প্রিন্স আর চোখের সামনে স্পষ্টভাবে ভাসতে লাগল ধূসর ওভারকোট, আঘাত, বারুদের ধোয়া, কামানের গর্জন, তার তার আসন্ন গৌরবের দৃশ্য।
সে বলল, এটা বিশ্বাসঘাতকতাও হতে পারে।
বিলিবিন জবাব দিল, তাও নয়। তাতে যে রাজপরিবারের গায়ে বড় বেশি খারাপ আলো পড়ে। এটা বিশ্বাসঘাতকতা নয়, পেজোমি নয়, বোকামিও নয়; এটা ঠিক উলমে যা ঘটেছিল…এটা…-সে একটা সঠিক ভাষা খুঁজতে চেষ্টা করল। এটা…এটা…খানিকটা ম্যাকের মতো।…আমরা ম্যাকায়িত হয়েছি। একটা অলংকারসম্মত ভালো শব্দ প্রয়োগ করা হয়েছে ভেবে সে কথা শেষ করল। খুশিতে তার কপালের ভাঁজগুলি মিলিয়ে গেল; ঈষৎ হেসে সে নিজের নখগুলি পরীক্ষা করতে শুরু করে দিল।
হঠাৎ প্রিন্স আন্দ্রু উঠে তার ঘরের দিকে পা বাড়াল। তা দেখে সে বলল, তুমি কোথায় চললে? আমি চলে যাচ্ছি।
কোথায়?
সেনাবাহিনীতে।
কিন্তু তোমার তো আরো দুটো দিন থাকার কথা ছিল?
কিন্তু আমি এখনই চলে যাচ্ছি।
ফিরে যাবার নির্দেশাদি দিয়ে প্রিন্স আন্দ্রু তার ঘরে চলে গেল।
তাকে অনুসরণ করে বিলিবিন বলল, তুমি কি জান প্রিয় বন্ধু যে আমি তোমার কথাই ভাবছিলাম। কেন তুমি চলে যাচ্ছ?
তার কথার চূড়ান্ত প্রমাণস্বরূপ তার মুখ থেকে সবগুলো ভাজ নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল।
প্রিন্স আন্দ্রু সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে তার দিকে তাকাল; কোনো জবাব দিল না।
তুমি কেন যাচ্ছ? আমি জানি, যেহেতু তোমার সেনাদল এখন বিপন্ন তাই ঘোড়া ছুটিয়ে সেখানে ফিরে যাওয়াটাকে তুমি তোমার কর্তব্য বলে মনে কর। সেটা আমি বুঝি। প্রিয় বন্ধু, এই তো বীরত্ব!
মোটেই না, প্রিন্স আন্দ্রু বলল।
কিন্তু তুমি একজন দার্শনিক, আগাগোড়া তাই থাক, সমস্যাটার অন্য দিকটাও দেখ; তাহলেই দেখতে পাবে যে তোমার কর্তব্য হচ্ছে নিজের কথা ভাবা। যারা আর কোনো কাজের উপযুক্ত নয়, সব তাদের হাতে ছেড়ে দাও।…তোমার তো ফিরে যাবার হুকুম দেওয়া হয় নি, আর এখান থেকেও ছুটি দেওয়া হয় নি; সুতরাং তুমি এখানেই থাকতে পার, আর দুর্ভাগ্য আমাদের যেখানে নিয়ে যাবে, আমাদের সঙ্গে সেখানেই যেতে পার। ওরা বলছে, আমরা অলমুজে যাচ্ছি; অলমুজ খুব সুন্দর শহর। তুমি আর আমি আমার গাড়িতে আরাম করে । যাব।
দয়া করে ঠাট্টা থামাও বিলিবিন, কলকনস্কি চিৎকার করে উঠল।
বন্ধুর মতো আন্তরিকভাবেই আমি কথা বলছি। ভেবে দেখ! তুমি যখন এখানেই থাকতে পার, তুমি কেন চলে যাচ্ছ? কোথায় যাচ্ছ? দুটোর যে কোনো একটা পথ তোমার সামনে খোলা আছে, তার বাদিকের কপালে আবার ভাজ পড়ল, হয় সন্ধি হবার আগে তুমি তোমার রেজিমেন্ট পৌঁছতে পারবে না, অথবা কুতুজভের গোটা বাহিনীর সঙ্গে পরাজয় ও অসম্মান বরণ করবে।
এ উভয়-সংকটের কোনো সমাধান নেই বুঝতে পেরে বিলিবিনের কপালের ভাজগুলো আবার মুছে গেল।
প্রিন্স আন্দু ঠাণ্ডা গলায় বলল, এ নিয়ে আমি তর্ক করতে চাই না; কিন্তু মনে মনে বলল, কিন্তু সেনাদলকে বাঁচাতে আমি যাবই।
প্রিয় বন্ধু, তুমি সত্যি বীর! বিলিবিন বলল।
*
অধ্যায়-১৩
সেই রাতেই যুদ্ধমন্ত্রীর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বলকনস্কি সেনাদলের সঙ্গে যোগাড় দিতে যাত্রা করল; অবশ্য সে জানে না কোথায় তাদের সঙ্গে দেখা হবে; আর মনেও ভয় আছে যে ক্রেমসের পথে ফরাসিদের হাতে সে বন্দি হতেও পারে।
ব্রুনে দরবারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সকলেই জিনিসপত্র বাধাদা করতে ব্যস্ত; ইতিমধ্যেই বড় বড় মালগুলি অলমুজে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। হেজেলডফের কাছে প্রিন্স আন্দ্রু বড় রাস্তায় পড়ল। রুশ বাহিনীও সেই পথেই চলেছে অত্যন্ত দ্রুতগতিতে আর অত্যন্ত বিশৃঙ্খলভাবে। রাস্তাটা মালগাড়িতে এতই বোঝাই হয়ে গেছে যে গাড়ি চেপে এগিয়ে যাওয়া অসম্ভব। জনৈক কসাক কমান্ডারের কাছ থেকে একজন কসাক ও একটা ঘোড়া নিয়ে প্রিন্স আন্দ্রু মালগাড়িগুলিকে পাশ কাটিয়ে এগিয়ে চলল। ক্ষুধার্ত ও শ্রান্ত অবস্থায় সে খুঁজতে চলল প্রধান সেনাপতি ও তার নিজের মালপত্র। যেতে যেতেই সেনাবাহিনী সম্পর্কে খুব খারাপ খবর তার কানে আসতে লাগল; আর বিশৃঙ্খলভাবে পলায়নমান সৈন্যদল সেসব গুজবকে সমর্থনই করল।
ইংরেজদের সোনার বিনিময়ে পৃথিবীর শেষ প্রান্ত থেকে যে রুশ বাহিনীকে আনা হয়েছে, আমাদেরও সেই দশাই হবে(উলমের বাহিনীর দশা।)। যুদ্ধের একেবারে শুরুতে বোনাপার্ত তার সেনাবাহিনীকে লক্ষ্য করে যে ভাষণ দিয়েছিল তার এই কথাগুলি প্রিন্স আর মনে পড়ল। ফলে তার মনে দেখা দিল তার নায়কের প্রতিভার প্রতি বিস্ময়, একটা আহত গর্ববোধ এবং গৌরবের আশা। সে ভাবল, তাহলে কি মৃত্যু ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট নেই? বেশ তো, দরকার হলে অন্য কারো চাইতে হীন কাজ আমি করব না।
লোকজন, গাড়ি-ঘোড়া, কামান-বন্দুক, মালগাড়ি ও সব রকম যানবাহনের এক বিশৃঙ্খল সীমাহীন শোভাযাত্রার দিকে সে ঘৃণার দৃষ্টিতে তাকাল; একজন আর একজনকে পাশ কাটিয়ে বেরিয়ে যাবার চেষ্টায় কাদামাখা পথটাকেই বন্ধ করে দিচ্ছে; কখনো বা তিনজন ও চারজনও একসঙ্গে পাশাপাশি যাবার চেষ্টা করছে। সামনে, পিছনে, চারদিকেই যতদূর চোখ যায় শুধু চাকার ঘর্ঘর, মালগাড়ি ও কামান-টানা গাড়ির কাঁচর-ক্যাচর, গোড়ার ক্ষুরের শব্দ, চাবুকের হিস-হিস, আর সৈনিক আর্দালি ও অফিসারদের বকবকানি। পথের দুধারে আগাগোড়া কত মরা ঘোড়া পড়ে আছে; কতক ছাল-ছাড়ানো, কতক আস্ত; ভাঙা গাড়ির পাশে কিসের অপেক্ষায় একটি মাত্র সৈনিক দাঁড়িয়ে আছে; কোথাও বা কিছু সৈন্য দল থেকে ছিটকে বেরিয়ে আশপাশের গ্রামে ঢুকে পড়ছে, অথবা ভেড়া, মুরগি, খড় ও পেটমোটা বস্তা ঘাড়ে করে গ্রাম থেকে ফিরছে। রাস্তার প্রতিটি চড়াই বা উত্রাইয়ের মুখে আরো বেশি ঘন হয়ে ভিড় জমছে, আর অবিরাম হৈ-চৈ চিৎকার চেঁচামেচি করছে। সৈনিকরা হাঁটু পর্যন্ত কাদায় ডুবে নিজেরাই কামান ও গাড়ি ঠেলছে। চাবুকের সপাসপ শব্দ হচ্ছে, ক্ষুর পিছলে যাচ্ছে, ঘোড়ার দড়ি ছিঁড়ে যাচ্ছে, অবিরাম চিৎকারে বুকে হাঁপ ধরছে। অফিসাররা এগিয়ে যাবার পথ করে দিতে গাড়ির ফাঁকে ফাঁকে ঘোড়া নিয়ে ছুটাছুটি করছে। চারদিকের হৈ-হট্টগোলের মধ্যে তাদের গলা প্রায় শোনাই যাচ্ছে না। তাদের মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে, এই বিশৃঙ্খলা শুধরে দেবার আশাই তারা ছেড়ে দিয়েছে।
