বিলিবিনের কথাগুলি মনে পড়ায় বলকনস্কি ভাবল, এই তো আমাদের আদরের গোঁড়া রুশ বাহিনী।
প্রধান সেনাপতিকে খুঁজে বের করার আশায় সে একটা কনভয়ের কাছে গিয়ে হাজির হল। ঠিক তার উল্টো দিক থেকে একটা অদ্ভুত-দর্শন একঘোড়ায় টানা গাড়ি এল। হাতের কাছে মাল-মশলা যা পাওয়া গেছে তাই দিয়েই সৈনিকরা গাড়িটা বানিয়েছে বলে মনে হয়। একটি সৈনিক গাড়িটা চালাচ্ছে, আর গাড়ির কামড়ার · ছইয়ের নিচে শালে গা মুড়ে বসে আছে একটি স্ত্রীলোক। প্রিন্স আন্দ্রু এগিয়ে এসে একটি সৈনিকের কাছে খোঁজ নিতে যাবে এমন সময় সেই গাড়ির ভিতর থেকে স্ত্রীলোকটির তীব্র চিৎকার তার কানে এল। সেই গাড়িটা অন্য সকলকে ছড়িয়ে এগিয়ে যাবার চেষ্টা করায় যানবাহনের ভারপ্রাপ্ত একজন অফিসার গাড়ির চালককে মারছে; তার চাবুকের ঘা গিয়ে পড়ছে স্ত্রীলোকটির এপ্রনের উপর। স্ত্রীলোকটি মর্মভেদী আর্তনাদ করছে। প্রিন্স আন্দ্রুকে দেখে স্ত্রীলোকটি এপ্রনের ভিতর থেকে ঝুঁকে মুখ বের করে গরম শালের নিচে থেকে সরু সরু হাত নেড়ে চেঁচিয়ে বলল :
মি. এড-ডি-কং! এড-ডি-কং!…ঈশ্বরের দোহাই…আমাকে বাঁচান। আমাদের কি হবে? আমি সপ্তম…ডাক্তারের স্ত্রী। এরা আমাদের এগিয়ে যেতে দিচ্ছে না, আমরা পিছনে পড়ে গেছি, আমাদের লোকজনদের হারিয়ে ফেলেছি…।
ক্রুদ্ধ অফিসার সৈনিকটিকে বলছে, পিটিয়ে তোমাকে তক্তা বানিয়ে দেব! ভাঙা গাড়ি নিয়ে পিছিয়ে যাও!
ডাক্তারের স্ত্রী আর্তকণ্ঠে বলল, মি. এড-ডি-কং! আমাকে সাহায্য করুন!…এসবের অর্থ কি?
প্রিন্স আন্দ্রু অফিসারটির কাছে গিয়ে বলল, দয়া করে এই গাড়িটাকে যেতে দিন। দেখছেন না স্ত্রীলোক রয়েছে?
অফিসার তার দিকে তাকাল; কথার জবাব না দিয়ে আবার সৈনিকটির দিকে মুখ ফেরাল। এগিয়ে আসার শিক্ষা তোমাকে দেব।…পিছিয়ে যাও।
ঠোঁট ঠোঁট চেপে প্রিন্স আন্দ্রু আবার বলল, ওদের যেতে দিন। আমি বলছি!
রেগে লাল হয়ে অফিসার তার দিকে ফিরে চেঁচিয়ে বলল, আপনি কে? আপনি কি এখানকার কমান্ডার? অ্যাঁ? এখানে আমি কমান্ডার, আপনি নন! পিছিয়ে যাও, নইলে পিটিয়ে তোমাকে তক্তা করে দেব, সে আবারও বলল। এই কথাগুলি তার খুব মনের মতো।
পিছন থেকে কে যেন বলে উঠল, খোকা এড-ডি-কংকে খুব রগড়ে দিয়েছেন।
প্রিন্স আন্দ্রু বুঝতে পারল, অফিসারটি রাগে এতই বেঁহুশ হয়ে পড়েছে যে কি বলছে তার অর্থও বুঝতে পারছে না। সে আরো বুঝতে পারল, ঐ অদ্ভুত গাড়ির আরোহিণী ডাক্তারের স্ত্রীর পক্ষ সমর্থন করলে তাকে এমন একটা অবস্থায় পড়তে হবে যাবে সে পৃথিবীতে সবচাইতে বেশি ভয় করে–অর্থাৎ উপহাস; তবু অন্তরের প্রেরণা তাকে সম্মুখে ঠেলে দিল। অফিসারের কথা শেষ হবার আগেই প্রিন্স আন্দ্রু রাগে ফুলতে ফুলতে ঘোড়া ছুটিয়ে তার কাছে এগিয়ে গিয়ে হাতের চাবুকটা তুলল।
দয়া–করে ওদের–যেতে দিন?
অফিসার হাত তুলে দ্রুত ঘোড়া ছুটিয়ে দিল।
স্টাফের এইসব লোকদের জন্যই যতসব ঝামেলা দেখা দেয়, সে বিড় বিড় করে বলল। যা ইচ্ছা করুন।
প্রিন্স আন্দ্রুও চোখ না তুলেই ঘোড়া ছুটিয়ে দিল। ডাক্তারের স্ত্রী পিছন থেকে তাকে রক্ষাকর্তা বলে কৃতজ্ঞতা জানাতে লাগল; কিন্তু সে তাতে কান দিল না। এই অবমাননাকর দৃশ্যটির কথা মনে করে তীব্র বিতৃষ্ণায় সে গ্রামের দিকে ঘোড়া ছুটিয়ে দিল; তাকে বলা হয়েছে, প্রধান সেনাপতি সেখানেই আছে।
গ্রামে পৌঁছে ঘোড়া থেকে নেমে সে সবচাইতে কাছের বাড়িটাতে ঢুকল। মনের ইচ্ছা, কিছু সময় বিশ্রাম নেবে, কিছু খাবে এবং যেসব হুল ফোঁটানো যন্ত্রণাদায়ক চিন্তা তাকে বিচলিত করে তুলেছিল তাকে কিছুটা শান্ত করে নেবে। প্রথম বাড়িটার জানালার দিকে যেতে যেতে সে ভাবল, এ তো সেনাদল নয়, এটা পাজির দঙ্গল, এমন সময় পরিচিত গলায় কে যেন তার নাম ধরে ডাক দিল।
সে ঘুরে দাঁড়াল। ছোট জানলাটা দিয়ে নেসভিৎস্কির সুন্দর মুখখানি দেখা দিল। যেন কিছু চিবুচ্ছে এমনিভাবে ভেজা ঠোঁট দুটো নাড়তে নাড়তে হাত ঘুরিয়ে নেসভিকি তাকে ভিতরে ঢুকতে বলল।
বলকনস্কি! বলকনস্কি!…শুনতে পাচ্ছ না? এই তাড়াতাড়ি এস!… সে চেঁচাতে লাগল।
ঘরে ঢুকে প্রিন্স আন্দ্রু দেখল, নেসভিৎস্কি ও অপর একটি অ্যাডজুটান্ট কি যেন খাচ্ছে। তাড়াতাড়ি তার দিকে ঘুরে জানতে চাইল, কোনো খবর আছে কি না। তাদের চোখে-মুখে সে যেন উত্তেজনা ও আতংকের চিহ্ন দেখতে পেল। নেসভিৎস্কির স্বভাবত হাসিখুশি মুখে সেটা যেন আরো স্পষ্ট হয়ে দেখা দিল।
প্রধান সেনাপতি কোথায়? বলকনস্কি শুধাল।
এই তো, ঐ বাড়িটাতে, অ্যাডজুটান্ট জবাব দিল।
আচ্ছা, এটা কি সত্যি যে শান্তি ও সন্ধি স্থাপিত হতে চলেছে? নেসভিৎস্কি শুধাল।
আমিই তো তোমাকে জিজ্ঞাসা করতে চাইছি। আমি যে কোনোরকমে এখানে এসে পৌঁছেছি, এর বেশি কিছুই আমি জানি না।
আর আমরা! আরে বাবা, সে তো ভয়ংকর ব্যাপার! ম্যাককে দেখে হেসে খুব ভুল করেছিলাম, আমাদের অবস্থা আরো খারাপ, নেসভিৎস্কি বলল, কিন্তু আগে এখানে বস, কিছু খেয়ে নাও।
অ্যাডজুটান্টটি বলল, এখন আপনার মালপত্র বা অন্য কোনো কিছুই পাবেন না প্রিন্স। আর আপনার চাকর পিটার যে কোথায় তা এক ঈশ্বর জানেন।
হেড-কোয়ার্টার এখন কোথায়?
