প্রিন্স আন্দ্রু ভাবল, আরে, এ তো সেই ক্যাপ্টেন যে ভাণ্ডারীর দোকানে পায়ে বুট ছাড়াই দাঁড়িয়ে ছিল। তার মধুর দার্শনিক কণ্ঠস্বর চিনতে পেরে তার খুব ভালো লাগল।
তুশিন বলল, একটু কবরেজি-ভদকা? নিশ্চয়!… কিন্তু তবুও, পরজন্মের কথা…।
তার কথা শেষ হল না। ঠিক সেইসময় বাতাসে একটা শিস শোনা গেল, কাছে–আরো কাছে, আরো দ্রুতগতিতে আর উচ্চশব্দে একটা কামানের গোলা অমানুষিক শক্তিতে ছুটে এসে চালাঘরটার কাছে ফাটল।
অনেকটা মাটি ছড়িয়ে পড়ল। সেই প্রচণ্ড আঘাতে মাটি যেন আর্তনাদ করে উঠল।
সঙ্গে সঙ্গে মুখের কোণে ছোট পাইপটা নিয়ে বুদ্ধিদীপ্ত মুখখানাকে বিবর্ণ করে তুশিন চালাঘর থেকে ছুটে বেরিয়ে গেল। চটপটে পদাতিক অফিসারটিও কোটের বোম আটকাতে আটকাতে তাকে অনুসরণ করল।
*
অধ্যায়-১৭
পুনরায় ঘোড়ায় চেপে প্রিন্স আন্দ্রু কামানের পাশে থেকেই দূরের কামানের ধোয়ার দিকে তাকিয়ে রইল। সম্মুখের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে দ্রুত চোখ বুলিয়ে শুধু দেখতে পেল, যে ফরাসি সৈন্যরা এতক্ষণ নিশ্চল হয়ে ছিল, এবার তারা চঞ্চল হয়ে উঠেছে, তাদের বাঁদিকে সত্যি সত্যি একটা কামান-মঞ্চ রয়েছে। তার উপর থেকে কামানের ধোয়া এখনো মিলিয়ে যায়নি। প্রথম গোলার ধোয়া মিলিয়ে না যেতেই আর একটা ধোঁয়ার কুণ্ডলি উঠল এবং সঙ্গে সঙ্গে ভেসে এল তার গর্জন। যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে! প্রিন্স আন্দ্রু ঘোড়ার মুখ ঘুরিয়ে প্রিন্স ব্যাগ্রেশনের খোঁজে ঘোড়া ছুটিয়ে দিল গ্রন্থের দিকে। তার পিছন থেকে মুহুর্মুহু কামানের শব্দ ভেসে আসছে। স্পষ্টতই আমাদের কামানগুলোও জবাব দিতে শুরু করেছে। উত্রাইয়ের নিচে যেখানে সৈনিকদের বৈঠক বসেছিল সেখান থেকেও বন্দুকের শব্দ আসছে।
বোনাপার্তের কড়া চিঠি নিয়ে লেমায়র ঘোড়া ছুটিয়ে সবে এসে হাজির হয়েছে, আর পর্যদস্ত মুরাত স্বীয় ত্রুটির প্রায়শ্চিত্ত করতে সঙ্গে সঙ্গে তার বাহিনীকে সরিয়ে নিয়ে গেছে ঠিক মাঝখানে আক্রমণ করে রুশ বাহিনীকে দুদিক থেকে গুটিয়ে আনবার উদ্দেশ্যে, তবে মনের আশা সন্ধ্যায় সম্রাট এসে পৌঁছার আগেই তার সম্মুখস্থ তুচ্ছ বাহিনীটিকে সে ধ্বংস করে ফেলতে পারবে।
শুরু হয়ে গেছে। এই তো শুরু! প্রিন্স আন্দ্রু ভাবল, তার বুকের মধ্যে রক্ত উত্তাল হয়ে উঠল। কিন্তু কখন, কীভাবে আমার তুলো নিজেকে উপস্থিত করবে?
সৈন্যদলগুলির ভিতর দিয়ে চলতে চলতে সে দেখল, যেসব সৈন্যরা পনেরো মিনিট আগেই পরিজ ও ভদকা খাচ্ছিল, তারাই এখন দ্রুতগতিতে দলে দলে ভাগ হয়ে যাচ্ছে, বন্দুক তুলে নিচ্ছে, যে আগ্রহ জেগেছে তার নিজের বুকের মধ্যে তারই প্রকাশ চোখে পড়ছে তাদের প্রত্যেকের মুখে। প্রতিটি সৈনিক, প্রতিটি অফিসারের মুখ যেন একই কথা বলছে! শুরু হয়ে গেছে! এই তো যুদ্ধ-ভয়ংকর হলেও উপভোগ্য!
নদীর তীরে পৌঁছবার আগেই হেমন্ত সন্ধ্যার ম্লান আলোয় সে দেখতে পেল, কয়েকজন অশ্বরোহী তার দিকেই এগিয়ে আসছে। সকলের আগে কসাক জোব্বা গায়ে ভেড়ার চামড়ার টুপি মাথায় সাদা ঘোড়ায় সওয়ার হয়ে আসছে প্রিন্স ব্যাগ্রেশন। তার এগিয়ে আসার জন্যই প্রিন্স আন্দ্রু থেকে গেল, প্রিন্স ব্যাগ্রেশন ঘোড়ার রাশ টেনে প্রিন্স আন্দ্রুকে চিনতে পেরে মাথা নাড়ল। তার দৃষ্টি তখন সামনের দিকে প্রসারিত, প্রিন্স আন্দ্রু যা কিছু দেখতে পেয়েছে সবই তাকে বলল।
শুরু হয়েছে। এই তো যুদ্ধ!–প্রিন্স ব্যাগ্রেশনের আধ-বোজা ঘুম-ঘুম চোখে ও কঠিন বাদামি মুখেও এই একই অনুভূতির আভাস। প্রিন্স আন্দ্রু সাগ্রহ কৌতূহলের সঙ্গে তার অবিচলিত মুখের দিকেই তাকিয়ে রইল, তার মনের বাসনা-এই মুহূর্তে এই মানুষটি কি ভাবছে। কি অনুভব করছে তা যদি সে বলতে পারত। এই অবিচলিত মুখের আড়ালে কোনো কথা কি লুকনো আছে? প্রিন্স আন্দ্রু নিজেকেই প্রশ্ন করল। তার বক্তব্যের সঙ্গে একমত হয়ে মাথা নেড়ে প্রিন্স ব্যাগ্রেশন বলল, খুব ভালো। এমন সুরে সে কথাটা বলল যেন যা কিছু ঘটেছে, যা কিছু সে শুনেছে সে সবই সে আগে থেকেই জানত। দ্রুত ঘোড়া ছুটিয়ে আসার জন্য দম ফুরিয়ে যাওয়ায় প্রিন্স আন্দ্রু কথা বলছে তাড়াতাড়ি। প্রিন্স ব্যাগ্রেশন প্রতিটি শব্দের উপর জোর দিয়ে খুবই ধীরে ধীরে কথা বলছে, যেন বোঝাতে চাইছে যে তাড়াহুড়া করার কিছু নেই। যাইহোক, সে তুশিনের কামানশ্রেণীর দিকে ঘোড়া ছুটিয়ে দিল। প্রিন্স আন্দ্রু সেই দলকেই অনুসরণ করল। প্রিন্স ব্যাগ্রেশনের পিছনে চলেছে তার ব্যক্তিগত অ্যাডজুটান্ট, ঝেরকভ, একজন আর্দালি-অফিসার কর্তব্যরত স্টাফ-অফিসার ও জনৈক অসামরিক কর্মচারী, সে একজন হিসাবরক্ষক, কৌতূহলের বশতবী হয়ে যুদ্ধে আসার অনুমতি সংগ্রহ করেছে।
হিসাবরক্ষককে দেখিয়ে ঝেরকভ বলকনস্কিকে বলল, ইনি যুদ্ধ দেখতে চান, অথচ এর মধ্যেই তাঁর পাকস্থলীতে একটা ব্যথা বোধ করছেন।
আহা, যেতে দিন! চতুর হাসির হেসে হিসাবরক্ষক বলল, ইচ্ছা করেই সে যেন এটা বোকা-বোজা ভাব দেখাল।
স্টাফ-অফিসার বলল, সবই বিচিত্র সিয় প্রিন্স।
ততক্ষণে সকলেই তুশিনের কামানশ্রেণীর কাছে পৌঁছে গেছে, তাদের ঠিক সামনেই একটা গোলা পড়ে ফাটল।
সরল হাসির সঙ্গে হিসাবরক্ষক জিজ্ঞেস করল, ওটা কি পড়ল?
একখানি ফরাসি পিঠে, ঝেরকভ জবাব দিল।
