প্রহরী সৈন্যরা বলল, ফরাসি ভাষা এইভাবেই বলতে হয়। সিদরভ, এবার তুমি একটু চেষ্টা করে দেখ! ফরাসিদের দিকে ঘুরে সিদরভ একবার চোখ টিপল, তারপর খুব তাড়াতাড়ি কতকগুলি অর্থহীন হ-য-ব র-ল বিশেষ সুর করে আউড়ে যেতে লাগল : কারি, মালা, তাফা, সাফি, মুতের, কাসকা।
হো! হো! হো! হা! হা! হা! হা! ওঃ ওঃ! সৈন্যরা সকলে মিলে এমন অট্টহাসি হেসে উঠল যে তার ছোঁয়াচ ফরাসিদের মনেও ঢেউ তুলল, তারা আর কি করে, গাদাবন্দুকের বারুদ বের করে নিয়ে তাতে আগুন ধরিয়ে দিল, এবং অতি দ্রুত সেখান থেকে প্রস্থান করল।
বন্দুকগুলি কিন্তু গোলাবারুদ-ভরাই রয়ে গেল, প্রাচীরের ফোকড় ও পরিখাগুলি তাকিয়ে রইল তেমনি ভয়ংকর চোখে, আর কামানগুলি আগের মতোই পরস্পরের মুখোমুখি হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
*
অধ্যায়-১৬
ঘোড়ার পিঠে চেপে সারিবদ্ধ সেনাদলের ডান দিক থেকে বাঁদিক পর্যন্ত আগাগোড়া চক্কর দিয়ে প্রিন্স আন্দ্রু সোজা এগিয়ে গেল কামান-মঞ্চের দিকে, স্টাফ-অফিসার বলে দিয়েছিল, সেখান থেকেই গোড়া রণক্ষেত্রটা দৃষ্টিগোচর হবে। সেখানে ঘোড়া থেমে নেমে চারটি কামানের একেবারে সবশেষ কামানটির পাশে গিয়ে দাঁড়াল। কামানগুলির সামনে গোলন্দাজ বাহিনীর একজন শান্ত্রী এদিক-ওদিক পায়চারি করছিল, অফিসারকে দেখে সে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল, কিন্তু একটা ইঙ্গিতেই আবার সেই একঘেয়ে পদচারণা শুরু করল। কামানগুলির পিছনে ছিল কয়েকটা রসদবাহী গাড়ি, আর তারও পিছনে সৈনিকদের বহুস্তব। তার বাঁদিকে কিছুটা দূরেই বাঁশের কঞ্চি ও বাখারি দিয়ে সদ্য তৈরি একটা চালাঘর, সেখান থেকে অফিসারদের সাগ্রহ আলোচনার শব্দ ভেসে আসছে।
কামান-মঞ্চটার উপর থেকে যে গোটা রুশ বাহিনীর অবস্থিতি এবং শত্রুপক্ষের অবস্থানেরও অনেকটাই চোখে পড়ে সে কথা সত্য। ঠিক সম্মুখেই বিপরীত দিককার পাহাড়ের মাথায় শোন গেবার্ন গ্রামটা দেখা যাচ্ছে, এবং তার বাঁ ও ডান দিকে তিনটি স্থঅনে ক্যাম্প-ফায়ারের ধোঁয়ার মধ্যে ফরাসি বাহিনীকে দেখা যাচ্ছে। ওই গাঁয়ের বাঁদিকে ধোঁয়ার মধ্যে কামান-মঞ্চের মতো একটা কিছু আছে বলেই মনে হয়, কিন্তু এতদূর থেকে খালি চোখে সেটাকে ভালো করে দেখা যাচ্ছে না। আমাদের বাহিনী একটা চড়াইয়ের উপর ঘাঁটি গেড়েছে, সেখান থেকে ফরাসি বাহিনীকে আক্রমণ করা সহজ। সেখানে জমায়েত হয়েছে আমাদের পদাতিক বাহিনী এবং একেবারে শেষ প্রান্তে রয়েছে অশ্বারোহী দল। ঠিক মাঝখানে রয়েছে তুশিনের কামান-মঞ্চ, সেখানে দাঁড়িয়েই প্রিন্স আন্দ্রু সবকিছু পর্যবেক্ষণ করছে, যে ছোট নদীটা শোন গ্রেবান থেকে আমাদের বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে তাতে নামা-ওঠা কারার সবচাইতে সুবিধাজনক স্থানও সেটাই। বাঁদিকে আমাদের সেনাদলের খুব কাছেই একটা জঙ্গল, সৈন্যরা সেখানে গাছ কাটছে, তাদের জ্বালানো আগুনের ধোয়াও চোখে পড়ছে। ফরাসি সেনা-ব্যুহ আমাদের চাইতে অনেক বেশি প্রশস্ত, পরিষ্কার বোঝা যায় যে দুদিক থেকেই তারা সহজেই আমাদের কাবু করতে পারে। আমাদের পিছনেই একটা খাড়া উত্রাই, ফলে আমাদের গোলন্দাজ ও অশ্বারোহী বাহিনীর পক্ষে পিছু হটাও খুব শক্ত একটা কামানের উপর হেলান দিয়ে নোট-বই বের করে প্রিন্স আন্দ্রু সেনা অবস্থানের একটা রেখাচিত্র এঁকে ফেলল। ব্যাগ্রেশনকে বোঝাবার জন্য দুটো বিষয়ে কিছু মন্তব্যও লিখে রাখল। সে ভেবে নিয়েছে, প্রথমে গোলন্দাজ বাহিনীকে মাঝখানে একত্র করবে, তারপর অশ্বারোহী বাহিনীকে উত্রাইয়ের অপর পারে সরিয়ে নেবে। প্রিন্স আন্দ্রু সর্বদা প্রধান সেনাপতির কাছাকাছিই থাকে, কাজেই নিজের অজান্তেই আসন্ন যুদ্ধের একটা মোটামুটি খসড়া সে মনে মনে ছকে ফেলল আর সেই চিন্তায়ই মশগুল হয়ে পড়ল। কামানের পাশে দাঁড়িয়ে অফিসারদের সব কথাই সে শুনতে পাচ্ছিল, কিন্তু সাধারণত যা হয়ে থাকে তাদের সেসব কথার অর্থ সে কিছুই ধরতে পারছিল না। হঠাৎ চালাঘর থৈকে ভেসে-আসা একটা কণ্ঠস্বর শুনে সে সজাগ হয়ে উঠল, সে কণ্ঠস্বর এতই আন্তরিকতায় পূর্ণ যে সে ভালো করে কান পাতল।
প্রিন্স আর মনে হল সেই মধুর কণ্ঠস্বর তার পরিচিত। কণ্ঠস্বর বলে উঠল, না বন্ধু, আমি বলতে চাই মৃত্যুর পরে কি আছে তা জানা যদি সম্ভব হত তাহলে আমরা কেউই মৃত্যুকে ভয় করতাম না। এটাই ঠিক কথা বন্ধু।
আর একটি অপেক্ষাকৃত অল্পবয়সী কণ্ঠস্বর তাকে বাধা দিল :
ভয় পাও আর নাই পাও, তার হাত থেকে কিন্তু পরিত্রাণ পাবে না।
তাদের দুজনকেই বাধা দিয়ে একটি তৃতীয় পৌরুষদীপ্ত কণ্ঠস্বর বলল, যাই বলো না কেন, ভয় কিন্তু আছেই! তোমরা খুব চালাক ছেলে। অবশ্য তোমরা গোলন্দাজ সৈন্যরা খুব বুদ্ধিমান, কারণ তোমরা তো ভদকা আর খাবারদাবার সবই সঙ্গে নিতে পার।
পৌরুষদীপ্ত কণ্ঠের অধিকারী পদাতিক বাহিনীর অফিসারটি হেসে উঠল।
পরিচিত কণ্ঠের প্রথম বক্তা বলল, হ্যাঁ, মানুষ ভয় পায়। আসলে কী জান, অজানাকেই লোকে ভয় করে। আমরা যতই বলি না কেন যে আত্মা আকাশে চলে যায়… আমরা তো জানি, যে আকাশ বলে কিছু নেই, আছে শুধু হাওয়া।
পৌরুষ কণ্ঠটি আবার গোলন্দাজ অফিসারকে বাধা দিল।
বেশ তো, তোমার ওই কবরেজি ভদকা আমাদের খানিকটা খাওয়াও না তুশিন।
