আর এক কোম্পানির সৈন্যর ভাগ্য খুব ভালো, কারণ সব কোম্পানির ভাগ্যে ভদকা জোটে না। মুখে দাগওয়ালা চওড়া কাঁধ একজন সার্জেন্ট-মেজরকে ঘিরে তারা বসেছে। আর একটা ছোট পিপে কাত করে তার দিকে এগিয়ে ধরা, ক্যান্টিনের কৌটোগুলোকে সে একে এসে ভরে দিচ্ছে। সৈন্যরা ভক্তির সঙ্গে সেই কৌটোকে ঠোঁটের কাছে তুলে মুখের মধ্যে ভদকা ঢেলে কৌটো খালি করে দিয়ে খুশি মুখে ঠোঁট চাটতে। চাটতে আর গ্রেটকোটের আস্তিনে মুখ মুছতে মুছতে সার্জেন্ট মেজরের কাছ থেকে দূরে চলে যাচ্ছে। সকলেরই চোখে মুখে এত গভীর প্রশান্তি যেন শান্তিপূর্ণ শিবির জীবন শুরু করার আগে তারা বাড়িতে বসে এসব করছে, তাদের দেখে মনেই হয় না যে এমন একটা আসন্ন যুদ্ধে তারা শত্রুর একেবারে মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে যাতে তাদের অন্তত অর্ধেক সৈন্য সেই রণক্ষেত্রেই পড়ে থাকবে। বেশ কিছুদূর এগিয়ে প্রিন্স আন্দ্রু এক প্লাটুন গোলন্দাজ সৈন্যের সামনে এসে পৌঁছল, তাদের সামনে একটি উলঙ্গ লোক পড়ে আছে। দুটি সৈন্য তাকে ধরে আছে, আর অন্য দুজন ছোট লাঠি ঘুরিয়ে তার খোেলা পিঠে আঘাত করে চলেছে। লোকটি অস্বাভাবিক রকমের চিৎকার করছে। একজন মেজর তাতে কোনোরকম কান না দিয়ে পায়চারি করছে, আর বার বার চেঁচিয়ে বলছে, একজন সৈন্যের পক্ষে চুরি করা অত্যন্ত লজ্জার কথা, একজন সৈন্যকে হতে হবে সৎ, সম্মানিত ও সাহসী, কিন্তু সে যদি তার সহকর্মীদের জিনিস চুরি করে তাহলে তো তার কোনো সম্মানই থাকতে পারে না, সে তো একটা বদমাশ। চালাও! চালাও!
কাজেই লাঠির হিস হিস শব্দ আর অসহায় তীব্র চিৎকার চলতেই লাগল।
চালাও, চালাও! মেজর বলল।
কিংকর্তব্যবিমূঢ় একটি অফিসার বেদনার্ত মুখে সেখান থেকে এগিয়ে এসে অশ্বারোহী অ্যাডজুটান্টের দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকাল।
অগ্রবর্তী প্রথম সারিতে পৌঁছে প্রিন্স আরো এগিয়ে বলল। ডান ও বাঁদিকে আমাদের সৈন্যদল ও শত্রুসৈন্যের মধ্যে অনেকখানি দূরত্ব থাকলেও আমাদের যে মধ্যবর্তী সেনাদলের ভিতর থেকে সেদিন সকালেই সন্ধির পতাকা নিয়ে একদল সৈন্য এগিয়ে গিয়েছিল তাদের অবস্থান ও শত্রুসৈন্যের অবস্থান এতই কাছাকাছি যে তারা পরস্পরের মুখ দেখতে পারে, কথাও বলতে পারর। তাছাড়া উভয় পক্ষেরই প্রহরী সেনাদল ছাড়াও কিছু কৌতূহলী দর্শক সেখানে জমা হয়েছিল যারা হাসি-ঠাট্টা করতে করতে অপরিচিত বিদেশী সৈন্যদের তাকিয়ে দেখছিল।
যদিও খুব সকাল থেকেই নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে যে কেউই প্রহরারত সেনাদলের কাছে যেতে পারবে না, তবু অফিসাররা উৎসুক দর্শকদের ঠেকিয়ে রাখতে পারে নি। আর প্রহরী সেনাদলও সঙ্গের দলের লোকদের মতো ফরাসিদের উপর নজর না রেখে কৌতূহলী দর্শকদেরই দেখছে, এবং কখন তাদের বদলি সেনাদল আসবে তার জন্য অপেক্ষা করে আছে। ফরাসিদের ভালো করে দেখার জন্য প্রিন্স আন্দ্রু সেখানে থামল।
একজন রুশ বন্দুকধারী জনৈক অফিসারের সঙ্গে প্রহরী সেনাদলের কাছে গিয়ে একটি ফরাসি গোলন্দাজ সৈনিকের সঙ্গে উত্তেজিতভাবে দ্রুত কথা বলছিল। তাকে দেখিয়ে একজন সৈনিক অপরজনকে বলল, দেখ! ওদিকে দেখ! ওর বকবকানিটা শোন! খুব ভালো, তাই না? ফরাসিরা ওর সঙ্গে শুধু কথার বেলায়ই তাল রাখতে পারে। এদিকে দেখ সিদরভ!
থাম, মন দিয়ে শোেন। চমৎকার! সিদরভ বলল, তাকে ফরাসি ভাষায় খুব পটু বলে মনে করা হয়।
যে সৈনিকটির কথা বলে ওরা হাসছিল সে দলকভ। প্রিন্স আন্দ্রু তাকে চিনতে পেরে তার বক্তব্য শুনবার জন্য থামল। তাদের রেজিমেন্টকে বাঁদিকের সারিতে মোতায়েন করা হয়েছে, সেখান থেকেই সে তার ক্যাপ্টেনের সঙ্গে এসেছে।
অফিসারটি তার কথার বিন্দুবিসর্গও বুঝতে পারছিল না, তবু যাতে একটি কথাও হারিয়ে না যায় এমনিভাবে সামনে ঝুঁকে অফিসারটি তাকে উস্কে দিয়ে বলল, আরে চালাও, চালিয়ে যাও। আরো কথা বল : আরো! ও কি বলছে?
দলকভ ক্যাপ্টেনের কথার জবাব দিল না, ফরাসি গোলন্দাজটির সঙ্গে তখন তার খুব বচসা চলছে। স্বভাবতই তারা যুদ্ধ নিয়েই কথা বলছে! অস্ট্রিয় ও রুশদের মধ্যে গোলমাল করে ফরাসিটা প্রমাণ করতে চাইছে যে রুশরা আত্মসমর্পণ করে উলম থেকে পালিয়ে গেছে, আর দলকভ বলছে যে রুশরা আত্মসমর্পণ করে নি, উপরন্তু ফরাসিদের হারিয়ে দিয়েছে।
দলকভ বলল, তোমাদের এখান থেকেও তাড়াবার হুকুম আমরা পেয়েছি, আর তোমাদের তাড়িয়ে দেবও।
ফরাসি গোলন্দাজটি বলল, তবে খেয়াল রেখো, কসাকসহ তোমরা সকলে না বন্দি হও!
ফরাসি শ্রোতা ও দর্শকরা হেসে উঠল।
দলকভ বলল, সুভরভের নেতৃত্বে যেমন করেছিলাম, তেমনি তোমাদের নাচিয়ে ছাড়ব।
জনৈক ফরাসি জিজ্ঞেস করল, ও আবার কি সুর ধরেছে?
সে হয়তো আগেকার কোনো যুদ্ধের কথা বলছে তাই মনে করে আর একজন বলল, সে তো প্রাচীন ইতিহাস। সম্রাট অন্যদের যেমন শিক্ষা দিয়েছেন তেমনি তোমাদের সুভরভকেও শিক্ষা দেবেন।
বোনাপার্ত… দলকভ কথাটা বলতেই ফরাসি লোকটি তাকে বাধা দিল।
বোনাপার্ত নয়। তিনি সম্রাট! পবিত্র নাম…। সে রেগে বলল।
শয়তান তোমার সম্রাটের ছাল ছাড়িয়ে নিক।
সৈনিকদের কড়া রুশ ভাষায় একটা খিস্তি করে দলকভ বন্দুক কাঁধে নিয়ে সরে গেল।
ক্যাপ্টেনকে বলল, আইভান লুকিচ, চলে এস।
