কিছু বেশি সময় হাতে পাবার পক্ষে সিন্ধই কুতুজভের একমাত্র ভরসা। সময় পাওয়া গেলে ব্যাগ্রেশনের ক্লান্ত সৈনিকরা কিছুটা বিশ্রাম পাবে, আবার যানবাহনসহ যে বিরাট কনভয়টির অগ্রগতির খবর ফরাসিদের কাছ থেকে লুকিয়ে রাখা হয়েছিল তারাও অন্তত আরো কিছুটা বেশি পথ জনাইমের দিকে এগিয়ে যেতে পারবে। তাই সন্ধির প্রস্তাব তার কাছে এনে দিল বাহিনীটিকে বাঁচার একান্ত অপ্রত্যাশিত একমাত্র সুযোগ। সংবাদ পাওয়া মাত্রই সে সহযাত্রী অ্যাডজুটান্ট জেনারেল উত্তিজিনগেরোদকে পাঠাল শত্রুপক্ষের শিবিরে। উইজিনগেরোদ সন্দির প্রস্তাব তো মানবেই, উপরন্তু আত্মসমর্পণের শর্ত সম্পর্কেও একটা প্রস্তাব রাখবে। এদিকে কুতুজভ তার অ্যাডজুটান্টদের ফেরত পাঠিয়ে দিল, তারা যেন গোটা বাহিনীর মালপত্রবাহী গাড়িগুলোকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ক্রেমস-জনাইম রাস্তা ধরে ছুটিয়ে নিয়ে আসে। ব্যাগ্রেশনের যে ক্লান্ত, ক্ষুধার্ত সেনাদল ছিল গোটা বাহিনী ও যানবাহনের রক্ষায় নিযুক্ত শুধু তারাই আটগুণ বেশি শক্তিশালী শত্রুপক্ষের সামনে স্থির হয়ে অপেক্ষা করতে লাগল।
কুতুজভ আশা করেছিল, আত্মসমর্পণের প্রস্তাব (যেটা মোটেই বাধ্যতামূলক নয়) যানবাহনের একাংশকে আরো এগিয়ে যাবার সময় দেবে এবং মুরাতের ভুলটাও অচিরেই ধরা পড়বে। তার সে আশা সত্য প্রমাণিত হল। যে মুহূর্তে বোনাপার্ত (সে তখন ছিল হলোন থেকে ষোল মাইল দূরবর্তী শত্রুনে) সন্ধি ও আত্মসমর্পণের প্রস্তাবসহ মুরাতের চিঠি পেল তখনই সে ফন্দিটা ধরে ফেলল এবং মুরাতকে নিম্নমতো চিঠি লিখল :
শব্ৰুন, ২৬শে মেয়ার, ১৮০৫
সকাল আটটা।
প্রিয় মুরাত,
তোমার কাছে আমার অসন্তোষকে প্রকাশ করবার ভাষা খুঁজে পাচ্ছি না। তুমি তো শুধু আমার অগ্রবর্তী বাহিনীকে পরিচালনা করছ, কাজেই আমার হুকুম ছাড়া কোনো যুদ্ধ বিরতির ব্যবস্থা করার কোনো অধিকার তোমার নেই। তোমার জন্য আমি একটা গোটা অভিযানের ফলকে হারাতে বসেছি। অবলিম্বে যুদ্ধ বিরতি ভেঙে দাও এবং শত্রুর উপর ঝাঁপিয়ে পড়। তাকে জানিয়ে দাও, যে সনাপতি আত্মসমর্পণের চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে সে কাজ করার কোনো অধিকার তার নেই, এবং রাশিয়ার সম্রাট ছাড়া অন্য কারো সে অধিকার নেই।
অবশ্য রাশিয়ার সম্রাট যদিও চুক্তি সমর্থন করেন তাহলে আমি একটা সমর্থন করব, কিন্তু এটা একটা চালাকি মাত্র। এগিয়ে যাও, রুশ বাহিনীকে ধ্বংস কর…সে বাহিনীর মালপত্র ও গোলাবারুদ তো তোমার মুঠোর মধ্যে।
রুশ সম্রাটের এড-ডি-কং একটি জোচ্চোর। ক্ষমতাহীন অফিসাররা তো কিছুই নয়, এই অফিসারটির কোনো ক্ষমতাই ছিল না… ভিয়েনা সেতু পার হবার সময় অস্ট্রিয়ারা তোমাদের চালাকির হাতে ধরা দিয়েছিল, তুমিও ম্রাটের এড-ডি-কংয়ের চালাকির হাতে ধরা দিয়েছ।
নেপোলিয়ন।
এই ভয়ঙ্কর চিঠি নিয়ে নেপোলিয়নের অ্যাডজুটান্ট ঘোড়া ছুটিয়ে চলে গেল মুরাতের কাছে। পাছে তৈরি। শিকার হাতছাড়া হয়ে যায় এই ভয়ে সেনাপতিদের উপর ভরসা না করে রক্ষীবাহিনীকে সঙ্গে নিয়ে নেপোলিয়ন স্বয়ং চলল যুদ্ধক্ষেত্রে। আর ব্র্যাতশেনের চার হাজার সৈনিক মনের আনন্দে শিবিরে আগুন জ্বালাল, হাত পা গরম করে আরাম করল, তিন দিনের মধ্যে এই প্রথম পরিজ রান্না করল, অথচ তাদের একজনও জানল না বা কল্পনা করল না তাদের ভাগ্যে কী আছে।
*
অধ্যায়-১৫
কুতুজভের কাছে অনবরত অনুরোধ জানানোর পরে বিকেল তিনটে থেকে চারটের মধ্যে প্রিন্স আন্দ্রু গ্রুন্থে পৌঁছে ব্যাগ্রেশনের সঙ্গে দেখা করল। বোনাপার্তের অ্যাডজুটান্ট তখনো মুরাতের কাছে পৌঁছয় নি, আর যুদ্ধও শুরু হয় নি। ব্যাগ্রেশনের সেনাদলের কেউই প্রকৃত অবস্থার কোনো খবরই রাখে না। তারা মুখে শান্তির কথা বললেও শান্তি স্থঅপনের সম্ভাবনায় বিশ্বাস করে না, যারা যুদ্ধের কথা ভাবছে তারাও বিশ্বাস করে না যে অবিলম্বেই কোনো যুদ্ধবিগ্রহ শুরু হবে। ব্যাগ্রেশন জানে বলকনস্কি একজন প্রিয়পাত্র ও বিশ্বাসী অ্যাডজুটান্ট, তাকে সে বিশেষ মর্যাদা ও অনুগ্রহের সঙ্গে স্বাগত জানাল, বুঝিয়ে বলল যে সেইদিন অথবা তার পরদিনই একটা সংঘর্ষ হতে পারে, যুদ্ধকালে সে ইচ্ছা করলে তার সঙ্গেও থাকতে পারে, অথবা পশ্চাদ্বর্তী বাহিনীর সঙ্গে যোগ দিলে পশ্চাদপসরণকারীদের উপরেও নজর রাখতে পারে, আর সে কাজটাও খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
তারপরেই যেন প্রিন্স আন্দুকে নিশ্চিত করার জন্যই আর একবার বলল, অবশ্য আজই কোনো সংঘর্ষ হবার সম্ভাবনা খুবই কম।
ব্যাগ্রেশন মনে মনে ভাবল, সে যদি একজন সাধারণ ফুলবাবু অফিসারের মতো একটা মেডেল গলায় পরবার জন্য এখানে এসে থাকে তাহলে পশ্চাৎ রক্ষীবাহিনীতে থেকেও সে পুরস্কারটা বাগাতে পারবে, কিন্তু সে যদি আমার সঙ্গে থাকতে চায় তো থাকুক… একজন সাহসী অফিসার হলে সে এখানে অনেক কাজে লাগবে। প্রিন্স আন্দ্রু কোনো জবাব দিল না, শুধু চারদিকটা ঘুরে সেনাদলের অবস্থানটা একবার দেখে নেবার অনুমতি চাইল, যাতে যদি কখনো তাকে কোনো হুকুম তামিল করতে পাঠানো হয় তখন নিজের অবস্থাটা সে ভালোভাবে বুঝে নিতে পারে। কর্তব্যরত একজন অফিসার প্রিন্স আন্দুকে সবকিছু ঘুরিয়ে দেখানোর ভার নিল। অফিসারটি সুদর্শন ও সুসজ্জিত, অনামিকায় একটা হীরের আংটি আর ফরাসিতে কথা বলতে খুব ভালোবাসে, যদিও সে ভাষাটা খুব ভালো বলতে পারে না।
