গলে দিগন্ত ঢাকা পড়েছে। প্রিন্স ব্যাগ্রেশন হুকুম দিল, ডান দিকের শক্তিবৃদ্ধি করতে মধ্য ভাগ থেকেই দুই ব্যাটেলিয়ন সৈন্য সেখানে পাঠানো হোক। দলের অফিসারটি সাহস করে প্রিন্সকে বলল, দুই ব্যাটেলিয়ন সৈন্য পাঠিয়ে দিলে এখানকার কামানগুলি অরক্ষিত হয়ে পড়বে। প্রিন্স ব্যাগ্রেশন অফিসারটির দিকে মুখ ঘুরিয়ে অর্থহীন চোখ মেলে নিঃশব্দে তার দিকে তাকাল। প্রিন্স আর মনে হল যে অফিসারটি ঠিক কথাই বলেছে, সত্যি তার কথার কোনো জবাব নেই। ঠিক সেই মুহূর্তে নিচের খাদে মোতায়েন সেনাদলের অধিনায়ককের চিঠি নিয়ে ঘোড়া ছুটিয়ে এল একজন অ্যাডজুটান্ট, জানাল, একটা মস্ত বড় ফরাসি বাহিনী তাদের লক্ষ্য করে নেমে আসছে, তাদের সেনাদলে বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছে, তারা কিয়েভ গোলন্দাজদের দিকে সরে যাচ্ছে। প্রিন্স ব্যাগ্রেশন দেখা দিয়েছে, তারা কিয়েভ গোলন্দাজদের দিকে সরে যাচ্ছে। প্রিন্স ব্যাগ্রেশন সম্মতিসূচক ঘাড় নাড়ল। ডান দিকে কিছুটা এগিয়ে গিয়ে একজন অ্যাডজুটান্টকে অশ্বারোহী বাহিনীর কাছে পাঠিয়ে হুকুম জানাল, তারা যেন ফরাসিদের আক্রমণ করে। কিন্তু আধ ঘণ্টা পরে সেই অ্যাডজুটান্টটি ফিরে এসে খবর দিল, শত্রুপক্ষের প্রচণ্ড গোলাবর্ষণের মুখে অকারণে সৈন্যরা মারা পড়ছিল বলে অশ্বারোহী বাহিনীর অধিনায়ক ইতিমধ্যেই খাদ পেরিয়ে সরে গেছে এবং গুলি চালাবার জন্য কিছু সৈন্যকে জঙ্গলের ভিতর পাঠিয়ে দিয়েছে।
খুব ভালো, ব্যাগ্রেশন বলল।
সেখান থেকে চলে আসবার সময় বাঁদিক থেকেও গোলগুলির শব্দ শোনা গেল, নিজে সেখানে যেতে না পারায় প্রিন্স ব্যাগ্রেশন ঝেরকভকে পাঠিয়ে হুকুম দিল, সেখানকার অধিনায়ক যেন যত তাড়াতাড়ি সম্ভব খাদের পিছন দিকে সরে যায়, কারণ ব্যূহের দক্ষিণ অংশও আর বেশি সময় শক্রপক্ষের আক্রমণের সামনে দাঁড়াতে পারবে না। তুশিন ও তার কামানরক্ষী সেনাদলের কথা তারা বেমালুম ভুলে গেল। সবকিছু দেখে শুনে প্রিন্স আন্দ্রু অবাক হয়ে গেল, সে বুঝল, কোনো কিছুই সেনাপতির ইচ্ছানুসারে ঘটছে না, ঘটছে ঘটনাচক্রে, অথচ ব্যাগ্রেশন এমন ভাব দেখাচ্ছে যেন তার উপস্থিতি অত্যন্ত মূল্যবান। অফিসাররা বিচলিত হয়ে তার সামনে এসে শান্ত হয়ে যাচ্ছে, সৈনিক ও অফিসাররা তাকে সানন্দে অভিনন্দিত করছে, তার উপস্থিতিতে উত্যু হয়ে উঠছে, তার সামনে নিজেদের সাহসের পরিচয় দিতে উদগ্রীব হয়ে উঠছে।
