চারদিকে তারা দেখতে পেল, বৃষ্টিভেজা অফিসাররা ক্লান্ত মুখে কী যেন খুঁজে বেড়াচ্ছে, আর সৈন্যরা গ্রাম থেকে দরজা, বেঞ্চি ও বেড়া টেনে নিয়ে আসছে।
সৈন্যদের দেখিয়ে স্টাফ অফিসারটি বলল, ওই দেখুন প্রিন্স। ওই লোকগুলোকে আমরা থামাতে পারছি না। অফিসাররা তো ওদের কথা ভাবেই না। আর ওই যে, একটা খাবারওয়ালার তাঁবু দেখিয়ে সে বলল, ওখানেই সকলে ভিড় করে বসে আছে। আজ সকালেই সবগুলোকে বের করে দিয়েছিলাম, আর এখন দেখুন, আবার ভর্তি হয়ে গেছে। আমাকে একবার যেতেই হবে প্রিন্স, একটু বকুনি দিয়ে আসি। মোটেই সময় লাগবে না।
প্রিন্স আন্দ্রু এখনো কিছু খাবার সময় করে উঠতে পারেনি, সে বলল, হ্যাঁ, চলুন ভিতরে যাই, আমিও একটা রুটি ও কিছু পনির কিনব।
এ কথা আগে বলেননি কেন প্রিন্স? আমি আপনাকে কিছু খেতে দিতাম।
ঘোড়া থেকে নেমে তারা তাবুতে ঢুকল। কয়েকজন অফিসার লালচে ক্লান্ত মুখে টেবিলে বসে পান-ভোজন করছিল।
একই কথা বারবার বলার মতো ভঙ্গিতে তিরস্কারের সুরে স্টাফ-অফিসার বলল, আচ্ছা, এসবের অর্থ কী সাহেবরা? আপনারা জানেন, এভাবে ঘাঁটি ছেড়ে আসতে আপনারা পারেন না। প্রিন্স তো হুকুম জারি করেছেন যে কেউ তার ঘাটি ছাড়বে না। আর আপনি, কাপ্টেন?-একটি শুটকো, নোংরা, ছোটখাট গোলন্দাজ অফিসারের দিকে ফিরে সে বলল। অফিসারটির পায়ে বুট নেই, শুধু মোজা (বুট জোড়া খাবারওয়ালাকে দিয়েছে শুকোবার জন্য), তারা ঘরে ঢুকলে সে একটু হেসে কোনোরকমে উঠে দাঁড়াল।
স্টাফ-অফিসার বলতে লাগল, আচ্ছা, আপনার কি লজ্জা নেই ক্যাপ্টেন তুশিন? সকলেই মনে করে যে একজন গোলন্দাজ-অফিসার হিসেবে আপনি একটা সৎ দৃষ্টান্ত স্থাপন করবেন, অথচ বিনা বুটে আপনি এখানে এসেছেন। বিপদ-সংকেত বেজে উঠলেই তো বিনা জুতোয় আপনি খুব অসুবিধায় পড়ে যাবেন! (স্টাফ অফিসার হাসল) আরে সাহেবরা, আপনারা সবাই দয়া করে যার যার ঘাঁটিতে চলে যান! আদেশের সুরে সে কথা শেষ করল।
গোলন্দাজ অফিসার তুশিনের দিকে তাকিয়ে প্রিন্স আন্দ্রু হেসে ফেলল। নিঃশব্দে হাসতে হাসতে অফিসারট মোজাপরা এক পা থেকে অন্য পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে বড় বড় বুদ্ধিদীপ্ত দুটি চোখ মেলে সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে একবার প্রিন্স আন্দ্রুর দিকে, একবার স্টাফ-অফিসারের দিকে তাকাতে লাগল।
সৈনিকরা বলে, বুট ছাড়াই বেশি আরাম হয়, অসুবিধাজনক ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে ক্যাপ্টেন তুশিন সলজ্জ হাসির সঙ্গে বলল। তার ইচ্ছা ছিল কথায় একটু ঠাট্টার সুর আনে, কিন্তু কথা শেষ করার আগেই সে বুঝতে পারল যে তার পরিহাসকে কেউ মেনে নিচ্ছে না, আর তার কথায়ও সে সুরটি বাজেনি। সে কিছুটা বিব্রত বোধ করল।
নিজের গাম্ভীর্য বজায় রাখার চেষ্টা করে স্টাফ অফিসার বলল, দয়া করে যার যার ঘাঁটিতে ফিরে যান।
প্রিন্স আন্দ্রু আর একবার গোলন্দাজ-অফিসারটির ছোটখাট চেহারার দিকে তাকাল। চেহারাটা যেমন যেন অদ্ভুত, একজন সৈনিকের পক্ষে সম্পূর্ণ বেমানান, বরং কিছুটা ভাড়ের মতো। অথচ অত্যন্ত আকর্ষণীয়।
স্টাফ অফিসার ও প্রিন্স আন্দ্রু ঘোড়ায় চেপে এগিয়ে চলল।
গ্রাম ছাড়িয়ে বিভিন্ন রেজিমেন্টের সৈনিক ও অফিসারদের সঙ্গে দেখা করে তাদের ছেড়ে আরো এগিয়ে তারা এক জায়গায় দেখতে পেল, বাঁদিকে একটা খাদ কাটা হচ্ছে আর তার থেকে যে নতুন কাটা মাটি ফেলা হচ্ছে সেটা দেখতে লাল। ঠাণ্ডা বাতাস সত্ত্বেও কয়েক ব্যাটেলিয়ন সৈন্য শার্ট গায়ে দিয়ে সেই মাটির বাঁধের উপর সাদা পিঁপড়ের মতো ভিড় করে আছে, বাঁধের পিছন থেকে কতকগুলি অদৃশ্য হাত অনবরত কোদাল ভর্তি করে লাল কাদা উপরে ছুঁড়ে ফেলছে। প্রিন্স আল্লু আর অফিসারটি ঘোড়া নিয়ে এগিয়ে খাদগুলো দেখে আবার চলতে লাগল। ঠিক তার পিছনেই তারা দেখতে পেল কয়েক ডজন সৈন্য অবিরাম দলের পর দল খাদ থেকে ছুটে এসে সেখানে হাজির হচ্ছে। এইসব পায়খানার বিষাক্ত আবহাওয়ার হাত থেকে পালিয়ে বাঁচার জন্য তারা দুজন নাক চেপে ধরে ঘোড়া ছুটিয়ে দিল।
স্টাফ অফিসার ফরাসিতে বলল, শিবির-জীবনের এও একটা সুখ প্রিন্স।
বিপরীত দিকের পাহাড় বেয়ে তারা উঠতে লাগল। সেখান থেকে ফরাসিদের বেশ দেখা যায়। প্রিন্স আন্দ্রু একটু থেমে জায়গাটা ভালো করে দেখতে লাগল।
সব চাইতে উঁচু জায়গাটা দেখিয়ে স্টাফ-অফিসার বলল, ওই আমাদের কামান। এগুলো সেই বুটহীন অদ্ভুত লোকটির অধীন। ওখান থেকে আপনি সবকিছু দেখতে পাবেন। চলুন প্রিন্স, ওখানে যাওয়া যাক।
স্টাফ অফিসারের সঙ্গ এড়াবার জন্য প্রিন্স বলল, আপনাকে অনেক ধন্যবাদ, আমি একাই যাব। দয়া করে আপনি আর কষ্ট করবেন না।
স্টাফ অফিসার সেখানেই থেকে গেল, প্রিন্স আলু একাই এগিয়ে গেল।
যে যত শত্রুর দিকে এগিয়ে যেতে লাগল, সৈন্যরা ততই সুশৃঙখল আর খুশি হয়ে উঠতে লাগল। ফরাসি বাহিনীর কাছ থেকে সাত মাইল দূরে অবস্থিত জনাইম রোডে আজ সকালে সে যখন মালবাহী গাড়িগুলিকে পার হয়ে আসছিল তখন সেখানেই দেখেছিল সর্বাধিক বিশৃঙ্খল ও অবসাদ। গ্রন্থেও কিছুটা আতঙ্ক ও বিপদের শংকা বোঝা গিয়েছিল, কিন্তু প্রিন্স যতই ফরাসি বাহিনীর দিকে এগোতে লাগল, আমাদের সৈন্যদের মনে ততই আত্মবিশ্বাস জাগতে লাগল। গ্রেট-কোট পরিহিত সৈন্যরা সব সার দিয়ে দাঁড়াল, সার্জেন্ট-মেজর ও কোম্পানি অফিসাররা তাদের গুনতে লাগল, প্রতিটি দলের শেষ সৈনিকটির পাঁজড়ে খোঁচা মেরে তাকে হাত তুলতে বলল। ইতস্তত ছড়িয়ে পড়ে সৈন্যরা কাঠের গুঁড়ি ও ঝোঁপ-জঙ্গল টেনে এনে হাসিমুখে গল্পগুজব করতে করতে ছাউনি ফেলছে, কেউ-বা আগুনের পাশে বসে শার্ট ও পায়ের পটি শুকোচ্ছে আবার অনেকেই বয়লার ও পরিজ-কুকুরের পাশে জড়ো হয়ে বুট ও ওভারকোট মেরামত করছে। এক দলের ডিনার তৈরি হয়ে গেছে, সৈন্যরা সতৃষ্ণ নয়নে ধূমায়িত রান্নার দিকে তাকিয়ে অপেক্ষা করে আছে, কোয়ার্টার মাস্টার সার্জেন্ট একটা কাঠের বাটি হাতে নিয়ে চলেছে জনৈক অফিসারের কাছে, সে বসে আছে ছাউনির সামনে একটা কাঠের গুঁড়ির উপর, সে খাবারটা চেখে দেখবে তবে সেটা সৈন্যদের পরিবেশন করা হবে।
