সে বলল, সেইজন্যই তো সেই সেনাদলের সঙ্গে আমি যেতে চাইছি।
কুতুজভ জবাব দিল না। যেন কী বলছিল সেটা ভুলে গিয়ে সে চিন্তায় ডুবে বসে রইল। পাঁচ মিনিট পরে গাড়ির নরম স্প্রিংয়ে দুলতে দুলতে সে প্রিন্স আন্দ্রুর দিকে মুখ ফেরাল। তার মুখে উত্তেজনার চিহ্নমাত্র নেই। সূক্ষ্ম ব্যঙ্গের সুরে সে প্রিন্স আন্দ্রুকে জিজ্ঞাসা করতে লাগল সম্রাটের সঙ্গে তার সাক্ষাৎকারের বিস্তারিত বিবরণের কথা, ক্রেমসের ব্যাপার সম্পর্কে রাজদরবারে যে-সব মন্তব্য শুনেছে তার কথা এবং উভয়ের পরিচিত কিছু মহিলার কথা।
*
অধ্যায়-১৪
১ নভেম্বর কুতুজভ একটি গুপ্তচর মারফত খবর পেল যে তার অধীনস্থ বাহিনী অত্যন্ত শোচনীয় অবস্থায় পড়েছে। গুপ্তচরটি জানিয়েছে, রাশিয়া থেকে যে বাহিনী এগিয়ে আসছে তার ও কুতুজভের বাহিনীর যোগাযোগ ব্যবস্থার দিকে ফরাসি বাহিনী ভিয়েনার সেতু পার হয়ে প্রচণ্ড বেগে ছুটে আসছে। এরপরেও যদি কুতুজভ ক্রেমসে থেকে যায় তাহলে নেপোলিয়নের এক লক্ষ পঞ্চাশ হাজার সৈন্যের বাহিনী এসে তাকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে ফেলবে, তার চল্লিশ হাজার সৈন্যের বাহিনীকে ঘিরে ফেলবে, এবং তারও অবস্থা হবে উলমে ম্যাকের মতো। কুতুজভ যদি স্থির করে থাকে যে রাশিয়া থেকে আগত সৈন্যদলের সঙ্গে তার যোগাযোগরক্ষাকারী রাস্তাটা সে পরিত্যাগ করবে, তাহলে তাকে যাত্রা করতে হবে বোহেমির পর্বতমালার এমন অজ্ঞাত অঞ্চলে যেখানে কোনো পথ নেই, পদে পদে তাকে আত্মরক্ষা করতে চলতে হবে শত্রুপক্ষের অধিকতর শক্তিশালী সেনাদলের সঙ্গে সংগ্রাম করে, এবং বাক্সহোডেনের সঙ্গে মিলিত হবার সব আশা ছেড়ে দিয়ে। আর কুতুজভ যদি স্থির করে যে, ক্রেমস থেকে অলমুজ যাবার পথ ধরে পশ্চাদপসরণ করবে, রাশিয়া থেকে আগত সৈন্যদলের সঙ্গে মিলিত হবে, তাহলে তাকে মস্ত বড় ঝুঁকি নিতে হবে, ভিয়েনা সেতু পার হয়ে ধেয়ে আসা ফরাসি বাহিনী তার আগেই সে পথে হানা দেবে, তার নিজের মালপত্র ও যানবাহনেই তো সেপথ আটকে আছে, যাত্রাপথেই তার চাইতে তিনগুণ অধিক শক্তিশালী শত্রুর সঙ্গে তাকে যুদ্ধে নামতে হবে, আর তারা দুদিক থেকে তাকে চেপে ধরবে।
কুতুজভ শেষের পথটাই বেছে নিল।
গুপ্তচর সংবাদ দিয়েছে, ফরাসি বাহিনী ভিয়েনা সেতু পার হয়ে জোর কদমে এগিয়ে চলেছে জনাইমের দিকে, কুতুজভের পশ্চাদপসরণের পথ থেকে সেটা শ-খানেক ভা দূরে অবস্থিত। সে যদি ফরাসিদের আগেই জনাইম পৌঁছতে পারে তাহলে বাহিনীটির বাঁচার যথেষ্ট আশা থাকবে, কিন্তু ফরাসি বাহিনী তার আগে সেখানে পৌঁছনো মানেই হয় গোটা বাহিনীকেই উলমের মতো অসম্মান ভোগ করতে হবে, আর না হয়তো সম্পূর্ণ ধ্বংস হতে হবে। কিন্তু ফরাসিদের আগে সসৈন্যে সেখানে পৌঁছনো অসম্ভব। ক্রেমস থেকে জনাইম পর্যন্ত রাশিয়ানদের যে রাস্তা সেটার তুলনায় ফরাসিদের ভিয়েনা থেকে জনাইম পর্যন্ত যাবার রাস্তা অনেক সংক্ষিপ্ত ও ভালো।
খবরটা পাবার পরে সেই রাতেই কুতুজভ চার হাজার সৈন্য নিয়ে গড়া ব্যাগ্রেশনের অগ্রবর্তী বাহিনীকে পাঠিয়ে দিল পাহাড় ডিঙিয়ে ক্রেমস জনাইম থেকে ভিয়েনা জনাইম পথের দিকে। কোনোরকম বিশ্রাম না নিয়ে ব্যাগ্রেশনকে মার্চ করে এগিয়ে যেতে হবে, এবং জনাইমকে পিছনে রেখে ভিয়েনার দিকে মুখ করে থামতে হবে। এইভাবে সে যদি ফরাসিদের আগে পৌঁছতে পারে তাহলে যত বেশি সম্ভব তাদের সেখানে আটকে রাখবে। আর কুতুজভ স্বয়ং সব যানবাহন সঙ্গে নিয়ে জনাইমের পথ ধরবে।
ছেঁড়া জুতো পরা ক্ষুধার্ত সৈনদের নিয়ে সেই ঝড়ের রাতে পথহীন পাহাড় ডিঙিয়ে ত্রিশ মাইল পথ চলতে গিয়ে এক তৃতীয়াংশ সৈনকে পথেই ফেলে রেখে ব্যাগ্রেশন ভিয়েনা জনাইম পথেল হলোব্রুনে পৌঁছল ফরাসি বাহিনীর মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে, তারাও তখন ভিয়েনা থেকে হলোব্রুনের দিকেই এগিয়ে আসছে। যানবহানসহ আরো কয়েকদিনের পথ চললে তবে কুতুজভ ভিয়েনায় পৌঁছতে পারবে। কাজেই শত্রুসৈন্য হলোব্রুনে পৌঁছার পরে চার হাজার ক্ষুধার্ত, ক্লান্ত সৈন্য নিয়ে ব্যাগ্রেশনের কাজ হবে দিনের পর দিন তাদের আটকে রাখা, আর সে কাজটা একান্তই অসম্ভব। কিন্তু ভাগ্যের খেয়ালে সেই অসম্ভবই সম্ভব হল। যে চালাকির সফলতার ফলে ফরাসিরা বিনা যুদ্ধে ভিয়েনা সেতুকে হাতের মুঠোয় পেয়েছিল, মুরাৎ সেই একই চালাকির দ্বারা কুতুজভকে ঠকাতে চেষ্টা করল। ব্যাগ্রেশনের দুর্বল সেনাদলকে জনাইম রাস্তায় দেখে মুরাত সেটাকে কুতুজভের গোটা বাহিনী বলে ধরে নিল। তাই সেই সেনাদলকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করার আশায় তার বাকি যে সৈন্যরা ভিয়েনা থেকে আসছিল তাদের জন্য সে অপেক্ষা করতে লাগল, আর সেই উদ্দেশ্যে এই শর্তে একটা তিন দিনের সন্ধির প্রস্তাব করল যে উভয় পক্ষের সৈন্যরাই যে যেখানে আছে সেখান থেকে নড়বে না। মুরাৎ জানাল, শান্তি স্থাপনের আলোচনা শুরু হয়ে গেছে, আর তাই অকারণ রক্তপাত বন্ধ করার জন্যই সে এই সন্ধির প্রস্তাব করছে। অগ্রবর্তী ঘাঁটিতে মোতায়েন অস্ট্রীয় সেনাপতি কাউন্ট নস্টিজ মুরাতের দূতের এই কথায় বিশ্বাস করে ব্যাগ্রেশনের সেনাদলকে অরক্ষিত রেখে রণক্ষেত্র থেকে বিদায় নিল। আর একটি দূত গেল রুশ সেনাদের কাছে শান্তি আলোচনার কথা জানিয়ে তিন দিনের সন্ধির প্রস্তাব করতে। ব্যাগ্রেশন জবাব দিল, সন্ধির প্রস্তাব স্বীকার করার অথবা বাতিল করার ক্ষমতা তার নেই, কাজেই প্রস্তাবটি কুতুজভের কাছে পেশ করার জন্য সে একজন অ্যাডজুটান্টকে পাঠিয়ে দিল।
