আমাদের রাত কাটাতে হবে জনাইমে।
নেসভিৎস্কি বলল, দেখ, আমার দরকারী জিনিসপত্র সব দুটো ঘোড়ার মতো করে প্যাক করা হয়েছে। খুব ভালোভাবে প্যাক করেছে–তা নিয়ে বোহেমিয় পর্বতমালাও পার হয়ে যাওয়া যাবে। অবস্থা বড়ই খারাপ হে বাপু। কিন্তু তোমার কি হল? এমন কাপছ কেন অসুস্থ লোকের মতো? প্রিন্স আন্দুকে বিদ্যুৎস্পৃষ্ঠের মতো কাঁপতে দেখে সে বলল।
ও কিছু না, প্রিন্স আন্দ্রু জবাব দিল।
ডাক্তারের স্ত্রী ও কনভয়-অফিসারের ঘটনাটা হঠাৎ তার মনে পড়ে গিয়েছিল। প্রধান সেনাপতি এখানে কি করছেন? সে শুধাল। আমি কিছুই বুঝতে পারছি না, নেসভিৎস্কি বলল।
দেখ, আমি কিন্তু বুঝতে পারছি যে সবকিছুই ন্যাক্কারজনক, ন্যাক্কারজনক, অত্যন্ত ন্যাক্কারজনক! এই কথা বলে প্রিন্স আন্দ্রু প্রধানমন্ত্রী যে বাড়িতে আছে সেইদিকে এগিয়ে গেল।
কুতুজভের গাড়ি ও ক্লান্ত ঘোড়াগুলিকে পাশ কাটিয়ে সে এগিয়ে চলল। ঘোড়র কসাকরা জোর গলায় কথাবার্তা বলছে। সে বারান্দায় উঠল। সে শুনেছে, প্রিন্স ব্যাগ্রেশন ও ওয়েরদারসহ কুতুজভ স্বয়ং এখানেই আছে। ওয়েরদার অস্ট্রিয় সেনপতি শমিডির স্থলাভিষিক্ত হয়েছে। বারান্দায় ছোট্ট কজলভস্কি জনৈক করণিকের সামনে হাঁটু ভেঙে বসে আছে। একটা টবকে উল্টো করে পেতে তার উপর কাগজ রেখে করণিকটি হাতের আস্তিন গুটিয়ে তাড়াতাড়ি কি যেন লিখছে। কজলভস্কির মুখটাও শুকনো দেখাচ্ছে–স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে সেও সারারাত ঘুমোয় নি। সে প্রিন্স আন্দ্রুর দিকে তাকাল, কিন্তু মাথাটাও, নাড়ল না।
দ্বিতীয় ব্যূহ…লিখেছ? সে করণিককে বলল। কিয়েফ পদাতিক সৈন্যগণ, পোদোলিয়ান…।
এত তাড়াতাড়ি কেউ লিখতে পারে না, ইয়োর অনার, ক্রুদ্ধ অশ্রদ্ধার দৃষ্টিতে কজলভস্কির দিকে তাকিয়ে করণিক বলল।
দরজা দিয়ে শোনা গেল কুতুজভের উত্তেজিত, অসন্তুষ্ট গলা; একটি অপরিচিত গলা তাকে বাধা দিচ্ছে। এইসব কণ্ঠস্বর, উদাসীনভাবে কজলভস্কির তার দিকে তাকানো, ক্লান্ত করণিকটির অশ্রদ্ধার ভাব, প্রধান সেনাপতির এত কাছে করণিক ও কজলভস্কির একটা টবের পাশে বসে থাকা, জানালার কাছেই ঘোড়াগুলোকে ধরে কসাকদের জোরে জোরে হাসা–এসব কিছু দেখে শুনে প্রিন্স আন্দ্রুর মনে হল একটা গুরুতর রকমের বিপজ্জনক কিছু ঘটতে চলেছে।
কজলভস্কির দিকে ফিরে সে জরুরি প্রশ্ন করতে লাগল।
কজলভস্কি বলল, এই মুহূর্তেই প্রিন্স ব্যাগ্রেশনকে নিয়োগ করা হচ্ছে।
সন্ধির খবর কি?
সেরকম কিছুই হয় নি। যুদ্ধের হুকুমই তো ঘোষণা করা হচ্ছে।
যেখানে থেকে কথা শোনা যাচ্ছিল প্রিন্স আন্দ্রু সেই দরজার দিকে এগিয়ে গেল। দরজাটা খুলতে যাবে এমন সময় শব্দ থেমে গেল, দরজাটা খুলে গেল, আর ঈগল পাখির মতো নাক ও ফোলা মুখ নিয়ে কুতুজভ দ্বারপথে দেখা দিল। প্রিন্স আন্দ্রু কুতুজভের একেবারে সম্মুখে দাঁড়িয়ে, কিন্তু প্রধান সেনাপতির একটি ভালো চোখের দৃষ্টি দেখেই মনে হল, চিন্তা ও উৎকণ্ঠার মধ্যে সে এতই ডুবে আছে যে তার উপস্থিতিটাই সম্পূর্ণ ভুলে গেছে। নিজের অ্যাডজুটান্টের মুখের দিকে সোজা তাকিয়েও সে তাকে চিনতে পারে নি।
জলভস্কিকে বলল, আচ্ছা, তুমি শেষ করেছ?
আর একটু সময়, ইয়োর এক্সেলেন্সি।
প্রধান সেনাপতির পিছনেই বেরিয়ে এল ব্যাগ্রেশন; মাঝারি উচ্চতার শক্তপোক্ত মধ্যবয়স্ক মানুষ, প্রাচ্যসুলভ কঠিন, গম্ভীর মুখ।
কুতুজভের হাতে একটা খাম এগিয়ে প্রিন্স আন্দ্রু একটু জোরেই আর একবার বলল, আমি আপনার সম্মুখে উপস্থিত হয়েছি।
ওঃ, ভিয়েনা থেকে খুব ভালো। পরে, পরে!
ব্যাগ্রেশনকে নিয়ে কুতুজভ ফটকের দিকে এগিয়ে গেল।
আচ্ছা, তাহলে বিদায় প্রিন্স, সে ব্যাগ্রেশনকে বলল। তোমার এই মহৎ প্রচেষ্টায় রইল আমার আশীর্বাদ খৃষ্ট তোমার সহায় হোন!
হঠাৎ তার মুখটা নরম হয়ে গেল, চোখ জলে ভরে উঠল। বাঁ হাতে ব্যাগ্রেশনকে কাছে টেনে এনে আংটি পরা ডান হাতে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে তার মাথার উপর ক্রুশ-চিহ্ন এঁকে ফোলা-ফোলা গালটা তার দিকে এগিয়ে দিল, কিন্তু ব্যাগ্রেশন চুমো খেল তার গলায়।
খৃস্ট তোমার সহায় হোন! কথাটা আর একবার বলে কুতুজভ তার গাড়ির দিকে এগিয়ে গেল। বলকনস্কিকে বলল, আমার সঙ্গে গাড়িতে উঠে পড়।
ইয়োর এক্সেলেন্সি, আমি এখানেই কাজ করতে চাই। আমাকে প্রিন্স ব্যাগ্রেশনের সেনাদলের সঙ্গে থাকবার অনুমতি দিন।
উঠে পড়ো, কুতুজভ বলল, তবু বলকনস্কি দেরি করছে দেখে সে বলল, আমি নিজেও ভালো অফিসার চাই, নিজের জন্যই চাই!
দুজন গাড়িতে উঠল। কয়েক মিনিট নিঃশব্দেই চলতে লাগল।
যেন একটি বৃদ্ধের সহজ বুদ্ধিতে বলকনস্কির মনের অবস্থা বুঝতে পেরে সে বলল, আমাদের সামনে এখনো অনেক কিছু আছে। তারপর যেন নিজেকেই বলছে এমনিভাবে বলে উঠল, তার সেনাদলের দশ ভাগের একভাগও যদি ফিরে আসে তো আমি ঈশ্বরকে ধন্যবাদ জানাব।
মাত্র এক ফুট দূর থেকে প্রিন্স আন্দ্রু কুতুজভের মুখের দিকে তাকাল, তার কপালের যেখানটায় একটা বুলেট ঢুকে খুলি ভেদ করে চলে গিয়েছিল সেই জায়গায় সযত্নে থোয়া সেলাইয়ের ক্ষত-চিহ্ন এবং তার চোখের শূন্য কোটরের দিকে আপনাথেকেই প্রিন্স আন্দ্রুর দৃষ্টি পড়ল। সে ভাবল, হ্যাঁ, মানুষের মৃত্যুর কথা এত সহজে বলার অধিকার তার আছে।
