প্রিন্স আন্দ্রু বুঝতে পারল না।
তুমি কোত্থেকে এলে হে? শহরের প্রতিটি কোচয়ান যা জানে সে কথাটা তুমি জান না?
আমি আসছি আচড়াচেসের কাছ থেকে। সেখানে তো কিছু শুনলাম না।
সকলেই যে বাঁধাছাদা করছে তাও কি চোখে পড়েনি?
না, পড়ে নি।…ব্যাপার কি? অধৈর্য হয়ে প্রিন্স আন্দ্রু জানতে চাইল। ব্যাপার কি? আর কি, অয়েসপার্গ যে সেতুটা রক্ষা করছিল ফরাসিরা সেটা পার হয়েছে, আর সেতুটা উড়িয়েও দেওয়া হয় নি; কাজেই মুরাৎ এখন ব্রুনের পথ ধরে ছুটে আসছে, আর দুই এক দিনের মধ্যেই এখানে হাজির হবে।
কি? এখানে? কিন্তু মাইন যখন পাতা ছিল তখন তারা সেতুটা উড়িয়ে দিল না কেন?
সেই প্রশ্নটা তো আমিও তোমাকে করছি। এ কেন-র উত্তর কেউ জানে না, এমন কি বোনাপার্তও না।
বলকনস্কি ঘাড় ঝাঁকুনি দিল।
বলল, কিন্তু সেতুটা পার হওয়া মানে তো সেনাবাহিনীও ধ্বংস হয়েছে। তারা তো বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।
ঠিক তাই হয়েছে, বিলিবিন জবাব দিল। শোন! তোমাকে তো বলেছি, ফরাসিরা ভিয়েনায় ঢুকেছে। ভালো কথা। পরদিন, অর্থাৎ গতকাল, ঐ ভদ্রলোকরা, মুরাৎ, লাগেস ও বেলিয়ার্দ ঘোড়ায় চেপে সেতুর কাছে এল। (লক্ষ্য কর যে এরা তিনজনই গ্যান) একজন বলল, মশাইরা, আপনারা কি জানেন যে টাবর সেতুতে মাইন পাতা আছে, ভবল মাইন; সেতুমুখটা সাংঘাতিক রকম শক্ত করে তৈরি, আর পনেরো হাজার সৈন্যর একটি বাহিনীকে হুকুম দেওয়া হয়েছে যে তারা সেতুটা উড়িয়ে দেবে, তবু আমাদের সেতু পার হতে দেবে না? কিন্তু আমরা যদি সেতুটা দখল করতে পারি তো আমাদের সম্রাট নেপোলিয়ন খুশি হবেন; সুতরাং চলুন, আমরা তিনজন এগিয়ে গিয়ে সেতুটা দখল করি। অন্যরা বলল, হ্যাঁ, তাই চলুন। আর অমনি তারা এগিয়ে এসে সেতুটা দখল করল, পার হয়ে এল, এবং এখন গোটা বাহিনীটা নিয়ে দানিয়ুবের এপারে এসে পৌঁছেছে,–ছুটে আসছে আমাকে, তোমাকে, এবং তোমার সরবরাহ-ব্যবস্থাকে লক্ষ্য করে।
ঠাট্টা রাখ, প্রিন্স আন্দ্রু গম্ভীরভাবে বলল। সংবাদটা তাকে দুঃখ দিয়েছে। আবার সে খুশিও হয়েছে।
যেই সে জানল রুশ বাহিনী এখন একটা অসহায় অবস্থায় পড়েছে, তখনই তার মনে হল যে, সে বাহিনীকে এই অবস্থা থেকে উদ্ধারের দায়িত্ব ভাগ্যই তার হাতে তুলে দিয়েছে; এই সেই তুলো (তুলোর যুদ্ধেই নেপোলিয়ন প্রথম নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিল) যা তাকে একজন তুচ্ছ অফিসারের পদ থেকে খ্যাতির প্রথম সোপানে প্রতিষ্ঠিত করবে! বিলিবিনের কথা শুনেই সে কল্পনা করে নিয়েছে, সেনাবাহিনীতে ফিরে গিয়েই সে সমর-পরিষদের কাছে এমন একটা প্রস্তাব পেশ করবে একমাত্র যার দ্বারাই রুশ বাহিনী রক্ষা পেতে পারে, আর তার ফলে সেই পরিকল্পনাকে কার্যে পরিণত করবার দায়িত্বও একমাত্র তার হাতেই তুলে দেওয়া হবে।
সে বলল, এসব ঠাট্টা রাখ।
বিলিবিন বলতে লাগল, আমি ঠাট্টা করছি না। এর চাইতে সত্য, এর চাইতে দুঃখের আর কিছু নেই। এই ভদ্রলোকরা একাকি ঘোড়ায় চেপে সেতুর উপর উঠল, শাদা রুমাল নাড়ল : কর্তব্যরত অফিসারকে নিশ্চিত করে বলল যে তারা মার্শাল, প্রিন্স অয়েসমপার্গের সঙ্গে আলোচনা করতে চলেছে। অফিসারও তাদের সেতুর উপরে উঠতে দিল। তারাও হাজার করম আস্ফালনে তাকে জড়িয়ে ফেলল, বলল-যুদ্ধ শেষ হয়ে গেছে, সম্রাট ফ্রান্সিস বোনাপার্টের সঙ্গে একটা সাক্ষাৎকারের ব্যবস্থা করছেন আর তাই তারা প্রিন্স অয়ের্সপার্গের সঙ্গে দেখা করতে চায়, ইত্যাদি। অফিসার অযেসপার্গকে খরব পাঠাল; এই ভদ্রলোকরা অফিসারদের সঙ্গে কোলাকুলি করল, হাসি-ঠাট্টা শুরু করল, কামানের উপর বসে পড়ল, আর ওদিকে এক ব্যাটেলিয়ন ফরাসি সৈন্য সকলের অলক্ষ্যে সেতুর কাছে চলে আসে, বিস্ফোরক পদার্থ বোঝাই বস্তাগুলিকে জ্বলে ফেলে দিল, এবং মোক্ষম মুহূর্তে পৌঁছে গেল। অবশেষে এমন লেফটেন্যান্ট-জেনারেল, আমাদের প্রিয় প্রিন্স অয়ের্সপার্গ ভন মাতান স্বয়ং। প্রিয়তম শত্রু! অস্ট্রিয় বাহিনীর সেরা ফুল! তুর্কি যুদ্ধের নায়ক! যুদ্ধ তো শেষ হয়েছে, এবার আমরা পরস্পর করমর্দন করতে পারি…সম্রাট নেপোলিয়ন প্রিন্স অয়ের্সপার্গের সঙ্গে পরিচিত হবার জন্য অধৈর্য হয়ে উঠেছেন। এককথায়, এই ভদ্রলোকরা, প্রকৃতই তারা গ্যান, মিষ্টি কথায় তাকে এতই অভিভূত করে ফেলল, আর সেও ফরাসি মার্শালদের সঙ্গে দ্রুত ঘনিষ্ঠতার ফলে এতই ফুলে ফেঁপে উঠল, আর মুরাতের পরিচ্ছদ ও উটের পালকের স্বপ্নে এতই বিভোর হয়ে পড়ল যে তার চোখ ঝলসে গেল, শত্রুপক্ষকে যে গোলাবর্ষণের দ্বারা অভ্যর্থনা জানাতে হয় সেকথাই সে ভুলে গেল। সকলে যাতে তার এই সরস উক্তিকে উপভোগ করতে পারে সেজন্য এ পর্যন্ত বলে বিলিবিন একটু থামতে ভুল করল না। ফরাসি ব্যাটেলিয়ান বন্দুক উঁচিয়ে সেতুর মুখে ছুটে এল, সেতু দখল করে নিল! কিন্তু সবচাইতে মজার ব্যাপার হল, কামানের ভারপ্রাপ্ত যে সার্জেন্টটির মাইনে আগুন লাগাবার সংকেত দেবার এবং সেতুটা উড়িয়ে দেবার নির্দেশ দেবার কথা, সে ফরাসি সৈন্যদের সেতুর দিকে ছুটে যেতে দেখে কামান দাগতে উদ্যত হয়েছিল, কিন্তু লানেস তার হাতটা থামিয়ে দিল। সার্জেন্টটি তার সেনাপতির চাইতে বেশি বুদ্ধিমান; সে অয়ের্সপার্গের কাছে গিয়ে বলল : প্রিন্স, আপনি প্রতারিত হচ্ছেন, এরা যে ফরাসি! মুরাৎ দেখল, সার্জেন্টটি যদি সব কথা বলে দেয় তাহলে তো সর্বনাশ; তাই নকল বিস্ময়ে (সে যে সত্যিকারের গ্যাঙ্কন) অয়েসপার্গের দিকে ফিরে বলল : আপনি যদি একজন অধীনস্থ কর্মচারীকে এভাবে আপনার সঙ্গে কথা বলতে দেন তাহলে অস্ট্রিয়ার বিশ্ববিখ্যাত শৃঙ্খলাবোধ কোথায় থাকে তা তো আমি বুঝতে পারছি না! প্রতিভার এক মোক্ষম আঘাত। প্রিন্স অয়েসপার্গের মনে হল যে তার মর্যাদা তো বিপন্ন; তাই সে সার্জেন্টকে বন্দি করার হুকুম দিল। বুঝলে হে, তোমরা স্বীকার করতে বাধ্য যে টাবর সেতুর এই ব্যাপারটা বড়ই মজাদার! এটা ঠিক বোকামি নয়, পেজোমিও নয়…।
