ওঃ! ওঃ! ওঃ!
আচ্ছা, au revoir, বলকনস্কি! au revoir, প্রিন্স! সকাল সকাল ডিনারে চলে আসবেন, কয়েকজন বলল। আপনাকেও দলে ভিড়িয়ে নেব।
বলকনস্কিকে হল পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে বিলিবিন বলল, ম্রাটের সঙ্গে কথা বলার সময় খাদ্য-সরবরাহ ব্যবস্থা ও পথ-নির্দেশ ব্যবস্থার যতটা সম্ভব প্রশংসা করতে চেষ্টা কর।
সেসবের প্রশংসা করাই উচিত কিন্তু আসল ঘটনা যা তাতে প্রশংসা করা যায় না, বলকনস্কি হেসে জবাব দিল।
যাই হোক, যত বেশি পর কথা বল। তিনি কথা বলতে ভালোবাসেন, কিন্তু নিজে কথা বলা পছন্দ করেন, আর কথা বলতেও পারেন না; সে তুমি নিজেই দেখতে পাবে।
*
অধ্যায়-১২
রাজদরবারে প্রিন্স আন্দ্রু অস্ট্রিয় অফিসারদের মধ্যেই দাঁড়িয়েছিল; সেই রকম নির্দেশই তাকে দেওয়া হয়েছিল। সম্রাট ফ্রান্সিস স্থিরদৃষ্টিতে তার মুখের দিকে তাকিয়ে লম্বা মাথাটা ঈষৎ দোলাল। দরবার শেষ হয়ে গেলে আগের দিনের সেই অ্যাডজুটান্টটি আনুষ্ঠানিকভাবে বলকনস্কিকে জানাল যে সম্রাট তার কথা শুনবার ইচ্ছা প্রকাশ করেছে। ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে সম্রাট তাকে অভ্যর্থনা জানাল। আলোচনা শুরু হবার আগেই প্রিন্স আন্দ্রু অবাক হয়ে দেখল, যেন কি বলতে হবে বুঝতে না পেরেই সম্রাট বিব্রত হয়ে পড়ল, তার মুখ লাল হয়ে উঠল।
সে তাড়াতাড়ি প্রশ্ন করল, বলুন তো, যুদ্ধ কখন শুরু হয়েছিল?
প্রিন্স আন্দ্রু জবাব দিল। তারপর আবার তেমনি সরল আর একটি প্রশ্ন : কুতুজভ ভালো ছিলেন তো? কখন তিনি ক্রেমস ছেড়ে গেলেন? ইত্যাদি। সম্রাট এমনভাবে কথা বলতে লাগল যেন কতকগুলি প্রশ্ন করাই তার আসল উদ্দেশ্য, সে সব প্রশ্নের উত্তর সম্পর্কে তার কোনো আগ্রহই নেই।
ঠিক কয়টার সময় যুদ্ধ শুরু হয়েছিল? সম্রাট শুধাল।
ঠিক কয়টার সময় রণক্ষেত্রে যুদ্ধ শুরু হয়েছিল তাতে ইয়োর ম্যাজেস্টিকে আমি জানাতে পারব না, তবে আমি যে ডুরেনস্টিনে ছিলাম সেখানে আমরা আক্রমণ শুরু করেছিলাম বিকেল পাঁচটার পরে, জবাব দিতে গিয়ে বলকনস্কি বেশ উত্তেজিত হয়ে উঠল; তার আশা হল, সে যা কিছু জেনেছে, যা কিছু দেখেছে সে সবের যে বিবরণ তার মনের মধ্যে তৈরি হয়ে আছে, এবার তাকে প্রকাশ করবার একটা সুযোগ সে পাবে। কিন্তু সম্রাট মৃদু হেসে তাকে বাধা দিল।
কত মাইল?
কোন জায়গা থেকে কোন জায়গা ইয়োর ম্যাজেস্টি?
ডুরেনস্টিন থেকে ক্রেমস পর্যন্ত।
সাড়ে তিন মাইল ইয়োর ম্যাজেস্টি।
ফরাসিরা কি বাম তীর ছেড়ে চলে গেছে।
স্কাউটদের সংবাদ অনুসারে তার শেষ সৈনিকটিও রাতারাতি ভেলায় চড়ে পার হয়ে গেছে।
অশ্বাদির জন্য যথেষ্ট খাবার ক্রেমসে আছে তো?
যতটা প্রয়োজন ঠিক ততটা খাদ্য সরবরাহ…
সম্রাট তাকে বাধা দিল।
ঠিক কয়টার সময় সেনাপতি শমিড নিহত হয়?
আমার বিশ্বাস, সাতটার সময়।
সাতটার সময়? বড়ই দুঃখের কথা, বড়ই দুঃখের কথা।
প্রিন্স আন্দ্রুকে ধন্যবাদ জানিয়ে সম্রাট মাথা নোয়াল। সেকান থেকে সরে যেতেই সভাসদরা চারদিক থেকে প্রিন্স আল্লুকে ঘিরে ধরল। সর্বত্রই বন্ধুত্বপূর্ণ দৃষ্টি, বন্ধুত্বপূর্ণ কথা। গতকালের অ্যাডজুটান্টটি প্রাসাদে না থাকার জন্য তাকে তিরস্কার করল; নিজের বাড়িতে থাকবার প্রস্তাব করল। যুদ্ধমন্ত্রী এগিয়ে এসে তৃতীয় শ্রেণীর মারিয়া থেরেসা অর্ডার লাভের জন্য তাকে অভিনন্দন জানাল। সম্রাট তাকে ঐ সম্মানে ভূষিত করেছে। সম্রাজ্ঞীর পরিচারক এসে তাকে আমন্ত্রণ জানাল হার ম্যাজেস্টির সঙ্গে দেখা করতে। আর্চডাচেসও তার সঙ্গে দেখা করতে ইচ্ছুক। কার কথার জবাব দেবে বুঝতে না পেরে সে কয়েক সেকেন্ড ভেবে নিল। তখন রুশ রাষ্ট্রদূত কাঁদে হাত রেখে তাকে জানালার কাছে নিজে গিয়ে কথা বলতে শুরু করল।
বিলিবিন যাই বলুক না কেন, যে সংবাদ নিয়ে সে এসেছে সকলেই সেটাকে সানন্দে গ্রহণ করল। একটি ধন্যবাদজ্ঞাপক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হল, কুতুজভকে মারিয়া থেরেসা গ্র্যান্ড ক্রশ দেওয়া হল : এবং গোটা বাহিনীকে পুরস্কৃত করা হল। সব জায়গা থেকে বলকনস্কিকে আমন্ত্রণ করা হল; অস্ট্রিয়ার গন্যমান্য লোকদের সঙ্গে দেখাসাক্ষাৎ করতেই তার সারা সকালটা কেটে গেল। দেখাসাক্ষাতের পালা শেষ করে বিকেল চারটে-পাঁচটা নাগাদ সে বিলিবিনের বাসায় ফিরে যাচ্ছিল। যুদ্ধ ও ব্রুন দর্শনের একটি বিবরণ বাবাকে পাঠাবার জন্য সে মনে মনে একটা চিঠির খসরা তৈরি করছিল। দরজায় পৌঁছে দেখল, মালপত্রে অর্ধেক বোঝাই একটা গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। বিলিবিনের চাকর ফ্রাঞ্জ সামনের দরজা দিয়ে একটা পোের্টম্যান্টোকে অনেক কষ্টে টেনে বের করছে।
বিলিবিনের বাসায় পৌঁছবার আগে অভিযানের জন্য কয়েকটা বই সংগ্রহ করতে প্রিন্স আন্দ্রু একটা বইয়ের দোকানে গিয়েছিল, এবং সেখানে কিছুটা সময় কাটিয়েছিল।
এ সব কী? সে জিজ্ঞেস করল।
অনেক কষ্টে পোর্টম্যাটোটাকে গাড়িতে তুলতে তুলতে ফ্রাঞ্জ বলল, ওঃ ইয়োর এক্সেলেন্সি, আমাদের আরো দূরে সরে যেতে হবে। স্কাউলেটা আবার আমাদের পিছু নিয়েছে।
অ্যাঁ? কী বললে?
বিলিবিন বেরিয়ে এল। তার স্বভাব-শান্ত মুখে উত্তেজনার আভাস।
এই যে এসেছ! এবার স্বীকার কর যে এটা খুব মজার, সে বলল। ভিয়েনার টাবর সেতুর ব্যাপার হে…বিনা আঘাতেই তারা পার হয়েছে।
